ঈদকেন্দ্রিক লেনদেনে চাপ কলমানিতে নেই উত্তাপ

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ০১:৩১ এএম

কোরবানির ঈদ কাল বুধবার। ঈদের আগে ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন শেষ হয়েছে গতকাল সোমবার। এদিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ টাকা তুলতে ব্যাংকে ভিড় করেন অসংখ্য গ্রাহক। সকাল থেকেই রাজধানীর প্রতিটি ব্যাংক শাখার ক্যাশ কাউন্টারের সামনে ছিল গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি। এ সময় কেবল টাকা তোলার চাপ নয়, ছিল টাকা জমা দেওয়ারও তাড়া।

সোমবার রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, দৈনিক বাংলা, পল্টন, কারওয়ানবাজার, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যাংকের শাখাগুলো ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

টাকা জমা বা উত্তোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন চালানপত্র, ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সেবার বিল জমা দেওয়ার লাইনও লক্ষ করা গেছে। এদিকে অতিরিক্ত গ্রাহকের চাপে ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারের কর্মকর্তাদের ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে।

বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন জানান, কোরবানির হাট-সংলগ্ন কিছু শাখায় রাত ৮টা পর্যন্ত লেনদেন হলেও অন্যান্য শাখায় ৪টার মধ্যে লেনদেন সম্পন্নের নির্দেশনা রয়েছে। এ কারণে সকাল থেকেই গ্রাহকের চাপ ছিল। স্বাভাবিক দিনের চেয়ে দ্বিগুণ লেনদেন হচ্ছে, এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া শিল্পকারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার জন্য কারখানা মালিকদের অনেকেই টাকা তুলতে আসেন ব্যাংকে।

মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের লোকাল অফিসের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজ জানান, ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে সব সময় গ্রাহকের ভিড় থাকে। এ জন্য আগে থেকেই তাদের প্রস্তুতি ছিল। নগদ টাকার কোনো সংকট নেই। গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারছেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রাহকদের চাপে সেবা দিতে কর্মকর্তাদের একটু বেগ পেতে হচ্ছে, তারপরও যথাসম্ভব করোনার স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন করে আমরা সেবা দিচ্ছি।’

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, কোরবানির ঈদের আগে বিত্তবানরা ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলে পশু কিনে থাকেন। এ জন্য ঈদের আগে শেষ লেনদেনে ব্যাংককে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা সরবরাহ করতে  বিপাকে পড়তে হয়। তবে এবার করোনা মহামারীর মধ্যে দেশের ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণে তেমন গতি নেই। অনেক ব্যবসায়ী এখন নতুন করে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। পুরনো ব্যবসাও মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে গত কয়েক মাস ধরেই ব্যাংকে ঋণযোগ্য তহবিল পড়ে থাকছে। ফলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানি মার্কেট) থেকে বাড়তি সুদে টাকা ধার করতে হচ্ছে না ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গতকাল সোমবার কলমানি মার্কেট থেকে ৩ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো, যা গত সাত কর্মদিবসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন। এর আগে সবচেয় বেশি লেনদেন হয় গত রবিবার। ওইদিন কলমানি মার্কেট থেকে ৩ হাজার ১৭ কোটি টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো। সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৫.২৫ শতাংশ। সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ১ শতাংশ।

অথচ ২০১০ সালে কোরবানির ঈদের আগে কলমানি মার্কেটের সুদহার ২০০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। ওই বছর একটি বেসরকারি ব্যাংক ১৯০ শতাংশ সুদে অন্য একটি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা ধার নিয়েছিল। এরপর অবশ্য আর কখনো কলমানির সুদের হার খুব একটা বাড়তে দেখা যায়নি। ২০১২ সালে ঈদের আগে ১৫ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল কলমানি মার্কেটের সুদহার। এরপর থেকে কলমানির সুদহার ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

কলমানি মার্কেট থেকে সাময়িক সময়ের জন্য এক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ টাকা ধার করতে পারে। এক থেকে সাত দিনের জন্য এই ধার পাওয়া যায়।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলমানি মার্কেটের সুদহার এবার আর বাড়ার সুযোগ নেই। অধিকাংশ ব্যাংকের কাছেই পর্যাপ্ত টাকা রয়েছে। করোনার মধ্যেও ব্যাংকে আমানত আসছে। সেই তুলনায় বিনিয়োগ কম। ব্যাংকের কাছে অলস তারল্য জমা থাকছে।’

ঈদের আগে আজ মঙ্গলবার থেকে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক বন্ধ থাকলেও পোশাক শিল্প এলাকায় আজ ব্যাংক সীমিত আকারে খোলা থাকবে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পশুর হাট-সংলগ্ন ব্যাংকের শাখায় বিশেষ ব্যবস্থায় আজ রাত ৮টা পর্যন্ত ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেন করা যাবে।

তবে ঈদের তিন দিনের ছুটির সঙ্গে দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এবার টানা পাঁচ দিন ব্যাংক বন্ধ থাকছে। এই ছুটির মধ্যে ব্যাংকের এটিএম বুথের ওপর নির্ভর করতে হবে গ্রাহকদের। এ কারণে এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ টাকা মজুদ রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা সার্বক্ষণিক চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত