হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

হোমিওপ্যাথি ইউনানিতে ডাক্তার পদবি বেআইনি

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২১, ০২:১২ এএম

এমবিবিএস-বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে ডিগ্রিধারীদের নামের আগে ডাক্তার পদবি সংযোজনের অনুমতি দেওয়াকে বেআইনি বলেছে আদালত।

বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠন ও বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থায় ডিগ্রিধারীদের নামের আগে ডাক্তার ব্যবহার করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট খারিজ (রুল খারিজ) করে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেয়।

৭১ পৃষ্ঠার রায় গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। গত বছর ১৯ নভেম্বর রায় ঘোষণা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। একমত পোষণ করেন অপর বিচারপতি রাজিক আল জলিল।

রায়ে হাইকোর্ট বিকল্পধারার চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে পরিকল্পনা, আইন প্রণয়নসহ প্রয়োজনে ‘ভারত সরকারের আয়ুশ মন্ত্রণালয়’-এর আদলে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের পরামর্শ দিয়েছে। আদালত বলছে, সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতটা না রোগীর ব্যথা নিরাময় বা রোগমুক্তির; তার চেয়ে বেশি ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল ও তাদের সহায়তাকারী হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ীর জন্য। ফলে রাতারাতি অনেক ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বড় বড় ডাক্তারদের টাকার পাহাড় হলেও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা একদম তলানিতে।

পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন বিকল্প চিকিৎসা (অল্টারনেটিভ কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন) পদ্ধতিতে ডিগ্রি ও পেশাধারীদের নামের আগে ইন্ট্রিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান, কমপ্লিমেন্টারি ফিজিশিয়ান, ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন প্র্যাকটিশনার এবং কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন প্র্যাকটিশনার পদবি ব্যবহার করতে পারেন বলে রায়ে বলা হয়েছে।

আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল অব বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা বিকল্পধারার চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পর ডাক্তার পদবি ব্যবহার করলে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। পরে সংগঠনের সদস্যরা এ পদবি ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৯ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। গত বছর ১ জানুয়ারি রুল জারি করা হয়, যা খারিজ করে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট।

রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। অপরপক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ায়েস আল হারুনী।

রায়ে বলা হয়, দুঃখজনকভাবে এটি লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন, ২০১০-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী বিএমডিসির নিবন্ধিত মেডিকেল বা ডেন্টাল ইনস্টিটিউটের এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না। অথচ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার’ শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যানের বিভিন্ন পদে কর্মরত হোমিওপ্যাথি, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক কর্মকর্তাদের স্ব স্ব নামের আগে ডাক্তার পদবি সংযোজনের অনুমতি দিয়েছে, যা বেআইনি।

রায়ে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ডের ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন শাখায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের তাদের নামের আগে পদবি হিসেবে ডাক্তার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়াও বেআইনি।

আদালত বলেছে, বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি পাঁচ হাজার বছরের। সুতরাং সমগ্র পৃথিবীতে চলে আসা এ পদ্ধতির যথাযথ পঠন ও প্রশিক্ষণ জনমানুষের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন করবে। আজ থেকে ১৬২ বছর আগে প্রচলিত তথা পশ্চিমা চিকিৎসাপদ্ধতির নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতিও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। রায়ে বলা হয়, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিকল্পধারার চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এর কারণ হলো ১. সহজলভ্যতা, ২. স্বল্প খরচ, ৩. এলোপ্যাথিক চিকিৎসার তুলনায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম ও ৪. প্রচলিত চিকিৎসার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় স্যামুয়েল হ্যানিম্যান আবিষ্কৃত হোমিওপ্যাথি। রোগীকে স্বল্প পরিমাণে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তোলাই এ চিকিৎসাপদ্ধতির মূলমন্ত্র।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। সুতরাং বিবেক ও চিন্তার মাধ্যমে কোন পদ্ধতির চিকিৎসা গ্রহণ করবেন এটি সম্পূর্ণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে মত দিয়েছে হাইকোর্ট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত