পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সমাজের হালচাল

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ১২:০২ এএম

লকডাউনের সময়। তবু মাঝে মধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের লোকজন দরজায় বেল বাজালে বেশ লাগে। বুঝতে পারি বই বা কোনো ম্যাগাজিন এসেছে। নতুন কোনো বইয়ের গন্ধ শুঁকতে এখনো ছোটবেলার মতো আনন্দ পাই। অনেক দিন খরার পরে বৃষ্টি হলে মাটির সোঁদা গন্ধ আর নতুন বইয়ের মৌতাত এই দুইয়ের কোনো তুলনা নেই। এখন যে বইটি হাতে নিয়ে বসে আছি তার নাম সোহরাওয়ার্দী পরিবার : ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। লিখেছেন আমার খুব প্রিয়জন বহরমপুরের বাসিন্দা, রিটায়ার্ড হেডমাস্টার আলিমুজ্জমান সাহেব।

আমার লেখা যারা পড়েন তারা কেউ কেউ হয়তো খেয়াল করেছেন যে সময় পেলেই আমি অজানা অচেনা জনপদের গল্প করি। হাড়োয়া, দেগঙ্গা, ক্যানিং সুন্দরবনের গ্রাম গঞ্জ বাসন্তি,  গোসাবা, রামগঙ্গা, কুলতোলি, সরবেড়িয়া, মৌসুনি, বালি ইত্যাদি ইত্যাদি। কিম্বা লালগোলা, ডোমকল, জলঙ্গি, জঙ্গিপুর, শেখপাড়া, কাহারপাড়া বা মালদার কালিয়াচক, সুজাপুর, রতুয়া, চাঁচল। ওইসব জনপদে পিছিয়ে পড়া জনগণের জীবনযাপনের মধ্যে সত্যিকারের এক অন্য বাংলাকে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু জনপদের কথা আজ থাক। একটু আধটু মানুষের কথা হোক। যে মানুষগুলোর হাত ধরেই আমার এই বাংলা দেখতে শেখা। আলিমুজ্জমান তেমনি একজন চমৎকার উচ্চশিক্ষিত মানুষ। যাকে কখনো কখনো আমার গ্রন্থকীট মনে হয়। বাড়িতে ঢুকলেই সারি সারি বই। ম্যাগাজিন। অধিকাংশই স্বাধীনতাপূর্ব বাংলার। হলদে ছোপ পড়া আজাদ বা পয়গমের পুরনো কপি। পরম মমতায় বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। বাইরের দুনিয়ার কত কত পরিবর্তন ঘটছে নিয়ত। কিন্তু কার সাধ্য আলিমুজ্জমান স্যারের সারস্বত সাধনায় বিঘ্ন ঘটায়!

সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে যে গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে দিনের পর দিন ধরে গবেষণা করে চলেছেন তা সত্যি কুর্ণিশ করার মতো। অবশ্য ইদানীং কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন যে, যে সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের’ অন্যতম নেতা, তাকে নিয়ে এত চর্চা কেন করেন! আলিমুজ্জমান সাহেব কখনো রাগ করেন না। বলেন ওদের মতো শিক্ষিত পরিবার এদেশে খুব কমই জন্মেছেন। পশ্চিমবঙ্গে বসে আজ সোহরাওয়ার্দী চর্চা কত কঠিন কাজ তা বাংলাদেশে বসে বোঝা মুশকিল। সেকালের সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে বরং পশ্চিমবঙ্গে একালের মুসলিম সমাজের হালচালের কথাই কিছু বলি আজ। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, লেখালেখি আর দেশ দেখে বেড়ানোর সুবাদে কত মানুষের সঙ্গেই পরিচয়, ওঠাবসা। তাদেরই একজন মহিউদ্দিন সরকার ছিলেন পুলিশের বড় কর্তা। এখন বয়েস ছিয়াশির ওপর। প্রায় সকালে ফোন করে খোঁজ নেন শরীর ঠিক আছে কি না! দশ মিনিট কথা বললেই বোঝা যায় যে অগাধ পাণ্ডিত্য মানুষটির। অথচ কখনো তার কোনো প্রকাশ নেই। এমন বিনয়ী ভদ্রলোক খুব কম দেখেছি জীবনে। আর বারুইপুরের সাদুল্লা সাহেব ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক। যখনই কিছু লিখি পরম স্নেহে তা নিয়ে পরামর্শ দেওয়া তার কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকেই বলেন যে আমি এপারের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর একটু বেশি সহানুভূতিশীল। হতে পারে। আসলে মুসলমানের কথা বলে যে ডকুমেন্টারি করেছিলাম তার দৌলতেই সংখ্যালঘু একটা সমাজের সঙ্গে আমার একটু আধটু যোগাযোগ। কতটুকুই বা জানি তাদের অন্দরমহলের কথা! তবে চেষ্টা করি একটা সম্প্রদায়কে যেভাবে এপারে ‘সাম্প্রদায়িক’, এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে তার সত্যাসত্য একটু আধটু যাচাই করে নিতে। কলকাতায় মুসলিম ‘ঘেটো’ নিয়ে কথা বলার লোকের অভাব নেই। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘ঘেটো’ নিয়ে কেউ একটি কথাও বলেন না দেখে অবাক লাগে না! এই তো সেদিন এক তরুণ সাংবাদিক নাজমুল আমার সঙ্গে দেখা করতে কফি হাউজে এলো। ও মুগ্ধ হয়ে পুরো পরিবেশটা দেখছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম আগে কখনো আসোনি এখানে! হাসতে হাসতে জবাব দিল, না স্যার। কেমন যেন ভয় ভয় লাগে!

অথচ কফি হাউজ আমাদের কালচারাল হাব। সংস্কৃতির জমজমাট প্রতিষ্ঠান। সেখানে অঘোষিতভাবে টুপি-দাঁড়ির প্রবেশ নিষেধ! কেউ ঢুকতে বারণ করেনি। তবু এক ভয় সাধারণ গরিব মানুষের কাছে মস্ত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এও একধরনের ঘেটো সংস্কৃতি। স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের এলিট প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন সাধারণের প্রবেশ নিষেধ বলে এক অদৃশ্য বোর্ড ঝোলানো থাকে। প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর, সত্যজিত রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট কোথাও এক দুজনের বেশি মুসলিম ছেলে-মেয়ে পাবেন না। মালদা মুর্শিদাবাদ এমনকি কলকাতাতেও চমৎকার সব লাইব্রেরি আজ হারিয়ে যাচ্ছে। মালদায় একবার পুরনো রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে দেখি দাঙ্গার আগুনে প্রাচীন নথি কিছুই আর নেই। তবু কিছু কিছু মানুষ আজও আছেন প্রচারের পরোয়া না করে পুরনো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে। বহরমপুরের হাসিবুর রহমানকে দেখুন জেলার ইতিহাস ঠোঁটের আগায়। কোন নদী কবে মজে গেছে তাও নিমেষে আপনাকে ও বলে দেবে। হাসিবুর, নজরুল, শাহীন, কবির এরকম উজ্জ্বল ছেলেরা যে কোনো শহরের গর্ব। তেমনি আপনি ফারাক্কা ধুলিয়ানে যান গরিবস্য গরিব ঘর থেকে উঠে আসা স্কুল শিক্ষক ওহীদ রহমানের সঙ্গে দেখা করলে বুঝতে পারবেন নেপথ্যে কীভাবে জেগে উঠছে স্বাধীনতা পরবর্তী মুসলিম সমাজ। ভগবানগোলা যে বৈষ্ণব চর্চার একদা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি তা জানতে গেলে আপনাকে ইবাদুল সাহেবের সঙ্গে আলাপ করতেই হবে। জঙ্গিপুরের বিড়ি শিল্পের ক্রমবিকাশ জানতে আলাপ করুন তাহেরের সঙ্গে। মালদা সীমান্ত, দেশভাগ নিয়ে তো জ্ঞানী শাহনেওয়াজ আলী রায়হান আছেনই। তাছাড়া হাবিব, মাসুম ও মুজাহিদ কিংবা অধ্যক্ষ নুরুল নুরানিরকে একবার ফোন করে নিন।

চমৎকার সব বর্ণময় জনপদ আর কত কত সুন্দর মানুষ। এরকম অজস্র আপাত সাধারণ মানুষের হাত ধরেই আমি একটা সম্প্রদায়ের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি। ভারত হচ্ছে আদতে সমন্বয়বাদী দেশ। তাকে আমাদের দিল্লির শাসকরা এখন একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলতে চাইছে। কিন্তু আমাদের সমন্বয়ের ভিত যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে ইমারত ভাঙা অত সহজ নয়।

যত ঘুরে বেড়াই তত নতুন নতুন মানুষের খোঁজ পাই। তাদের কাছ থেকে শিখি নতুন কত কত বিষয়। কত তরুণ উঠে আসছে লেখক হিসেবে। হাওড়ার ছেলে ইসমাইল দরবেশের তালাশনামা উপন্যাস চমকে দিয়েছে পাঠকদের। মুর্শিদাবাদের খালিদা খানুম কী চমৎকার অণুগল্প লেখে। কিংবা পেশায় ডাক্তার সাফিন আলী সিনেমা করে আবার লেখেও সুন্দর। নতুন গতি ও সহজিয়ার ঈদসংখ্যা হাতে নিলে বুঝতে পারবেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের দ্রুত বদল ঘটছে। নদীয়ার লাবণী জঙ্গির আঁকা কত উঁচুমানের তা না দেখলে বুঝতে পারবেন না। পলাশী কলেজের আবু সিদ্দিকী ও মালদার আইরিন শবনমের গদ্য আমাকে মুগ্ধ করে।

এই বদলে যাওয়া সমাজের বাসিন্দারা যত এগোবে ততই সাম্প্রদায়িক শক্তি ভয় পাবে। ভয় পেয়ে আগডুম বাগডুম বকবে। মিথ্যে বলে বলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি করবে। দাঙ্গা বাধিয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরতে চাইবে। কিন্তু আমি জানি পশ্চিমবঙ্গের সাতাশ শতাংশ মুসলিম আজ সচেতন। প্রতিক্রিয়ার শক্তির যাবতীয় কূটকৌশল তারা ঠিক আটকে দেবে।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত