করোনা মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানে সহায়তা দিতে সম্প্রসারণমূলক ও সংকুলানমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই মুদ্রানীতিতে জাতীয় বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী ৭ দশমিক ২ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনে আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার প্রয়োজনীয় ভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার মুদ্রানীতির বিবরণীর ওপর লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির এ কথা বলেন। করোনা মহামারীর কারণে এবারও মুদ্রানীতি বিবরণী প্রকাশের অনুষ্ঠান বর্জন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট সব মহলের অবগতির জন্য এ সংক্রান্ত বিবরণী ও গভর্নর ফজলে কবিরের লিখিত বক্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, দুই বছর যাবৎ করোনার প্রভাবে মানুষের হাতে নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের আয়গতি নিম্নমুখী থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাপক অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর বার্ষিক নিরাপদ সীমা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর এই লক্ষ্য অর্জনে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ; যার মধ্যে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ৭৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্য নিট ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা বা বার্ষিক ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ বৃদ্ধির সংকুলান রাখার কথা জানান গভর্নর।
এতে ব্যাংকিং খাতে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৫ ও ১০ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে কভিড মহামারীকে দায়ী করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সরকার কর্র্তৃক ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে বিশেষত জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক হারে ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারকে প্রদত্ত নিট ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ বছরব্যাপীই কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেকটা নিচে ছিল। পাশাপাশি রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত নগদ ও তরল সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলসহ অধিকাংশ পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে লেনদেন ভারসাম্যের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি গত অর্থবছরের তুলনায় অনেকটা কম হবে বলে ধারণা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উল্লেখ্য, ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয় ও রেমিট্যান্স অন্তঃপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ১৩, ১৩ দশমিক ৫ ও ২০ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এর ফলে চলতি হিসাবে ২৫৭ কোটি ডলার ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও আর্থিক হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্তের ফলে সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে ৫১০ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত থাকবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে, যা দিয়ে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী দেশের ৭ দশমিক ১ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে বলে জানান গভর্নর ফজলে কবির।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যখন করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিতে একটি আতঙ্কময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতির আওতায় গৃহীত নীতি সহায়তার ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ও তরল সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও করোনা মহামারীর প্রভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো প্রয়োজনীয় মাত্রায় ঘুরে দাঁড়ায়নি।
এরূপ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের নগদ সংরক্ষণ অনুপাত বা সিআরআর কমানোসহ বিগত মুদ্রানীতিতে যেসব শিথিলতা আনা হয়েছিল তা পর্যায়ক্রমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন মুদ্রানীতিতে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রসার না ঘটিয়ে অধিক উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানসহায়ক খাত ও উদ্যোগসমূহে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে । গভর্নর বলেন, চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি জোরদারকরণ। অর্থনীতির অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতসমূহ যেমন কৃষি, সিএমএসএমই, বৃহৎ শিল্প, রপ্তানিমুখী শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ইতিমধ্যে গৃহীত পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বর্ধিতকরণের পাশাপাশি করোনার কারণে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যেমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল ও রেস্টুরেন্টের কর্মচারী এবং বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষা খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালুকরণ। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক গঠিত ৫০০ কোটি টাকার এবং তফসিলি ব্যাংকসমূহের পরিচালন মুনাফার ১ শতাংশ নিয়ে গঠিত স্টার্টআপ ফান্ডের আকার পর্যায়ক্রমে বর্ধিতকরণ; সিএমএসএমই খাতসমূহ, বিশেষ করে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্লাস্টার অ্যান্ড ভ্যালু চেইন এবং নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে ব্যাংকের অর্থায়ন বৃদ্ধিকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম কার্যকরভাবে চালুকরণ এবং অর্থনীতিতে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকগুলোর ন্যূনতমসংখ্যক নিজস্ব জনবল দ্বারা প্রযুক্তিনির্ভর উপশাখা খোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গভর্নর জানান, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পূর্ববর্তী লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করে। এই আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকও অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকার ধারণ করার পাশাপাশি করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার কর্র্তৃক গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা এবং যাতায়াতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুনরায় মন্থর গতি দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে মুদ্রা ও ঋণ কর্মসূচির অধিকাংশ চলকসমূহের প্রবৃদ্ধির গতি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কিছুটা শ্লথ থাকে, যা মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্যসমূহ কাক্সিক্ষত হারে অর্জনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
গৃহীত এসব ব্যবস্থার ফলে বার্ষিক গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরের ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কমে জুন ২০২১ শেষে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে আসে। মূলত বাজারে ভোজ্য তেল, মসলা, চিনি ও মোটা চালের দাম বৃদ্ধির ফলে খাদ্য উপসূচকে মূল্যস্ফীতির হার বেশি হওয়ায় সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতি মুদ্রানীতিতে নির্ধারিত ৫ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা না গেলেও মুদ্রানীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত কোর মূল্যস্ফীতির হার এবং খাদ্যবহির্ভূত উপসূচকে মূল্যস্ফীতির হার সন্তোষজনক পর্যায়ে সীমিত ছিল বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ ছাড়া ব্যাংকের কর্মীদের বিষয়ে গভর্নর বলেন, ইতিমধ্যে মহামারীর এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ জনসহ যে ১৫৩ জন ব্যাংকার মৃত্যুবরণ করেছেন, আমি তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।
