এক মাস ধরে শনাক্ত হার ৩০ শতাংশের ঘরে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২১, ০২:০৭ এএম

দিন যত যাচ্ছে, দেশে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি শঙ্কার বিষয় হয়ে উঠেছে সংক্রমণের হার। ৩০ দিন ধরে পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার ২৯-৩০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। অথচ এত উচ্চ হারে সংক্রমণ এত দিন ধরে একটি জায়গায় স্থির থাকার রেকর্ড এটাই প্রথম।

এর আগে দুই সপ্তাহ ধরে দৈনিক সংক্রমণের হার ছিল গড়ে ২৩ শতাংশ করে। সে সময়ে ১৯-২৭ শতাংশের মধ্যেই শনাক্তের হার ওঠানামা করেছে। কিন্তু গত ৪ জুলাই তা এক লাফে প্রথম ২৯ শতাংশের ঘরে ওঠে এবং ৩০ দিনে দৈনিক গড় শনাক্তের হার দাঁড়ায় ৩০ শতাংশে। এ সময় এক দিন সর্বোচ্চ রেকর্ড ৩৩ শতাংশ ও দুদিন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশের ঘরে ছিল। এরপর সাত দিন ৩১ শতাংশের ঘরে, ৯ দিন করে ১৮ দিন ২৯ ও ৩০ শতাংশের ঘরে এবং এক দিন করে ২৮ ও ২৭ শতাংশের ঘরে সংক্রমণ ছিল।

সংক্রমণের এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি গতকাল সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক মাস ধরে সংক্রমণ ‘সমান্তরাল’ অবস্থায় রয়েছে। সে হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, আমরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে না গেলে পরিস্থিতিকে সহনশীল বলতে পারব না। এর বেশি হলেই আমরা মহামারী লেভেলে থাকব।’

একইভাবে টানা ৩০ দিন ধরে দৈনিক ৩০ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হওয়াকে সংক্রমণের জন্য ‘বিপজ্জনক মাত্রা’ বলে মন্তব্য করেছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি গতকাল সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর অর্থ দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখনো বিপজ্জনক মাত্রায় আছে। শনাক্তের হার ৩০ শতাংশের ঘরে থাকাটা ‘আদর্শ অবস্থা না’। শনাক্তের হার ৭-৯ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। এতে রোগীর সংখ্যা বাড়বে। কিন্তু মোটামুটি বলা যায় যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষা করা যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষার আদর্শ সূচক হচ্ছে শনাক্তের হার ৭, ৮ ও ৯ শতাংশের ঘরে থাকবে। শনাক্তের হার এর বেশি হলে বুঝতে হবে যে সংক্রমণ অনুপাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষা হচ্ছে না।

এমন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৯৮৯ জন রোগী শনাক্তের এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৪৬ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১২ লাখ ৮০ হাজার ৩১৭ জন এবং মৃত্যু ২১ হাজার ছাড়িয়ে দাঁড়াল ২১ হাজার ১৬২ জনে।

গতকাল শনাক্তের হার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ ৩০ দিন ধরেই দৈনিক প্রতি ১০ জনের মধ্যে তিনজনের করোনা পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। সে হিসাবে এক মাস ধরে গড়ে দৈনিক রোগী শনাক্ত হচ্ছে ১১ হাজার ৪৬৯ জন ও মারা যাচ্ছে ২০৮ জন করে। এই ৩০ দিনে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬১ জন ও মারা গেছেন ৬ হাজার ২৫০ জন।

মৃত্যু ২১ হাজার ছাড়াল : গত পাঁচ দিনে আরও এক হাজার মানুষ করোনায় মারা গেলেন। দেশে কভিডে মৃত্যুর মোট সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল ২১ হাজার। হিসাব করে দেখা গেছে, দিন যত যাচ্ছে, হাজার মৃত্যুর ব্যবধান ততই কমছে। গত ১৪ জুলাই মোট মৃত্যু ১৭ হাজারের ওপরে উঠেছিল। পরের পাঁচ দিনে সেটা ১৮ হাজারের ওপরে ওঠে ১৯ জুলাই, পরের পাঁচ দিনে তা আরও এক হাজার বেড়ে ১৯ হাজারের ওপরে ওঠে। কিন্তু এরপর চার দিনেই এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় ও ২৮ জুলাই মোট মৃত্যু ২০ হাজার ১৬ জন হয়। পরে গত পাঁচ দিনে আরও এক হাজারের বেশি মানুষ করোনায় মারা যান।

৩০ দিনে আগের সব মাসের রেকর্ড ভেঙেছে : দেশে করোনার সংক্রমণের ১৭ মাসের মধ্যে গত এক মাসে সব মাসের চেয়ে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও রোগী শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে। গত জুলাই মাসে যেখানে দৈনিক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৮৬৪ জন করে এবং দৈনিক মারা গেছেন ১৯৯ জন করে; সেখানে সর্বোচ্চ মাস এপ্রিলে দৈনিক রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯২৮ জন ও দৈনিক মৃত্যু ৮০ জন করে এবং গত জুনে দৈনিক রোগী শনাক্ত ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ জন ও মৃত্যু ৬৩ জন করে। সে হিসাবে গত এক মাসে দৈনিক রোগী ছিল জুলাইয়ের দ্বিগুণের বেশি ও মৃত্যু আড়াই গুণ বেশি এবং এপ্রিলের চেয়ে রোগী ও মৃত্যু তিন গুণের বেশি।

 ৫ শতাংশের নিচে এলে সহনীয় : শনাক্ত হারের সহনীয় পর্যায় কোনটা জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সহনীয় বলতে কিছু নেই। এটার একটা রেফারেন্স আছে যে ইউরোপে যখন বাচ্চাদের স্কুল খুলতে চেয়েছিল, তখন ইউরোপের সিডিসি (সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, অন্ততপক্ষে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে গেলে স্কুল খোলা যেতে পারে। করোনাভাইরাসের নিরাপদ শনাক্তের হার ‘জিরো’। করোনাভাইরাস একটা রাখাও নিরাপদ না। এই ভাইরাসের নিরাপদ মাত্রা হচ্ছে ‘জিরো ফর ফোর উইক’, অর্থাৎ চার সপ্তাহ বা দুইটা ইনকিউবেশন পিরিয়ড যদি শনাক্তের হার শূন্য থাকে, তাহলে সেটাকে বলা যাবে যে এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি।

এই বিশেষজ্ঞ জানান, শনাক্তের হার ৫ শতাংশ হলে স্কুল খোলা যায়। তবে সেটাও স্থিতিশীল হলে অন্তত দুই সপ্তাহ দেখতে হবে। এমনকি এ সময় মানুষের চলাচল করা ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারি। গণপরিবহনে মাস্ক পরে ওঠা যেতে পারে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পারি।

এ মাসের মাঝামাঝিতে আরেকটা পিকের আশঙ্কা : এখন আমরা অনেক খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি, জানিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শনাক্ত ৩০ শতাংশের ওপরে উঠলেই ‘পিক’ জোন বলা যায়। এক মাস ধরে সেই পিক জোনে আছি এবং এটা আরও ওপরে ওঠার আশঙ্কা আছে। এই পিক অনেক দিন থাকতে পারে, যেমন প্রথম ঢেউয়ের সময় গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছিল। আবার এপ্রিলের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতো অল্প দিনও থাকতে পারে। এ সময় (এ বছরের এপ্রিলে) পিক সপ্তাহ খানেকেরও কম সময় ছিল। উঠেছিল দ্রুত, নেমেও গেছে দ্রুত।

দেশে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ঈদের আগে যে নয় দিন শিথিল ছিল, সেটার সংক্রমণ বা রোগীর প্রভাব পড়বে এ মাসের প্রথম সপ্তাহের পরে এবং মৃত্যুর প্রভাব পড়বে দ্বিতীয় সপ্তাহ পরে। সে হিসাবে এ মাসের মাঝামাঝিতে দেশে করোনা সংক্রমণের আরেকটা ‘পিকের’ আশঙ্কা রয়েছে। তারপর কমতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করবে এখন যে বিধিনিষেধ চলছে, সেটার কার্যকারিতার ওপর। তা হলে আগস্টের শেষ সপ্তাহে সংক্রমণ কমার একটা আশা আছে।

পরীক্ষা বাড়ানোর পরামর্শ : অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এখন যা উচিত পরীক্ষা আরও বাড়ানো এবং প্রতি উপজেলায় টেস্টিং সেন্টার খুলতে হবে। পজিটিভ হলে ওখানেই আইসোলেশন সেন্টারে রাখতে হবে এবং এসব সেন্টার খুব ভালো ব্যবস্থাপনার হতে হবে। প্রয়োজন হলে ওখান থেকে বিভাগীয় শহর বা জেলায় পাঠাতে হবে। এটা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এদিকে কোনো নজর দিচ্ছে না। সেখানে হাসপাতালের অবস্থাও ভালো না।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের করোনা পরীক্ষার সক্ষমতা যদি আরও থাকে এবং আরও বেশিসংখ্যক পরীক্ষা করতে থাকে, সে ক্ষেত্রে শনাক্ত হারের পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। আর পরীক্ষার সক্ষমতা এখন যে হারে চলছে, সেটাই যদি সর্বোচ্চ হয়, তাহলে শনাক্তের হার আরও বেড়ে যাবে। পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লে শনাক্তের হার খুব একটা না বাড়লেও রোগীর সংখ্যা বাড়বে। পরীক্ষা কম হলে শনাক্তের হার বাড়তেই থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত