মৃত্যু যন্ত্রণার ভয়াবহতা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২১, ১১:২০ পিএম

পবিত্র কোরআনের সুরা আল কিয়ামার ২৬-৩০ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘কখনো নয়, যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে এবং বলা হবে যে, কে তাকে রক্ষা করবে? তখন সে মনে করবে যে, এটা বিদায়ক্ষণ এবং পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাবে।’ এখানে পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো মৃত্যু যন্ত্রণা পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকা, ফলে মানুষের প্রাণ বের হয়ে যায়। পায়ের সঙ্গে পা জড়িয়ে পড়ার আরেক অর্থ তখন অস্থিরতার কারণে এক গোছা দ্বারা অন্য গোছার ওপর আঘাত করবে। কিংবা দুর্বলতার আতিশয্যে এক পা অপর পায়ের ওপর থাকলে তা সরাতে চাইলেও সক্ষম হবে না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তখন হবে দুনিয়ার শেষ দিন এবং আখিরাতের প্রথম দিনের সম্মিলন। তাই মানুষ দুনিয়ার শেষ দিন এবং আখিরাতের বিরহ-বেদনা এবং আখিরাতে কী হবে না হবে তার চিন্তায় পেরেশান থাকবে।’ অর্থাৎ সে সময় দুটি বিপদ একসঙ্গে এসে হাজির হবে। একটি এ পৃথিবী এবং এর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিপদ। আরেকটি, একজন অপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে আখিরাতের জীবনে যাওয়ার বিপদ যার মুখোমুখি হতে হবে প্রত্যেক কাফের, মুনাফিক এবং পাপীকে। ইবনে কাসির

হজরত নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মৃত্যু যন্ত্রণা খুব কঠিন।’ আল্লামা ইবনে কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, এক ব্যক্তি সবসময় মদপান করত। তার মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হলে পাশে উপবিষ্ট এক ব্যক্তি বললেন, ‘তুমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলো। এ কথা শুনে ওই ব্যক্তির চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। পাশে উপবিষ্ট ব্যক্তি দ্বিতীয়বার তালকিন তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ার জন্য বলল। তখন মুমূর্ষু ব্যক্তি তালকিন প্রদানকারীর প্রতি তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘তুমি পান করো আর আমাকেও পান করতে দাও, তুমি পান করো আর আমাকেও পান করতে দাও’ এ কথা বলতে বলতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে গেল।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিন ও কাফেরের মৃত্যুর আলাদা অবস্থা বর্ণনা করেছেন। মুমিনের যখন মৃত্যু হয় তখন সূর্যের আলোর ন্যায় আলোকিত চেহারাসম্পন্ন ফেরেশতা জান্নাত থেকে সুগন্ধযুক্ত রেশমি কাফন সঙ্গে নিয়ে এসে মুমিন ব্যক্তিকে সালাম করে। মালাকুল মউত বা মৃত্যুর ফেরেশতা তার রুহ কবজ করার পূর্বে তাকে এই বলে সুসংবাদ দেয়, হে পবিত্র আত্মা! তুমি খুশি হও, তোমার জন্য রয়েছে আল্লাহর রহমত এবং জান্নাতের নেয়ামতসমূহ। এ খবর শুনে মুমিন ব্যক্তির অন্তর আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে।

ফেরেশতা তার রুহ কবজ করার পর তা সুগন্ধময় সাদা রেশমি কাপড়ে জড়িয়ে আকাশের দিকে নিয়ে যায়। ফেরেশতারা আকাশের দরজায় পৌঁছানো মাত্র এই মুমিন বান্দার পরিচয় পেয়ে তার জন্য আকাশের দরজা খুলে দেন এবং তাকে স্বাগত জানান। ফেরেশতারা তার রুহকে এমনিভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম আকাশে নিয়ে যায়। ওখানে পৌঁছানোর পর মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে যে, আমার এ বান্দার নাম ইল্লিয়িনে (নেককারদের আত্মা ও আমলনামা সংরক্ষণের স্থান) তালিকাভুক্ত করো। অতঃপর প্রশ্নোত্তরের জন্য তার রুহ পুনরায় তার শরীরে ফেরত পাঠানো হয়।

আর কাফের ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, যখন কাফেরের মৃত্যুর সময় আসে তখন তার জান কবজ করার জন্য অত্যন্ত কুৎসিত চেহারাসম্পন্ন ফেরেশতা দুর্গন্ধময় কাফন সঙ্গে নিয়ে এসে তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং জাহান্নামের দুঃসংবাদ জানিয়ে তার রুহ শরীর থেকে জোর করে বের করে। এ সময় কাফেরের রুহ থেকে বর্ণনাতীত দুর্গন্ধ আসে। এরপর যখন মালাকুত মউত কাফেরের দুর্গন্ধময় রুহ নিয়ে প্রথম আকাশে পৌঁছায়, তখন দরজায় পৌঁছানো মাত্র আকাশের ফেরেশতারা বলে, ‘তার জন্য আকাশের দরজা খোলা হবে না। তাকে বেইজ্জতির সঙ্গে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দাও।’ তখন ফেরেশতারা তাকে প্রথম আকাশ থেকে বেইজ্জতির সঙ্গে মাটিতে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে, তার নাম সিজ্জনের (পাপীষ্ঠদের আত্মা ও আমলনামা সংরক্ষণের স্থান) তালিকায় লিখে দাও। অতঃপর তার রুহকে দ্বিতীয়বার প্রশ্নোত্তরের জন্য তার শরীরে পাঠানো হয়।

নবী কারিম (সা.) মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য কিছু আমলের কথা বলেছেন। ওই সব আমলের মাধ্যমে মৃত্যু যন্ত্রনা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। এর অন্যতম হলো সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত। প্রতিদিন সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াতে মৃত্যু যন্ত্রনা থেকে মুক্তি লাভের কথা হাদিসে বলা হয়েছে। এর ফলে মৃত্যুর সময় যখন আত্মাকে মানুষের দেহ থেকে বের করা হয়, তখন মৃত্যু যন্ত্রনা অনুভূত হয় না। তবে প্রতিদিন সুরা ইয়াসিনের আমল সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। কিন্তু যার অন্তরে মৃত্যু যন্ত্রনার ভয় আছে, তার জন্য এ আমল করা কোনো কষ্টের বিষয় নয়।

মৃত্যুর পর কবরের প্রশ্নোত্তরের কথাও ভাবা দরকার। যদি প্রশ্নের উত্তর সঠিক দেওয়া হয়, তাহলে মহাসাফল্য, আর সঠিক উত্তর না দিতে পারলে জাহান্নামের কঠোর শাস্তিতে আক্রান্ত হতে হবে। যার এ বিষয়ে বিশ্বাস ও ভয় আছে তার জন্য কবরের প্রশ্নোত্তরের সঠিক আমল করা সহজ। যার ভয় নেই তার জন্য কঠিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত