এখনো পলাতক দন্ডপ্রাপ্ত ৫ হত্যাকারী

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সন্ধান দিলে পুরস্কারের প্রস্তাব

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২১, ০২:০৪ এএম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মামলার রায় হয়েছে এক যুগ আগে। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ১২ খুনির মধ্যে ৬ জনকে রশিতে ঝুলিয়ে কার্যকর হয়েছে ফাঁসির রায়। আরেক খুনি পলাতক অবস্থায় দেশের বাইরে মারা গেছেন বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। পলাতক পাঁচ খুনির মধ্যে দুজনের অবস্থান চিহ্নিত হলেও তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। আত্মগোপনে থাকা তিন খুনির সন্ধান দিতে পারলে সন্ধানদাতাকে পুরস্কৃত করার কথা ভাববে সরকার। ইতিমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের কাছে তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এদিকে অবস্থান চিহ্নিত হওয়া দুই খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে বাংলাদেশের চিঠি চালাচালির পর শুধু মিলছে আশ্বাস। কবে তাদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ।

পলাতক খুনিদের অবস্থান চিহ্নিত করে ফিরিয়ে আনতে বিশ্বের সর্বোচ্চ পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের জারি হওয়া রেড নোটিসও কাজে আসছে না। সংস্থাটি শুধু নোটিস জারি করা ছাড়া কাজের কাজ কিছুই করতে পারছে না। পলাতক খুনি মোসলেহ উদ্দিন ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে গত বছরের মাঝামাঝিতে দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলেও আর কোনো কিছু জানা যায়নি। মোসলেহ উদ্দিন আলোচিত জেলহত্যা মামলারও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি।

২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর দেশ-বিদেশে আলোচিত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয়। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা পাঁচ খুনির ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। যাদের রায় কার্যকর করা হয়েছে  তারা হলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ, এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন। বাকি সাতজনের মধ্যে আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় ২০০১ সালের ২ জুন মারা যান বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়। এখন জীবিত পাঁচজনের মধ্যে চৌধুরী এ এম রাশেদ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালে জেদ্দায় কূটনীতিক পদে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে ফেরত আসার নির্দেশ দিলে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন তিনি। আরেক খুনি নূর চৌধুরী ১৯৭৬ সালে ব্রাসিলিয়ায় কূটনৈতিক জীবন শুরু করেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাকেও ফেরত আসার নির্দেশ দিলে তিনি আশ্রয় নেন কানাডায়। তাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার কথা শোনা যায় মাঝেমধ্যেই। শরিফুল হক ডালিমকে ১৯৭৬ সালে কূটনীতিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় পেইচিংয়ে। ১৯৮৮ সালে পদায়ন করা হয় কেনিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে। খুনি শরিফুল হক ডালিম, খন্দকার আবদুর রশিদ ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই কারোর।  আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে প্রায় ২৩ বছর ভারতের কলকাতায় লুকিয়ে ছিলেন তিনি। আরেক খুনি মোসলেহ উদ্দিন ভারতে থাকতে পারেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে আগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বৈঠকে তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছে তুলেছিল ঢাকা। নয়াদিল্লি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাইলে ঢাকা দিতে পারেনি। আবার মোসলেহ উদ্দিন জার্মানিতেও থাকতে পারেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে সরকার যোগাযোগ করলে ওই দেশটি বাংলাদেশের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছে। খন্দকার আব্দুর রশিদকে পাকিস্তানে দেখা গেছেÑএমন তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান সরকারকে একটি নোট ভারবাল দেয় বাংলাদেশ। তবে দেশটির পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

৩ খুনির সন্ধান দিতে পারলে পুরস্কার : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুই খুনির সম্পর্কে জানি। একজন কানাডায় আরেকজন আমেরিকায়। বাকি তিনজনের কোনো খবর জানি না। সারা পৃথিবীর সব বঙ্গবন্ধুপ্রেমীদের বলেছি, এই খুনিদের খবর পেলে আমাদের জানাবেন। যারা এই তিন খুনির তথ্য দিতে পারবেন তাদের পুরস্কৃত করা হবে। ইতিমধ্যে পুরস্কারের বিষয়টি সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাশেদ চৌধুরীর বিষয়টি আদালতে রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, একটা রেজাল্ট পাব। আর নূর চৌধুরীর বিষয়ে কানাডা কোনো উত্তর দেয় না, তারা একই কথা বারবার বলে, তাদের আইন ফাঁসির দ-প্রাপ্তদের ফেরত দেয় না। তাদের এটা সাংবিধানিক আইন, এটার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা কিছুই করতে পারবে না। আমরা সবসময় আশাবাদী, এদের ফেরত আনতে পারব। আমেরিকা ও কানাডায় অবস্থান করা বাংলাদেশিদের কাছে আমি অনুরোধ করব দুই খুনির বাড়ির সামনে গিয়ে সবাইকে জানায় তারা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি।’

কানাডা ও আমেরিকায় দুই খুনি : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফাঁসির রায় হওয়া নূর চৌধুরী কানাডায় এবং চৌধুরী এ এম রাশেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই ওই দুটি দেশের সঙ্গে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। চিঠি চালাচালি হচ্ছে দুই দেশে। কিন্তু সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু আশ্বাসই দিচ্ছে ওই দুই দেশের সরকার।  কবে ফেরত আনা সম্ভব হবে সেই তথ্য নেই তাদের কাছে। তবে শরিফুল হক ডালিম, মোসলেম উদ্দিন খান ও খন্দকার আব্দুর রশিদ চীন যুক্তরাজ্য, কেনিয়া, লিবিয়া, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যেকোনো দেশে অবস্থান করছে বলে মাঝেমধ্যে ইন্টারপোল তথ্য দেয়। তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিসও জারি করেছে। সংস্থাটিও চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকারের আপত্তি না থাকলেও সেখানে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতাই এখন বড় বাধা। তবে সরকারের নানা উদ্যোগে এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে জটিলতা নেই, কিন্তু কানাডাতে যেটি আছে, তা হচ্ছে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে তারা ফেরত পাঠায় না।’

আইনমন্ত্রী যা বললেন : গত বৃহষ্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তার গুলশানের বাসভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। আওয়ামী লীগ যত দিন বাংলাদেশে থাকবে, বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের একজন বেঁচে থাকলেও হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুনিদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। এ চলমান প্রক্রিয়ার ব্যাপারে বিশদ কিছু বলতে গেলে এ প্রক্রিয়ার কিছু ব্যাঘাত হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো শিথিলতা নেই।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পলাতক খুনি  মোসলেহ উদ্দিন ভারতে পলাতক রয়েছে এমন গুঞ্জনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এটি যাচাই-বাছাই করে দেখেছি। এখন পর্যন্ত এর কোনো সত্যতা আমরা পাইনি।’ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আলাপ আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, যারা হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিলেন শুধু তারাই এই হত্যাকান্ডে জড়িত নন; এর পেছনে একটা ষড়যন্ত্র আছে এবং সেই ষড়যন্ত্রকারী কারা তাদের অন্ততপক্ষে চিহ্নিত করে দেশের মানুষের কাছে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার। ইতিমধ্যে কমিশন গঠন করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শেষ হলে এই কমিশন কাদের দ্বারা গঠিত হবে, এর রূপরেখা, কার্যাবলি কী হবে তা জানানো হবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমান জড়িত উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটা দিনের আলোর মতো সত্য যে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। এর সাক্ষ্য-প্রমাণ কমিশনের মাধ্যমে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।’

যেভাবে আসে জাতির পিতা হত্যার বিচার : বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর খন্দকার মোশতাক সরকারের জারি করা কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশের কারণে ২১  বছরের বেশি সময় হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার গঠনের পর বিচারের উদ্যোগ নেয় তখনকার সরকার। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ বাতিল হলে বিচারের পথ তৈরি হয়। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এ ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের বিচারক কাজী গোলাম রসুল এক রায়ে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেন। রায়ে দন্ড-প্রাপ্তদের ফায়ারিং স্কোয়াডে (গুলি করে) দন্ড কার্যকরের কথা বলা হয়। পরে হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে দন্ড কার্যকরের রায় আসে। বিচারিক আদালতে দন্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও কারাগারে থাকা চার আসামির আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিভক্ত রায় (একজন বিচারপতি ১৫ জনের এবং অন্যজন ১০ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় দেন)। এরপর হাইকোর্টের তৃতীয় একটি বেঞ্চ ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এক রায়ে ১২ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় দেয়। আইন অনুযায়ী পলাতকরা আপিলের সুযোগ পাননি। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে থমকে যায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। ২০০৭ সালে আপিল বিভাগে মামলাটি ফের পুনরুজ্জীবিত হয়। ওই বছরের ১৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি এ  কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হলে ১৮ জুন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কারাগারে থাকা এই আসামিও হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের এক রায়ে কারাগারে থাকা পাঁচ আসামির আপিল খারিজ হয়ে গেলে তাদের মৃত্যুদন্ড বহাল থাকে। এরপর আপিল বিভাগে রায় পর্যালোচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ হয়ে গেলে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘদিন ভারতে পালিয়ে থেকে গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর আবদুল মাজেদকে গত ৬ এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের সাড়ে ১১ বছরের বেশি সময় পর গত বছরের ১১ এপ্রিল রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত