প্রধান বিচারপতি বললেন

ফাঁসি দিলেই সমাজ অপরাধমুক্ত হয়ে যায় না

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ০১:৫৭ এএম

শুধু ফাঁসির সাজা দিলেই সমাজ অপরাধমুক্ত হয়ে যায় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তবে যেখানে অপরাধ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো, সেখানে আদালতকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। নিজের চার বছর বয়সী সন্তানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির করা জেল আপিলের শুনানিতে গতকাল মঙ্গলবার এমন মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।

২০০৭ সালে শিশু শামীম হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলায় ২০০৮ সালে বিচারিক আদালতের রায়ে বাবা মো. জসিম রাড়ীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়। পরে হাইকোর্টেও সেই সাজা বহাল থাকে। গতকাল জসিমের জেল আপিল আংশিক মঞ্জুর করে মৃত্যুদণ্ড রদ করে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার না থাকলে জসিমকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। শিশু শামীম হত্যা মামলায় ২০০৭ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন জসিম।

ভার্চুয়ালি আদালতে জসিমের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন মোল্লা। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।

শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘শুধু সেনটেনস (সাজা), হ্যাঙ্গিং (ফাঁসি) সমাজকে রক্ষা করে না। ভারতের ল অ্যান্ড অর্ডার (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি) থেকে আমাদের ল অ্যান্ড অর্ডার পরিস্থিতি কিন্তু কোনো অংশে খারাপ নয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ভারতে ডেথ সেনটেনস (মৃত্যুদণ্ড) হয়েছে ১২১টি আর আমাদের দেশে হয়েছে ৩২৭টি। এতে কি অপরাধ কমেছে? তাই এটা ভুল ধারণা যে, সাজা আর ফাঁসি দিলেই আমরা একদম অপরাধমুক্ত হয়ে যাব।’

পরে অন্য একটি মামলার শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘প্রতিদিন পত্রিকায় স্ত্রী হত্যার খবর দেখি। স্ত্রী হত্যায় তো ডাক্তারের প্রতিবেদন থাকলেই স্বামীর ফাঁসি, নইলে যাবজ্জীবন। কিন্তু তাতে কি স্ত্রী হত্যা বন্ধ হয়েছে? যদি তাই হতো তাহলে স্ত্রী হত্যার অভিযোগে ৮০ শতাংশ মামলায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন সাজা হচ্ছে। এই যে সাজা হচ্ছে, ফাঁসি হচ্ছে, যাবজ্জীবন হচ্ছে, স্ত্রী হত্যা কি কমেছে? আমার তো মনে হয় এটার একটা পরিসংখ্যান নেওয়া উচিত।’ শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘যেখানে ডেথ সেনটেনস (মৃত্যুদণ্ডের সাজা) হবে, সেখানে তা দিতে হবে।’

সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানান, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও শিশু শামীমকে নিয়ে থাকতেন জসিম রাড়ী। ২০০৭ সালের ৩১ মার্চ রাতে শাশুড়ির কাছে ২ হাজার টাকা চান তিনি। এ নিয়ে তাকে মারধর করা হয়। শিশু শামীমকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে মারধর করা হয়। পরে জসিম তার সন্তানকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। পরদিন জসিম শিশু শামীমকে গলাটিপে হত্যা করে কচুরিপানার নিচে লাশ রেখে দেন। এ ঘটনায় ওই বছরের ২ এপ্রিল শিশুর মা ফাতেমা তার স্বামীর বিরুদ্ধে মেহেন্দীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই বিচারিক আদালতের রায়ে জসিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) এবং জসিমের আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট তার রায়ে সাজা বহাল রাখে। এ রায়ের বিরুদ্ধে একই বছর আপিল বিভাগে জেল আপিল করেন জসিম। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রায় দিল আপিল বিভাগ।

জসিমের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জসিমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী শাশুড়ির নির্দয় আচরণে রাগে, ক্ষোভে ও হতাশায় তিনি নিজের ছেলেকে হত্যা করেছেন। একসময় তিনি অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন। শুনানিতে বলেছি যে ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত নয়, অনাকাক্সিক্ষত। আদালত জসিমের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে তাকে দণ্ডবিধির ৩০৪ এর ২ ধারায় ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে ইতিমধ্যে তার সাজা খাটার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিশ্বজিৎ দেবনাথ বলেন, ‘আপিল বিভাগ জসিমের সাজা কমিয়ে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ২০০৭ সাল থেকে কারাগারে থাকায় ইতিমধ্যে তার সাজা খাটা হয়ে গেছে। এখন অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত