পুঁজিবাজার স্থিতিশীল তহবিল

অবণ্টিত লভ্যাংশ হস্তান্তরে টালবাহানা

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ১২:২৭ এএম

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) কর্তৃক গঠিত ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড বা পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলে অবণ্টিত লভ্যাংশ হস্তান্তরে টালবাহানা করছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো। বেঁধে দেওয়া সময়ে কোনো কোম্পানিই তহবিলে লভ্যাংশ হস্তান্তর করেনি। এমনকি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ এক মাসের সময় চাইলেও তাও শেষ হতে চলেছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানি অবণ্টিত লভ্যাংশ হস্তান্তরে এক বছর পর্যন্ত সময় চেয়েছে এসইসির কাছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে তহবিল গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এসইসি সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারহোল্ডারদের অবণ্টিত লভ্যাংশ পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলে হস্তান্তরে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় চেয়ে এসইসিতে আবেদন জানিয়েছে। এরমধ্যে ব্র্যান্ডভ্যালুর বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানিও রয়েছে। এসব কোম্পানি সময়বৃদ্ধির আবেদন জানিয়েছে, করোনার কারণে কর্মকর্তারা অফিস করতে পারেননি, অবণ্টিত লভ্যাংশের দাবি জানাতে শেয়ারহোল্ডারদের নোটিসও দিতে পারেনি।

কিন্তু এসইসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে। আগে অবণ্টিত লভ্যাংশের বিষয়ে কোনো নীতিমালা না থাকায় অনেক কোম্পানি আলাদা হিসাবে থাকা অবণ্টিত লভ্যাংশ নয়-ছয় করেছে। কোনো কোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অবণ্টিত লভ্যাংশ তছরুপ করেছে। এরই মধ্যে ফু-ওয়াং ফুড ও ফার্মা এইডের অবণ্টিত লভ্যাংশ আত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। ফু-ওয়াং ফুডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার স্ত্রীর বিও হিসাবে শেয়ারহোল্ডারদের অবণ্টিত লভ্যাংশের শেয়ার স্থানান্তর করে নিয়ে গেছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন কোম্পানি সচিব এসইসিতে অভিযোগ জানিয়েছেন, যার বিস্তারিত তদন্ত করছে কমিশন। একই প্রক্রিয়ায় ফার্মা এইডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকও অবণ্টিত লভ্যাংশের সব শেয়ার আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে এসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ধারণা করছে, আরও বেশ কিছু কোম্পানি কর্তৃপক্ষও অবণ্টিত শেয়ার ও নগদ লভ্যাংশ আত্মসাৎ করেছে।       

গত ৩০ জুন ক্যাপিটাল মার্কেট স্টাবিলাইজেশন ফান্ড গঠন সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করে এসইসি। এতে তিন বছর বা তার বেশি সময় কোম্পানি বা মিউচুয়াল ফান্ড পড়ে থাকা অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ, বোনাস শেয়ার, রাইট শেয়ার ও পাবলিক সাবস্ক্রিপশনে পড়ে থাকা অর্থ এই তহবিলে স্থানান্তর করতে হবে। নগদ লভ্যাংশ বা অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা থাকায় কোনো সুদ অর্জিত হলে, তাও এ তহবিলে প্রদান করতে হবে। নগদ লভ্যাংশ, বোনাস ও রাইট শেয়ার তহবিলে হস্তান্তরের সময় লভ্যাংশের বছর, শেয়ারহোল্ডারদের নাম, বিও নম্বর, স্থায়ী ও যোগাযোগের ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য তহবিলকে জানাতে বলা হয়েছে কোম্পানিকে।

অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ ও শেয়ার গত জুলাই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলে হস্তান্তরের নির্দেশনা জারি করলেও পরে বিএপিএলসির অনুরোধে তা চলতি আগস্ট পর্যন্ত সময় বাড়ায় এসইসি। তবে কোম্পানির অ্যাক্রুড হিসাবে থাকা নগদ লভ্যাংশ থেকে অর্জিত সুদ আয় তহবিলে জমা নিয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ থেকে অর্জিত সুদ আয়ের অর্থ অধিকাংশ কোম্পানি আয় খাতে নিয়ে যাওয়ার কারণে তা পুঁজিবাজার স্থিতিশীলকরণ তহবিলে জমা দেওয়া অনেকটাই অসম্ভব বলে জানিয়েছে বিএপিএলসি। এটা করতে হলে বিগত বছরগুলোর নিরীক্ষিত প্রতিবেদন পুনঃনিরীক্ষা করতে হবে, যা অত্যন্ত জটিল। তাই কোম্পানির অ্যাক্রুড হিসাবে থাকা অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ থেকে অর্জিত সুদ আয়ের অর্থ তহবিলে জমা প্রদান থেকে অব্যাহিত চেয়ে নির্দেশনা জারি করতে গত ১১ আগস্ট এসইসির কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বিএপিএলসি। 

এ বিষয়ে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, কমিশন আন্তরিকতার সঙ্গে তহবিল গঠনের জন্য কাজ করছে। বিধিমালা হয়ে গেছে, বোর্ড অব গভর্নরস করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তহবিলে অবণ্টিত মুনাফার শেয়ার ও অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। যেসব কোম্পানি সময় চেয়ে আবেদন জানিয়েছে, সেসব আবেদনের বিষয়ে কমিশন পরে সিদ্ধান্ত নেবে।    

কমিশন সূত্র জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে দুই শতাধিক কোম্পানির কাছে অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তিন বছর বা তার আগের বছরগুলোর পড়ে থাকা অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ হবে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ টাকাই ফান্ডের ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে বলা হয়েছে।

অবণ্টিত লভ্যাংশের অর্থ পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করার প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। এজন্য এ তহবিল নগদ অর্থের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ সরাসরি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। মোট অর্থের ৫০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মার্জিন ঋণ হিসেবে বিতরণের জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসকে ঋণ দিতে পারবে।

স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৩০ কোম্পানির কাছে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি নগদ লভ্যাংশ পড়েছিল। এর মধ্যে ২০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বেশি নগদ লভ্যাংশ পড়েছিল ২০টির অধিক কোম্পানিতে।

এ হিসাবে মোবাইল অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণফোনের কাছে সর্বাধিক ১৯০ কোটি টাকার অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এ কোম্পানির চলতি প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বর্তমানে গ্রামীণফোনের কাছে অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ রয়েছে ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। একই সময়ে বিএটি বাংলাদেশে অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ রয়েছে ৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

গত ৩১ মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিবির কাছে অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ ছিল ৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা। আরও যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবণ্টিত নগদ লভ্যাংশ রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে, সেগুলোর অন্যতম হলো- উত্তরা ব্যাংক, সামিট পাওয়ার, পূবালী ব্যাংক, তিতাস গ্যাস, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, এক্সিম ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, লিনডে বিডি, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, সিটি ব্যাংক, পদ্মা অয়েল, উত্তরা ফাইন্যান্স, যমুনা ব্যাংক, বিএসআরএম স্টিল, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ইত্যাদি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত