ঈদুল আজহার চতুর্থ ও ‘কঠোর লকডাউনের’ দ্বিতীয় দিনে গতকাল শনিবার সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে আসতে শুরু করেছে লবণজাত চামড়া। কোরবানির চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ডব্লিউটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ। তবে ধারণক্ষমতা কম থাকায় ট্যানারিগুলোকে ভাগ করে সিইটিপি ব্যবহার করতে হবে।
সক্ষমতা অনুযায়ী একদিনে চামড়াশিল্প নগরীর অর্ধেক প্রতিষ্ঠান সিইটিপি ব্যবহার করতে পারবে। এসময় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো পানির ব্যবহার ছাড়া চামড়ার প্রক্রিয়ার কাজ করবে। এভাবে পালাক্রমে সিইটিপি ব্যবহার করতে পারবে ট্যানারিগুলো।
সাভার চামড়াশিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জিতেন্দ্র নাথ পাল বলেন, ‘কোরবানির মৌসুমে ট্যানারির মালিকদের সব ধরনের সহযোগিতা এবং সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। আমাদের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারটি (সিইটিপি) পাঁচ বছর ধরে চলার কারণে এটি অপরিষ্কার ছিল। ঈদ সামনে রেখে নতুন করে সিইটিপি পরিষ্কার করায় আর কোনো সমস্যা নেই। এটি এখন ফাংশনাল, তবে সিইটিপির দু-একটি ইউনিট এবং মেশিনারিজে কিছু ত্রুটি থাকলেও আমাদের সিইটিপি ফাংশন করতে কোনো সমস্যা হবে না।’
তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কারখানার মালিকপক্ষ যেন অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলতে না পারে সে জন্য আমাদের লোকজন ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে আছে। এ ছাড়া একসঙ্গে সব কারখানা চামড়া প্রসেসিং করা কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি যখন সিইটিপিতে ছেড়ে দেয়, তখন সেটা ওভারফ্লো হয়ে ড্রেন দিয়ে চলে যায়।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সিইটিপির ধারণক্ষমতা প্রতিদিন ২৫ হাজার কিউবিক মিটার। বছরের বেশিরভাগ সময় আমাদের ২০ হাজার কিউবিক মিটার পর্যন্ত বর্জ্য শোধন করতে হয়। কিন্তু কোরবানির মৌসুমে সেটি ৪০ থেকে ৫০ হাজার কিউবিক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ জন্য আরও একটি আধুনিক সিইটিপি নির্মাণের জন্য প্রকল্প হাতে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওভারফ্লো যেন না হয়, সে জন্য এবার কারখানাগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর ফলে একই সময়ে ৬০টির বেশি কারখানা সিইটিপিতে পানি ছাড়তে পারবে না। যখন ৬০টি কারখানা পানি দিয়ে কাজ করবে, তখন বাকি ৬০টি কারখানা পানির ব্যবহার ছাড়া যেসব কাজ আছে, সেগুলো করবে। একইভাবে এই ৬০টি কারখানা যখন পানির কাজ করবে, তখন আগের ৬০টি কারখানা অন্য কাজ করবে।’
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে বর্তমানে প্রায় ১২৫টি ট্যানারি চালু রয়েছে। গতকাল থেকে বিভিন্ন ট্যানারিতে লবণজাত চামড়া আসতে শুরু করেছে। আবার কোনো কোনো ট্যানারিতে কিছু চামড়ায় লবণ মাখতে দেখা গেছে। লবণজাত চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্যানারির মালিকরা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা ট্যানারির মালিকরা বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ করছি। গতকাল শম্ভুগঞ্জে প্রথম চামড়ার হাট ছিল, সেখান থেকেও আমরা চামড়া সংগ্রহ করছি। এভাবে আগামী দুই মাস আমরা একটানা চামড়া সংগ্রহ করব। মূলত আমরা রক্তমাখা চামড়াটা কম সংগ্রহ করি। এ ছাড়া সারা দেশে খোঁজ নিয়ে দেখেছি গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনেক ভালোভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে সরকারের দুটি সংস্থা শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি মনিটরিং করায় এ সফলতা এসেছে। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘চামড়া পচনশীল বস্তু। এটিকে অতিদ্রুত সংরক্ষণ করা হলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়ার যে দাম বেঁধে দিয়েছে, আমরা সেই দামেই চামড়া কিনব। আমাদের চামড়াশিল্প নগরীর প্রায় ১২৫টি ট্যানারি প্রস্তুত রয়েছে। এখানে চামড়া প্রসেসিংয়ে কোনো সমস্যা নেই। সিইটিপির অবস্থাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। ইতিমধ্যে সিইটিপি পরিচালনার জন্য কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই বর্তমানে সিইটিপি পরিচালনা করা হচ্ছে।’ এ ছাড়া বহির্বিশে^ করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় ছয় মাস ধরে চামড়া রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে দাবি করে আগামী বছরে ট্যানারির মালিকরা ব্যবসায়িক দুরবস্থা কাটিয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সলিড বর্জ্যরে বিষয়ে জিতেন্দ্র নাথ পাল বলেন, ‘কোরবানির সময় প্রতিদিন চামড়াশিল্প নগরীতে ১৫০-১৬০ টন সলিড বর্জ্য তৈরি হয়; যা অন্যান্য সময় ৬০-৭০ টন হয়। গড়ে প্রতিদিন ৮০-৯০ টন সলিড বর্জ্য তৈরি হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে সলিড বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য আমরা দুটি ইনডোর ডাম্পিং শেড করেছি, যেখানে এই বছরের সব সলিড বর্জ্য রাখা যাবে। তবে এটাই কিন্তু সমাধান নয়। ডাম্পিংয়ের জন্য যে সলিড বর্জ্যগুলো রয়েছে, সেগুলোকে রি-ইউজড রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য আমরা একটি প্রকল্প নিয়েছি। সেটি ডিপিপি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্ল্যানিং কমিশনে গেছে। প্ল্যানিং কমিশন কিছু অবজারভেশন দিয়েছে, সেগুলো ঠিক হলে আরেকটি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।’ পাশাপাশি আরও একটি আধুনিক সিইটিপি নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
