মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২১, ০১:০৯ এএম

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে হুন্ডি ছেড়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এছাড়া রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনা চালু রয়েছে। এ কারণে রেমিট্যান্স বাড়ছে দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের। তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছর ২ লাখের বেশি কর্মী দেশে ফেরত এসেছে। নতুন করে কর্মী পাঠানোও কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তারা বলছেন, পাচার হওয়া টাকা রেমিট্যান্সের নামে দেশে ঢুকছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২০ সালে করোনার কারণে বিদেশে কর্মী প্রেরণ অনেক কমে যায়। ওই বছর বিদেশি কর্মী যায় ২ লাখ ১৭ হাজার। কিন্তু একই সময়ে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার কর্মী দেশে ফেরতও আসে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, গত বছরের জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের ১৮৬টি দেশে অবস্থানরত ৭০ হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী করোনায় আক্রান্ত হয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত মারা যায় ২ হাজার ৩৩০ জন।

এরপরও বিদায়ী অর্থবছরে রেমিট্যান্সে ৩৬.১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স আসা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আলোচিত সময়ে টাকার অঙ্কে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৮৯ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এই দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ১১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। সেই হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে আসা রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বা ৬৯.৫০ শতাংশ।

অবশ্য টাকার অঙ্কে রেমিট্যান্স সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সৌদি আরব থেকে। গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫২৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৫২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। সেই হিসেবে আলোচিত সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার বা ৪৯.৪০ শতাংশ।

আলোচিত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১০১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার বা ৪৭.৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৬ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এই দেশটি থেকে ২১৫ কোটি ৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স আসা আগের মতোই রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ২২৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ২২৬ কোটি ডলার।

আলোচিত সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৬৩ কোটি ডলার বা ৫০ শতাংশ। কুয়েত থেকে ৪৯ কোটি ডলার বা ৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স বেড়েছে। ওমান থেকে ৩১ কোটি ডলার বা ২৮ শতাংশ, কাতার থেকে ৩৯ কোটি ডলার বা ৪২ শতাংশ, ইত্যালি থেকে ৮ কোটি ডলার বা ১৩ শতাংশ, সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ১৭ কোটি ডলার বা ৪০ শতাংশ রেমিট্যান্স বেড়েছে।

এছাড়া অন্যান্য দেশ মিলিয়ে গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ২ হাজার ২৮৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। ওই সময় পর্যন্ত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৯.৫০ শতাংশ।

অবশ্য অর্থবছরের পুরো সময়ে অর্থাৎ জুলাই-জুন সময়ে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসে। প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬.১০ শতাংশ।

রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার মধ্যে অনেক প্রবাসী দেশে ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে অনেকেই আর ফেরত যেতে পারেননি। এরপরও দেশে রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুক্তিসংগত কোনো কারণ থাকতে পারে না। তাদের ধারণা, রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনা থাকায় অনেকেই এখন রেমিট্যান্সের নাম করে পাচার করা টাকা দেশে ফেরত আনছেন।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত অর্থবছরে অপ্রদর্শিত ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কর দিয়ে সাদা করা হয়েছে। এটা একদিক দিয়ে ভালো যে, এই টাকাগুলো অর্থনীতির মূল ধারায় ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এত পরিমাণ টাকা এর আগে কখনোই একবারে সাদা হওয়ার নজির নেই। তাহলে এই টাকাগুলো কোথা থেকে এলো এটা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ থাকে।

তার মতে, পাচার হওয়া টাকা রেমিট্যান্সের নামে দেশে আসতে পারে। কেননা, এখন দেশে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এছাড়া এই সময়ে এত বেশি রেমিট্যান্স আসার কোনো কারণ নেই। তাহলে আগের অর্থবছরে কেন এত বেশি রেমিট্যান্স এলো না সেই প্রশ্ন করেন এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, করোনার মধ্যে কর্মী পাঠানো কমে যাওয়ার পর কী এমন হলো যে রেমিট্যান্স বাড়ছে?

এছাড়া রেমিট্যান্সের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অন্য গবেষণা সংস্থাগুলোও বিভিন্ন সময়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ যেমন শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসছে তেমনি বৈদেশিক বাণিজ্যে অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আগের থেকে ভালো অবস্থানে আসছে। তবে এই পরিমাণ রেমিট্যান্সের পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা খতিয়ে দেখারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত