করোনাকালে ঈদ ও জীবনের দায়

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২১, ০৯:৩৪ পিএম

জমিদার বাবুর বাগানে একটি বৃক্ষ ছিল। ত্রিশ বছরেও ফল দেয়নি। এই প্রথম ফলে ফলে ভরে গেল। বাহারি রঙে ঝলমল করছে। যে দেখে তারই একটি ফল পাওয়ার লোভ হয়। জমিদার বাবু জেনেছেন এটি বিষবৃক্ষ। এই ফল মুখে দিলেই মৃত্যু অনিবার্য। তাই জমিদার জনস্বার্থে পাহারা বসিয়েছেন। কেউ যাতে বাগানের ত্রিসীমানায় না আসে। মানুষকে বোঝানোও হলো। কিন্তু অবুঝ মানুষ উল্টো বুঝল। ভাবল তাদের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। রক্ষীদের বাধা কেউ মানতে চায় না। বিরক্ত হয়ে জমিদার বাধা সরিয়ে নিলেন। খুলে দেওয়া হলো বাগানের দরজা। ফল পাড়ার মচ্ছবে মেতে গেল মানুষ। ফল মুখে দিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগল।

আমাদের দশাও তাই। বিষবৃক্ষ নামের করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। নিজেদের বাঁচার প্রধান পথ ঘরবন্দি থাকা। এ সত্য নানাভাবে প্রচার করা হচ্ছে। তবুও এক শ্রেণির মানুষ বুঝতে চাইছে না। নানা অর্থনৈতিক সংকট তাদের বুঝতেও দিচ্ছে না। তারপরও সচেতন মানুষ যারা তারা চেষ্টা করছেন লকডাউন বা বিধিনিষেধ মানতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে মানুষকে ঘরে রাখতে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাতে। শতভাগ সফল না হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণেই চলছিল। করোনা সংক্রমণের প্রথম বছর বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন আমাদের দেশে মে মাসে ভাইরাস ছড়ানোর প্রকোপ বেশি বাড়বে। সুতরাং অন্তত ঈদ পর্যন্ত যদি মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হতো, যদি ঘরে আটকে থাকার চেষ্টা করা হতো তবে হয়তো করোনা সংক্রমণের গতি অনেকটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব হতো। কিন্তু সে সময় থেকে কোনো ঈদযাত্রাতেই আমরা নাড়ির টানে ছুটে চলা মানুষকে থামাতে পারিনি।

কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারকরা নানা তাপ চাপে গল্পের জমিদার বাবুর মতো বিরক্ত হয়ে উল্টো সিদ্ধান্ত নিলেন। সংক্রমণ ছড়ানোর এই কঠিন সময়ে যখন মানুষকে আরও কঠিনভাবে ঘরবন্দি রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তখনই পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হলো। স্রোতের মতো শ্রমিকরা আসতে থাকল শহরে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় এই অবস্থায় সামাজিক দূরত্ব মানা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কঠিন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। দেশে করোনা পরীক্ষার চরম দুর্বলতার সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সরকারি হিসাবেই একশ’র নিচে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে দুইশ ছাড়িয়ে গেল।

তবে আমাদের মতো দেশে যতই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা বলি না কেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যরে জায়গাটি এখনো অনেক দুর্বল। এই সংকটে এসে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে করোনার প্রভাবে আর ৮০ লাখ থেকে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। তাই এই সময়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে বেরুনোও খুব জরুরি। স্বাস্থ্য খাত ও সুষম বণ্টনের বিচারে দেশের অর্থনৈতিক খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাই বর্তমান মহাসংকটে এই দুই খাত যথেষ্ট চাপের মুখে। সরকার শুরু থেকেই যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে পরিস্থিতি মোকাবিলায়। এই সময় নানামুখী তাপ-চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করে সু-পরামর্শের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল। দেশের অর্থনীতির চাকা কিছুটা সচল রাখা আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য জরুরি। যেখানে উন্নত ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার স্বার্থে ধীরে ধীরে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দরজা একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে শিথিল করছে লকডাউন সেখানে আমরা হাত-পা ছেড়ে বসে থেকে নিজেদের কি রক্ষা করতে পারব? কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের দেশের বাস্তবতার বিষয়টিও ভাবনায় রাখতে হবে। বিপুল জনসংখ্যার ছোট্ট দেশ এটি। মুখে বলতে পারলেও বাস্তব কারণেই ক্ষুদ্র আয়ের মানুষদের চাকরি বাঁচাতে ও ক্ষুধার অন্ন জোগাতে স্বাস্থ্যবিধি মানা কঠিন। এই অবস্থায় দেশের অর্থ কাঠামো বাঁচাতে যদি তাড়াহুড়োয় মহামারীর পথ প্রশস্ত করে দিই তাহলে ব্যাপক নৈরাজ্য তৈরি হবে। তেমন অবস্থায় অর্থনীতির সব চাকাই শ্লথ হওয়ার কথা। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত করা। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেশজুড়ে হুমকি ছড়িয়ে দিল। মৃত্যু আর সংক্রমণের মিছিল বড় হতে লাগল।

কোনো চিন্তাই আমরা দূরদর্শিতা নিয়ে করি না। মুশকিল হচ্ছে ঠেকেও শিখতে চাই না। যেমন যখন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দোকানপাট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়ে মানুষকে কঠোরভাবে ঘরবন্দি থাকার কথা বলা উচিত ছিল তখনই ‘ছুটি’ ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। যেদেশের মানুষ সাপ্তাহিক বন্ধের সঙ্গে এক-দুদিন ছুটি পেয়ে গেলে শহর ছেড়ে গ্রামের টানে ছুটে সেখানে এমন লম্বা ছুটিতে তারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে এটিই স্বাভাবিক। এই সত্য বিবেচনায় না এনে লাগামছাড়া হয়ে করোনা ছড়িয়ে দেওয়ার পথ করে দেওয়া হলো। আমাদের বুঝতে হবে পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী দর্শন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োগ করায় অনেক অসুবিধা রয়েছে। আমরা আমাদের সম্পদকে যদি প্রধান পুঁজি মনে করি আর জনসম্পদকে প্রধান চালিকাশক্তি মনে করি তাহলে বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিকে আমলে এনে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন পথ আমাদেরই রচনা করতে হবে। জীবন থাকলে জীবিকার পথ নির্দেশনা পাওয়া যাবেই।

একটি বাস্তবতা তো আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে সাধারণ মানুষের বড় অংশই করোনা মোকাবিলায় দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারছে না। স্বল্প শিক্ষিত থেকে শুরু করে শিক্ষিত তরুণ বা বয়সী অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাচ্ছেন না। মাস্ক ব্যবহারে অনীহা অনেকের। কিন্তু করোনাভাইরাস তো ছেড়ে কথা বলবে না। একজন অবিবেচক মানুষ শতজনকে সংক্রমিত করবে। বা নিজে সংক্রমিত হবে। এজন্য আমরা বলতে চাই বৃহত্তর কল্যাণের জন্য বলপ্রয়োগে হলেও বিধি মানতে বাধ্য করতে হবে। কিন্তু যারা বাধ্য করাবে তারা কতটা সচেতন? দুদিন আগে আমি কুরবানির পশু কেনার জন্য হাটে গিয়েছি। আমার ছাত্র হাসিল ঘরে আমাকে বসিয়ে পশু কেনার জন্য ভেতরে যায়। হাসিল আদায়ের জনাপাঁচেক লোক ভেতরে বসা আর হাটের নিরাপত্তা ও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর জন্য ৭-৮ জন পুলিশ সদস্য শামিয়ানার নিচে বসা। আমি কারও মুখেই মাস্ক দেখলাম না। পুলিশ সদস্যরা মাঝে মাঝে ঝাল-মুড়িওয়ালা ডেকে ঝাল-মুড়ি খাচ্ছিলেন।  এসব খ- চিত্রে স্পষ্ট হয় নিজেরাই যদি নিজেদের সতর্ক না করি অন্য কেউ আমাদের সুপথে আনতে পারবে না।

এখনকার কঠিন বাস্তবতায় ঈদযাত্রায় উৎসে ফিরে যাওয়া এদেশের সব মানুষেরই বোঝা উচিত আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এখন ভয়ংকর সংকটের মুখোমুখি। বড় শহরগুলোর বাইরে প্রায় ৩৫টি হাসপাতালে কোনো আইসিইউ বেড নেই। মারাত্মক অক্সিজেন সংকট রয়েছে। ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগী উপচে পড়ছে। তাহলে তো নতুন সংক্রমিত রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় বেঘোরে প্রাণ দেবে! এসব বাস্তবতা দেখে ও শুনে অবোধ মানুষের মধ্যে বোধ ফিরে এলেই রক্ষা। ঈদ আনন্দ তো আমরা করবই। ধর্মীয় কর্তব্য ও সামাজিকতার দায়ে পশু কুরবানিও দেব। তবে এর সঙ্গে জীবনের দায় নিয়ে ভাবতে হবে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক চা বিক্রি করে পাঁচজনের সংসার কায়ক্লেশে নির্বাহ করেন। তার চায়ের বড় ক্রেতা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দেড় বছর বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থীশূন্য। এভাবে বিশ^বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যেসব ক্ষুদ্র পেশাজীবী আছেন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রথম বছর করোনার ধাক্কার পর আমরা অনেকেই আর্থিক সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। এবার লক্ষ করলাম সাহায্যের হার অনেক কমে গেছে। ব্যক্তিগতভাবে সবাই কমবেশি সংকটে আছে। এই মানুষগুলোকে রক্ষা করার জন্য সরকারকেই ভূমিকা রাখতে হয়। কিন্তু আমার জানা ও শোনা মতে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার অভিজ্ঞতা এদের অনেকেরই নেই।

এদের একটি অংশ ঈদযাত্রায় গ্রামমুখী হচ্ছে। যদি চেয়েচিন্তে সেখানে বাঁচা যায়। দেশে যে সামর্থ্যবান মানুষ নেই তেমন নয়। না হলে কুরবানির হাটে পাঁচ থেকে পঁচিশ লাখ টাকায় এক একটি গরু বিক্রি হতো না। সমাজের এমন ধারার মানুষ যদি ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে সাধারণ প্রান্তিক মানুষের মধ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন তা হলে মানবতাকে সম্মান জানাতে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না।  ধর্মীয় দৃষ্টিতে তাত্ত্বিক ও আদর্শিকভাবে কুরবানি ত্যাগেরই মহিমা প্রচার করে। এদেশ তো ক্রমে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে। রাজনৈতিক, আমলাতন্ত্রিক ও ব্যবসায়িক দুর্নীতি অতীত রেকর্ড প্রায় ভেঙেই চলছে। বহু সহস্র কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে। সর্ষেতে ভূত থাকায় একে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন। তাই এই শ্রেণি যত স্ফীত হবে ততই কৃশকায় হতে থাকবে সাধারণ মানুষ। করোনা মহামারীর থাবায় বিপর্যস্ত এখন এই সাধারণ মানুষই।

আমরা আহ্বান জানাতে চাই কুরবানির মাহাত্ম্য হৃদয়ে ধারণ করে সরকারসহ সামর্থ্যবান সবাই যদি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন তবে প্রান্তিক মানুষের হতাশা অনেকটা কেটে যাবে। এমন পরিবেশ মানুষকে আত্মচৈতন্যে ফিরিয়ে আনবে। স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসঙ্গটি এর সঙ্গেই যুক্ত। আমরা ঈদের সওগাত হিসেবে এমন সম্ভাবনার আলোই দেখতে চাই। 

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত