‘পায়ের মধ্যে প্রচণ্ড কামড়ায়, খুব জ্বালা-পোড়া করে। রাত আসলেই ব্যথায় টিকতে পারি না, ঘুমও হয় না। পায়ে পেটে বুকে যেখানে যেখানে স্প্লিন্টার আছে সেখানে প্রচন্ড যন্ত্রণা হয়, প্রতি রাতে কান্নাকাটি করি। ডাক্তাররা ঘুমের ওষুধ দিয়েছে কিন্তু সে ওষুধ খেয়েও কাজ হয় না এখন।’ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত রাশিদা আক্তার রুমা (৪১) এভাবেই তার কষ্টের কথা বলছিলেন। গত ১৭ বছর ধরে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেরাচ্ছেন তিনি।
রাশিদা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেনেড হামলার সময় সমাবেশ মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার পেট, বুক, পাসহ সমস্ত শরীরে বিদ্ধ হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য আমাকে ভারতে পাঠান। তখন টানা দুই বছর ধরে কলকাতার পেয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। জননেত্রী এখন পর্যন্ত পাঁচবার ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে একবার, ট্রমা সেন্টারে তিনবার, বাংলাদেশ মেডিকেলে পেটে ও বুকে দুইবার, সিকদার মেডিকেলে একবার অপারেশন (অস্ত্রোপচার) করিয়েছি। দেশে ও ভারতে আমার সমস্ত শরীরে মোট ১৭ বার অপারেশন করা হয়েছে। তবুও সুস্থ জীবনে ফিরতে পারি নাই। পায়ের গোড়ালির ঘা এখনো শুকায়নি। চিকিৎসকরা বলেছেন, পা কেটে ফেলতে হবে।’
রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা শতাধিক নেতা-নেত্রী শরীরে স্প্লিন্টার বহন করছি, সবাই যন্ত্রণায় আছি। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি শরীরের স্পিøন্টার বের করা যায় একমাত্র জার্মানিতে। সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আমরা কয়েকবার সরকারের কাছে গিয়েছি। কিন্তু এখনো আমাদের পাঠানো হয়নি। দলের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ব্যয় দেওয়া হয় অথচ খরচ হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।’
জীবনের কঠিন সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় আড়াই ও সাড়ে তিন বছরের দুই মেয়েসন্তান ছিল আমার। স্বামী মারা যান ২০০২ সালে। এই অসুস্থ শরীরেই দুই মেয়েকে লালন-পালন করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন রাজধানীর চাঁনখারপুলের মাজেদ সরদার রোডে মায়ের বাসায় থাকি।’
ঢাকা মহানগর মহিলা লীগের তৎকালীন কোতোয়ালি থানা (বর্তমান বংশাল থানা) কমিটির প্রচার সম্পাদিকা ছিলেন রাশিদা আক্তার। বর্তমানে ঢাকা মহানগর মহিলা লীগের বংশাল থানা কমিটির দপ্তর সম্পাদিকা তিনি। একই সঙ্গে ‘২১ আগস্ট বাংলাদেশ কমিটি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদিকা। রাশিদা আক্তারের স্বামী জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন তৎকালীন কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০০২ সালে হৃদরোগে তিনি মারা যান।
রাশিদা আক্তারের মতোই যন্ত্রণা সহ্য করে বেঁচে আছেন হারুনুর রশিদ (৫৫)। ঘটনার সময় তিনি কোতোয়ালি থানার ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে বংশাল থানা আওয়ামী লীগের সদস্য। আহত হওয়ার পর তার সমস্ত শরীরে ১৫ বার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। হারুনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনবার ব্যাংককে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি। মাথার খুলির চার জায়গা কাটা হয়েছে। এখনো সমস্ত শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। একটু ঠাণ্ডা লাগলে শরীর অবশ হয়ে আসে। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি মাসে এখনো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার ওষুধ খেতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার তৎকালীন মেয়র ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হানিফ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা সমাবেশে গিয়েছিলাম। গ্রেনেড হামলার সময় আমার সামনে বিল্লাল দাঁড়িয়ে ছিল, ও মারা যায়। ও সামনে থাকায় আমার জীবনটা বেঁচে যায়। তবে মাথা, পা ও হাতে অসংখ্য স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। আহত হওয়ার পর তৎকালীন বিএনপি সরকার কোনো সাহায্য করে নাই। জননেত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই আমরা সহায়তা পাচ্ছি।’ রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বর থেকে সমাবেশে যান তৎকালীন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. লিটন মোল্লাহ। তার শরীরেও অসংখ্য স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। এখনো ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না তিনি। লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার শরীরে এখনো ১০০-এর বেশি স্পিøন্টার রয়েছে। গত বছরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে অপারেশন করে চারটি স্পিøন্টার বের করেছি। এখন পর্যন্ত ১০ বারের বেশি অপারেশন করেছি। তাও সুস্থ হতে পারিনি। দুই পা ও শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখন মিরপুর ২-এর ৫ নম্বর রোডের এ ব্লকের ১৯ নম্বর বাসায় ভাড়া থাকি। জননেত্রীর কাছে আমার আবেদন ঢাকা শহরে যেন আমাকে একটু মাথা গোঁজার স্থায়ী জায়গা করে দেন।’
গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মাহাবুবা পারভীনের শারীরিক অবস্থাও খুব একটা ভালো না। এক পাশে শুয়ে থাকলে অপর পাশে ঘুরে শুতে পারেন না। বেশিরভাগ সময় তাকে বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয়। এখনো তার চিকিৎসা চলছে। থাকেন ঢাকার সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার নিজ বাড়িতে। মাহাবুবা পারভিন বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে যখন আমি পড়েছিলাম সবাই ভেবেছিল মারা গেছি। শরীরে ১৮০০ স্পিøন্টার বিদ্ধ হয়। কিন্তু আমার নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বোর্ড বসিয়ে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি আমাকে বিমানে করে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। এরপর দেশে ফিরলে ২০১৩ সালেও সিএমএইচে পুরো শরীর চেকআপ করিয়েছেন। এখনো ঘাড়, মাথাসহ বিভিন্ন স্থানে স্প্লিন্টার রয়ে গেছে।’
গ্রেনেড হামলায় নিহত হন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম। তৎকালীন খিলগাঁও ২৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদেও ছিলেন তিনি। নেতাকর্মীদের মধ্যে আদা চাচা বলেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। মিছিল-মিটিংয়ে, স্লোগান-বক্তৃতা দিতে গিয়ে দলের কারো গলায় সমস্যার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে বের করতেন আদার কৌটা, মুখে দিয়ে দিতেন এক চিমটি আদা। তার মেঝো ছেলে খিলগাঁও থানা কমিটির সাবেক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মো. মামুন বলেন, ‘আমিও নেত্রীর সমাবেশে গিয়েছিলাম। একটু দূরে ছিলাম। আব্বা মঞ্চের কাছে ছিল। গ্রেনেড হামলার দুই ঘণ্টা পরে আব্বার মৃত্যুর খবর পাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিনি সব সময় আমাদের খোঁজখবর রাখছেন। আমাদের বাড়ির ঝামেলা মিটিয়েছেন। নতুন ১০ তলা বাড়ি করে দিচ্ছেন।’
