বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আলোচনা বিক্রি হচ্ছে। এরকম একটি আলোচনার দাম উঠেছে ২০০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগে ১২০ মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুতের আবেদন করেছিল গুড উইন পাওয়ারের কোম্পানি। জমি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির আবেদন বাতিল করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। সেই বাতিল হওয়া আবেদন এখন ২০০ কোটি টাকা দামে বিক্রির চেষ্টা চালাচ্ছে গুড উইন পাওয়ার। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারের আধা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) ব্যাংক হিসাব থেকে নগদ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ। সেই টাকার একটি অংশ গুড উইন পাওয়ার কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়। গুড উইন পাওয়ারের অংশীদারিত্ব মোহাম্মদ শাহেদের নামেও রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরকারের আধা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএওসিএলের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তদন্ত শেষ করেছে সম্প্রতি। গত বছর করোনায় মারা যান মোহাম্মদ শাহেদ। তার আত্মসাৎ করা অর্থের হদিস তার পরিবারেরও অনেকে জানেন না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের অধীনে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ৫০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এসএওসিএলে। চুরির টাকায় এখন সেই মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গেই ব্যবসার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে গুড উইন পাওয়ার। বর্তমানে গুড উইন পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী জামাল উদ্দিন এবং পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তার মেয়ে জামাল ফাতিমা মনিকা।
একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্রেতা সেজে এই প্রতিবেদক গত ২৫ জুন বেলা ১১টায় গুড উইন পাওয়ার কোম্পানির রাজধানীর ধানম-ির কার্যালয়ে যান। ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের ৩৭ নম্বর বাড়ির ষষ্ঠতলায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। সেখানে বসে কথা হয় গুড উইন পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী জামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি ক্রেতা সেজে যাওয়া এই প্রতিবেদককে জানান, এ প্রতিষ্ঠানের নারায়ণগঞ্জে ১২০ মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এটি যদি কেউ কিনতে চায় তাহলে ২০০ কোটি টাকায় ছেড়ে দেবেন।
জামাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র (এলওআই), বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ও ৩৬০ একরের বেশি জমি আছে কি না? তখন তিনি বলেন, ‘এলওআই ও পিপিএ হয়নি। শুধু নেগোসিয়েশন (আলাপ-আলোচনা) শেষ হয়েছে। নেগোসিয়েশন শেষে বিদ্যুৎ বিভাগ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ দশমিক ৫৫ ইউএস সেন্ট দিতে রাজি হয়েছে।’ হাতে পর্যাপ্ত জমি রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এলওআই ও পিপিএ না থাকলে কেন্দ্রটি কী বিবেচনায় বিক্রি করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জামাল উদ্দিন বলেন, ‘যারা কিনবেন তাদের ৩০ শতাংশ অর্থ অগ্রিম দিতে হবে। এই অগ্রিম অর্থ দিলে দুই মাসের মধ্যে এলওআই ও পিপিএ হয়ে যাবে।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার হাতে জাপানি ফান্ড রয়েছে। কেউ চাইলে আমি তাকে জাপান থেকে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ফান্ড এনে দিতে পারি। তাছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকে গ্রিন ফান্ড রয়েছে। চাইলে সেখান থেকেও অর্থ এনে দিতে পারব। এছাড়া কেউ যদি জমির অভাবে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে না পারে তাকে আমরা জমিও জোগাড় করে দেব।’
জামাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে এই মুহূর্তে পঞ্চগড়ের বুড়াবুড়িতে রয়েছে ৪০০ একর জমি। তাছাড়া আমরা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কাছ থেকে ৮০০ একর জমি লিজ নিয়েছি। এসব জমিতে বড় ব্যবসায়ীরা চাইলে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে পারবেন।’
সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগেই অর্থ চুরির বিষয়ে চমকপ্রদ কিছু তথ্য জামাল উদ্দিন দেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ দেখানো হবে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে, যা প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অথচ কেন্দ্র নির্মাণে সর্বোচ্চ খরচ হবে ৭০০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ্র নির্মাণের আগেই আপনার হাতে চলে যাবে ৩৫০ কোটি টাকার বেশি। এ ক্ষেত্রে শুধু একটি জমি জোগাড় করতে পারলেই হবে। এমনকি জমিটি যদি লিজও নিতে পারেন।’
এতই যদি লাভজনক হয় ব্যবসাটি তাহলে আপনি নিজে ব্যবসা না করে বিক্রি করতে চাইছেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে এ বিষয়ে অনেক গবেষণা করেছি। গবেষণা থেকে আমার মনে হয়েছে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সহযোগিতা করাই বেশি ভালো। আমি অবশ্য নিজেও দুয়েকটা কেন্দ্র নির্মাণ করব।’
জামাল উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় ভিন্ন সত্য। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, জামাল উদ্দিন পাঁচ বছর আগে নারায়ণগঞ্জে একটি ১২০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আবেদন করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত জমি না থাকায় সেই আবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
জামাল উদ্দিন দাবি করেছেন, তার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ দশমিক ৫৫ ইউএস সেন্ট দিতে রাজি সরকার। অথচ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার সর্বশেষ একটি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানির সঙ্গে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে। সেই কেন্দ্র থেকে ইউনিটপ্রতি ১০ দশমিক ৪০ ইউএস সেন্ট দেবে। তারা বলছেন, আগামীতে যেসব সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হবে তারা কোনোভাবেই ১০ দশমিক ৪০ সেন্টের বেশি পাবে না।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগে অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে, জামাল উদ্দিন একাধিক ব্যক্তিকে নারায়ণগঞ্জ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জায়গা ভরাটের কাজ দিয়েছেন। কাজ দেওয়ার নাম করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জামানত নিয়েছেন। সেই অর্থ আর জামাল উদ্দিন ফেরত দিচ্ছেন না। এরকম অভিযোগ নিয়ে বেশ কয়েকজন বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
জামাল উদ্দিনের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা একটি আবেদন করেছিল বহু আগে। জমি না থাকায় তাদের আবেদনটি আমলে নেয়নি বিদ্যুৎ বিভাগ।’
এসএওসিএলের আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে গুড ইউন পাওয়ার কোম্পানি গঠন করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নসরুল হামিদ বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। তবে অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হবে। এসএওসিএলের অর্থ উদ্ধারে জ্বালানি বিভাগ আন্তরিক, তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
বিজিবির কাছ থেকে ৮০০ একর লিজের জমি ও পঞ্চগড়ের বুড়াবুড়ি এলাকায় ৪০০ একর জমি বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ভিন্ন তথ্য। বিজিবি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সঙ্গে গত ১৪ জানুয়ারি জামাল উদ্দিনের মালিকানাধীন ব্লু মাউন্টেড এনজেড লিমিটেডের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সমঝোতা স্মারকে বলা হয়, পঞ্চগড়ের বুড়াবুড়িতে একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবে আগ্রহ রয়েছে বিজিবি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের। এ বিষয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্য প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। এ সংক্রান্ত কোনো খরচ বিজিবি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট দেবে না। জমি নিয়ে স্থানীয় লোকদের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে সেটিও ব্লু মাউন্টেডকে সমাধান করতে হবে। তবে ওই সমঝোতা স্মারকে পঞ্চগড়ের বুড়াবুড়িতে কী পরিমাণ জমি রয়েছে তা বলা হয়নি।
এসএওসিএলের টাকায় গুড উইন পাওয়ার : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় (রেজেসকো) গুড উইন পাওয়ার কোম্পানি খোলেন শাহেদ। এ কোম্পানির বাকি দুই মালিক হলেন জামাল উদ্দিন ও তার মেয়ে জামাল ফাতিমা মনিকা। চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী এসএওসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমন কোম্পানি খুলতে পারেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ আর ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এসএওসিএলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ নগদে অন্তত ১৫০ কোটি টাকা তুলে নেন। এর মধ্যে ১২১টি নগদ চেকের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে দেশ রূপান্তরের কাছে। এই নগদ চেকের মাধ্যমে ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ ৬ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। এছাড়াও কোম্পানির চারটি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোপাট করেন শাহেদ। আর এসব টাকা একই দিনে গুড উইন পাওয়ার কোম্পানির চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের প্রিমিয়ার ব্যাংক শাখায় জমা করা হয়। ব্যাংক হিসাবে রাখার জমা রসিদও দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে।
অধিকাংশ অর্থ এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে নগদ উত্তোলন করে একই দিনে গুড উইন পাওয়ারের ব্যাংক হিসাব চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের প্রিমিয়ার ব্যাংকে জমা দেন এসএওসিএলের তৎকালীন হিসাব বিভাগের প্রধান বিলায়েত হোসেন। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক টাকা তুলে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে বলেছেন। আমি সেটা তার নির্দেশমতো করেছি। ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি গুড উইন পাওয়ারের। এর মালিক কারা তা আমার জানা নেই।’
শাহেদের ঘনিষ্ঠরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ২০১২ সালের পর শাহেদ নিউজিল্যান্ডে নাগরিকত্বের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তখন জামাল উদ্দিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। জামাল উদ্দিন নিউজিল্যান্ডে মানুষ নিয়ে যাওয়ার কাজ করেন। সে সময় তার পরামর্শে শাহেদ নিউজিল্যান্ড সরকারের কাছে তার সম্পত্তির একটি বিস্তারিত বর্ণনা জমা দিয়েছিলেন। সেই বর্ণনামতে, শাহেদের মালয়েশিয়াতে বাণিজ্যিক স্পেস, ঢাকায় ও ফেনীতে একটি করে ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামের খুলশীসহ বিভিন্ন স্থানে ১২টি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামে তার চারটি বড় বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে বলে বলা হয়।
শাহেদের ঘনিষ্ঠরা আরও জানান, জামাল উদ্দিনের কাছে বড় অঙ্কের অর্থও তখন দিয়েছিলেন শাহেদ। গুড উইন পাওয়ারে নগদ টাকা রেখেছিলেন। এই কোম্পানি দিয়ে লুব অয়েল আমদানির ব্যবসাও শাহেদ করেছিলেন। তবে গত বছর করোনায় মারা যাওয়ার পর এসব সম্পদের বিষয়ে জামাল উদ্দিন শাহেদের পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি বলে তাদের দাবি।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যার কথা ছিল কারাগারে থাকার তিনি দিব্যি রাজধানীতে বসে লোক ঠকানোর ব্যবসা করছেন। সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আবার বিপিসির মালিকানাধীন কোম্পানির টাকা চুরি করে তৈরি করা। এসব ঘটনা দেখে হতাশা প্রকাশ ছাড়া আমাদের কিছু বলার নেই।’
