করোনা পরিস্থিতিতে দেশে বিকাশমান ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর ব্যবসা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশাল ছাড়ে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কিছু কোম্পানিতে সরবরাহকারী ও গ্রাহকের টাকা আটকে গেছে। পণ্য বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে সব ই-কমার্স কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
গতকাল রবিবার বিকেলে ই-কমার্স কোম্পানিগুলো নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে এ কথা বলেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি সম্প্রতি চালু হওয়া ই-কমার্স নীতিমালা মানবে না তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেবে মন্ত্রণালয়। তাদের বিজনেস মডেলগুলো পর্যালোচনা করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুরনো গ্রাহকদের দেনা পরিশোধ না করতে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে।
বাণিজ্য সচিব জানান, কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল যদি দেশের চলমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে ব্যবসা করা সব ই-কমার্স কোম্পানিকে অবশ্যই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন এবং বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) সংগ্রহ করতে হবে। এর পাশাপাশি ফেইসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোকেও বিআইএন সংগ্রহ করতে হবে। বিআইএন নিতে কেউ ব্যর্থ হলে বিটিআরসির মাধ্যমে তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা করতে গেলে তাকে অবশ্যই বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমরা একটি সেন্ট্রাল নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখব। সেখান থেকে ইউনিক বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর নিতে হবে প্রত্যেককে। এটি সহজ একটি নিবন্ধন প্রক্রিয়া হবে, অনলাইনের মাধ্যমে সবাই এ নিবন্ধন নিতে পারবে। এটি যখন সম্পূর্ণ হবে, রেজিস্ট্রেশনবিহীন যে কোম্পানিগুলো ব্যবসা করছে তা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য আমরা বিটিআরসিকে অনুরোধ করব।
সচিব বলেন, ‘ফেইসবুকের মাধ্যমে করা ব্যবসা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। তবে কে কী ব্যবসা করছে, সামগ্রিকভাবে এটি যাতে সরকারের তথ্য-ভান্ডারে থাকে, সেজন্য যারা ফেইসবুকে ব্যবসা করবেন তাদেরও বিআইএন নিতে হবে। আমরা সব জায়গায় এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দেব। একটা পর্যায়ে আমরা এটা বাধ্যতামূলক করব। এতে একটু সময় লাগবে। সফটওয়্যার ডেভেলপ এবং প্রচার করতে হবে। সবাইকে এটা জানতে হবে। আমরা ব্যবসা বন্ধ বা সীমাবদ্ধ করতে চাই না। যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করে তারপর নিবন্ধনের ব্যবস্থা আমরা করব। এজন্য এক-দুই মাস সময় লাগবে।’
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারিত হন তাহলে তিনি প্রচলিত আইনে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আদালত ঠিক করে দেবেন তিনি কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন। আদালত থেকে একটি নির্দেশনা আসতে হবে ভোক্তাদের অর্থ কীভাবে উদ্ধার করা যাবে। কোম্পানির ব্যাংক হিসেবে যদি টাকা থাকে সেটা উদ্ধার করে ভোক্তাকে দিতে হলেও আদালতের নির্দেশনা লাগবে বলে জানান বাণিজ্য সচিব।
ইভ্যালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল ইভ্যালির ৬৫ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে। এর বাইরে ওই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আছে কি না, আমরা এখনো জানি না। বাইরেও সম্পদ থাকতে পারে। এ বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্ত চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। আমার মনে হয় সেই তদন্তে প্রকৃত সম্পদ কত আছে সেটা জানার পর এটার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো যদি নির্ধারিত প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি কিংবা রিফান্ড না দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহককে মামলা করার পরামর্শ দেন বাণিজ্য সচিব। তিনি বলেন, যেসব গ্রাহক প্রতারিত হয়েছেন তারা প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। কারণ ব্যবসায়ী অথবা ভোক্তা, উনি যদি প্রতারিত হন দেশে কিন্তু প্রতারণার জন্য পেনাল কোড অনুযায়ী আইনগত আশ্রয় নিতে পারেন।
ই-ক্যাবের মহাসচিব আবদুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘কিছু কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছি। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ১০টি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হবে। তারা নতুন পলিসি গ্রহণ করেছে কি না এবং কীভাবে তারা টাকাটা পরিশোধ করবে, আমরা জানতে চেয়েছি। তাদের বিজনেস মডেলটা কী হবে, তা-ও জানতে চেয়েছি।’
