চট্টগ্রাম জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭১৩ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এটিই এখন পর্যন্ত জেলার এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। চলতি সপ্তাহে তিন দিনই আগের আক্রান্তের রেকর্ড ভেঙেছে। এ নিয়ে জেলায় করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৬৩ হাজার ছুঁইছুঁই। চট্টগ্রাম নগরীর তুলনায় উপজেলাগুলোয় সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে। গত বুধবারের নমুনা পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় সংক্রমণের হার ৬১ দশমিক ৪৫ ও নগরে ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ উপজেলায় নগরীর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলাগুলোয় নজরদারি কম থাকায় চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছেন মোট ৬২ হাজার ৯১৩ জন। এর মধ্যে নগরীর ৪৮ হাজার ৭৭২ ও উপজেলার বাসিন্দা ১৪ হাজার ১৪১ জন। সর্বশেষ শনাক্ত ৭১৩ জনের মধ্যে নগরীর ৪৭৭ ও বিভিন্ন উপজেলার ২৩৬ জন। নমুনা বিবেচনায় শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। জেলায় চলতি মাসের প্রথম সাত দিনে শনাক্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৫৫৭ জন রোগী। অথচ গত জুন মাসের প্রথম সাত দিনে শনাক্ত হয়েছিল মাত্র ৭০১ জন। অর্থাৎ জুলাইয়ের প্রথম সাত দিনে জুনের প্রথম সাত দিনের তুলনায় ৫ গুণ বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া পুরো জুন মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৫ হাজার ২৫৯ জন। সে হিসাবে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই জুনের মোট রোগীর ৬৮ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে।
গত বুধবার মোট শনাক্তের মধ্যে ২৩৬ জনই ছিলেন উপজেলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাটহাজারীতে, এরপর সীতাকু-ে। এ ছাড়া অন্যান্য উপজেলায়ও বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। রোগী বাড়ার সঙ্গে উপজেলায় মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গত দুদিনে চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে ১১ জনই উপজেলার বাসিন্দা। অর্থাৎ গত দুদিনে চট্টগ্রামে মোট মৃত্যুর ৮৫ শতাংশই হয়েছে উপজেলার গ্রামগুলোয়।
চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী বাবুল বলেন, উপজেলায় করোনা রোগী বাড়ছে। অনেক রোগী জ¦র-সর্দি-কাশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিচ্ছে, যার ফলে রোগীরা সংক্রমিত করছে অন্যজনকে এবং তারাও জানে না তাদের করোনা হয়েছে কি না। এটি অশনিসংকেত। উপসর্গ না থাকলেও আমরা বারবার বলছি অসুস্থতাবোধ করলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে। অবস্থার অবনতি হলে তখন হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকদের তো কিছু করার থাকে না। অনেকে পজিটিভ হয়েও আইসোলেশন না মেনে হাট-বাজার ও গ্রামে ঘোরাফেরা করায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। তাই পজিটিভ রোগীদের অবশ্যই আইসোলেশনে যেতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, উপজেলা সদরে প্রশাসনের কড়াকড়ি থাকায় মানুষজন কম থাকে, কিন্তু গ্রামে গ্রামে মানুষজনের জটলা। গ্রামে কড়া নজরদারি না থাকায় করোনার হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। তাই এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, না হয় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। ঘন ঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও মাস্ক পরিধান করতে হবে। যাদের জটিল রোগ আছে, তাদের করোনা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি না নিয়ে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে। এদের অধিকাংশের অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয় তাই বাসায় রেখে এই ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত বুধবার চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগী ছিল ৩৪৪ জন আর বেসরকারিতে ছিল ৫৬০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ৪১ জন। অন্যদিকে আইসিইউতে বাড়ছে রোগীর চাপ। গত বুধবার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী ছিল মোট ৮৮ জন।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানান, নগরী ও উপজেলায় সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক দিন পর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় সবাইকে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যেহেতু অনেকের উপসর্গ থাকে না, তাই একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া-আসার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। সরকার নির্দেশিত কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চললে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, না হয় সংক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাবে।
