সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশে চীনের সিনোফার্ম করোনার টিকা উৎপাদন শুরু করবে দেশের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেড। প্রতি ভায়ালে ১০ ডোজ হলে মাসে চার কোটি ও পাঁচ ডোজের ভায়াল হলে আড়াই কোটি টিকা উৎপাদন করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি। সে ক্ষেত্রে সরকারের চাহিদার ওপর নির্ভর করবে মাসে উৎপাদনের পরিমাণ। সরকার ইনসেপ্টার থেকে টিকা কিনে নেবে। উৎপাদন শুরু হলে দাম নির্ধারণ হবে।
গতকাল সোমবার এ টিকা উৎপাদনের ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইনসেপ্টা ও চীনের সিনোফার্মের মধ্যে এক ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। স্বাক্ষর শেষে গতকাল রাতে ইনসেপ্টার চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির দেশ রূপান্তরকে টিকা উৎপাদনের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানান।
এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে দেশে এই প্রথম করোনার টিকা উৎপাদন হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সিনোফার্মের কাছ থেকে সাড়ে সাত কোটি ডোজ টিকা কিনবে বলে এর আগে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে দেড় কোটি ডোজের বিষয়ে চুক্তিও হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইতিমধ্যেই সিনোফার্ম টিকা দেশে আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে দেশে চলমান টিকা কর্মসূচিতে বেশিরভাগই সিনোফার্ম টিকা দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক চুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, চীন বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র। কভিড-১৯ মোকাবিলায় চীন সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন-বাংলাদেশ ভ্যাকসিন চুক্তির মাধ্যমে দেশে ভ্যাকসিনের ঘাটতি মেটাতে চীন আরেকবার তার বন্ধুত্বের গভীরতা প্রমাণ করেছে। এ চুক্তি দেশের জন্য এক বিরাট মাইলফলক হয়ে থাকবে। দেশের ৮০ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে আজকের এ চুক্তি বিরাট ভূমিকা পালন করবে এবং দেশে আর কোনো ভ্যাকসিন ঘাটতি থাকবে না। তবে ভ্যাকসিন উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি শুরুর আগপর্যন্ত বাংলাদেশ চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশের কাছ থেকে তা গ্রহণ কাজ চলমান রাখবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সিনোফার্ম চীন থেকে কাঁচামাল সরবরাহ করবে। দেশে টিকা প্রস্তুত করবে ইনসেপ্টা। সরকার এটি কিনে নেবে। এখনো টিকার দাম নির্ধারণ করা হয়নি। ইনসেপ্টা জানিয়েছে, তারা তিন মাসের মধ্যে টিকা দিতে পারবে। প্রতি মাসে চার কোটি টিকা বানাতে পারবে। এর ফলে দেশে করোনার টিকার সরবরাহ নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না।
এ ব্যাপারে ইনসেপ্টার চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঠিক কী পরিমাণ টিকা মাসে সরকারকে দেবে ইনসেপ্টা, সেটার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি মাসে কী পরিমাণ উৎপাদন করতে পারবে এবং সরকারের চাহিদা কেমন, সেটার ওপর নির্ভর করছে সরবরাহের পরিমাণ।
এ চুক্তির ফলে দেশে সবসময় করোনার টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করার একটা সম্ভাবনা দেখা গেল বলে মনে করেন ইনসেপ্টা চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ইনসেপ্টা এই টিকা শুধু বাংলাদেশের জন্য উৎপাদন করবে, বাইরে রপ্তানির জন্য নয়।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন (বিসিপিএস) মিলনায়তনে এ চুক্তি সই হয়। যৌথ ভ্যাকসিন উৎপাদনের ত্রিপক্ষীয় এ চুক্তিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ও ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির সই করেন।
কীভাবে ও কতদিনের মধ্যে উৎপাদন হবে টিকা : চুক্তি অনুযায়ী চীন থেকে টিকা উৎপাদনের কাঁচামাল ও উপকরণ বা বাল্ক নিয়ে আসা হবে। এরপর দেশেই বোতলজাতকরণ, লেবেলিং ও ফিনিশিং করবে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস। উৎপাদনের পর সরকার চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত দামে ইনসেপ্টার কাছ থেকে ভ্যাকসিন কিনে নেবে।
এ ব্যাপারে ইনসেপ্টার চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চীন থেকে রেডি টু ফিল্ড বাল্ক এনে বাংলাদেশে সিল্ড ফিনিশ করব এবং পরে সরকারকে দেব। আমরা এখানে শুধু ফিলিং ও সিল্ড অপারেশন করব। বাল্ক আনার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আমরা পরীক্ষা করব। উভয় প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে সেটা মানোত্তীর্ণ হলেই উৎপাদন শুরু হবে।
কবে নাগাদ টিকা উৎপাদন শুরু হতে পারে জানতে চাইলে ইনসেপ্টার প্রধান বলেন, আজ (গতকাল) আমরা শুধু চুক্তি সই করলাম। এটা সমঝোতা চুক্তি। এরপর ফাইনাল অ্যাগ্রিমেন্ট হবে ও সেটা অনুযায়ী আমরা টিকা উৎপাদন করব। এর মধ্যে অনেক টেকনিক্যাল, কমার্শিয়াল ও রেগুলেটরি ইস্যু আছে। সেগুলো সমাধান করতে হবে। আমার ধারণা তিন মাসের মধ্যে এগুলো সমাধান করে আমরা উৎপাদনে যেতে পারব।
মাসে কী পরিমাণ টিকা উৎপাদন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা ভায়ালে কতগুলো ডোজ দিতে পারব, সেটার ওপর নির্ভর করবে আমরা মাসে কী পরিমাণ টিকা উৎপাদন করতে পারব। এখন পর্যন্ত যেরকম কথাবার্তা চলছে, তাতে যদি এক ভায়ালে দুই ডোজ হয়, তাহলে একরকম। আবার এক ভায়ালে পাঁচ ডোজ বা ১০ ডোজ হলে আরেক রকম। তবে ১০ ডোজ ভায়াল হলে মাসে চার কোটি, পাঁচ ডোজের ভায়াল হলে আড়াই কোটি টিকা উৎপাদন করা যাবে।
দামের ব্যাপারে এখনো কোনো কথাবার্তা হয়নি বলে জানান আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আমরা টিকা উৎপাদন করে সরকারকে দেব, সরকার আমাদের থেকে কিনে নেবে। দামের ব্যাপারে এখনো কোনো কথাবার্তা হয়নি। সবকিছু সমাধান করে টিকা উৎপাদন শুরু হলে দামের ব্যাপারে বোঝা যাবে। তখন দাম নির্ধারণ করা যাবে।
এখন ইনসেপ্টা অনেকগুলো টিকা উৎপাদন করছে জানিয়ে ইনসেপ্টার চেয়ারম্যান বলেন, রেডিস, টিটেনাস, টাইফয়েড, রুবেলা ও কলেরাসহ আমরা অনেক টিকা তৈরি করি। আমাদের উৎপাদিত টিকার মধ্যে কিছু বিদেশেও রপ্তানি হয়।
চীনের পাশাপাশি রাশিয়া থেকেও টিকা নেবে বাংলাদেশ : চীনের সঙ্গে টিকা উৎপাদন চুক্তির ফলে বাংলাদেশ খুব তাড়াতাড়ি দেশেই টিকা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দেশে টিকার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, দেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রায় তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন চলে এসেছে। যা থেকে প্রথম ধাপে দেড় কোটি ডোজ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৫৪ লাখ ডোজ মানুষ গ্রহণ করেছে। অবশিষ্ট এক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন এই মুহূর্তে দেশে মজুদ আছে। এ মাসের ২২ তারিখের পর চীন থেকে সিনোফার্মের আরও ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেশে আসবে। চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার কাছ থেকেও আরও ভ্যাকসিন নেওয়া হবে। সুতরাং ভ্যাকসিন নিয়ে আগামীতে আরও কোনো ঘাটতিতে থাকবে না বাংলাদেশ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ৮০ ভাগ মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়ার অর্থ হচ্ছে ১৩ কোটি মানুষের জন্য মোট ২৬ কোটি ভ্যাকসিন প্রস্তুত রাখতে হবে। এই বিশালসংখ্যক ভ্যাকসিন চাহিদা পূরণ করতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আজকের এ চুক্তিটি অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চীনের সঙ্গে চুক্তিসহ কভিড মোকাবিলায় সব কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও ধন্যবাদ জানান।
গতকালের চুক্তি অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তিনি জানান, চীনের সঙ্গে এ ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করতে সরকার দিনরাত নিরলস কাজ করেছে। আজ সেই স্বপ্ন পূরণ হলো। এ চুক্তির ফলে এখন থেকে বাংলাদেশেই কভিড ভ্যাকসিন উৎপাদন হবে এবং খুব দ্রুতই দেশে মানুষের আবারও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে চুক্তি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এছাড়াও পেইচিং থেকে অনলাইনে সংযুক্ত হয়ে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন চীনের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স বিভাগের উপমহাপরিচালক চেন সং, সিনোফার্মের চেয়ারম্যান লিউ জিংজান এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সিনোফার্মের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ফু কুয়াং।
