নদীর ভাঙন থেকে দেশের বিভিন্ন জনপদকে সুরক্ষায় ‘নদীরক্ষা বাঁধ’ নির্মাণ করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কিন্তু তার সবগুলোই যে ফলপ্রসু হচ্ছে তা নয়। এর পেছনে নদী রক্ষাবাঁধ নির্মাণের পূর্বে যথাযথ সমীক্ষা ও নদীর চরিত্র বিশ্লেষণ না করাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অবস্থায় তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক সমীক্ষাবিহীন পাউবোর করা দুটি ‘নদীরক্ষা বাঁধ’ নির্মাণ প্রকল্প ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে এই দুই প্রকল্প পাস করাতে হলে নদীগুলোর ১০ বছরের চরিত্র বিশ্লেষণমূলক একটি তথ্যচিত্র তুলে ধরারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিশন সূত্র জানায়, পানগুছি নদীর ভাঙন থেকে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলা সদর রক্ষা ও বিষখালী নদী পুনঃখনন প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৬৬৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে বরগুনা জেলার বিষখালী ও পায়রা নদীর ভাঙন থেকে বেতাগী শহররক্ষা বাঁধে ৮২৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় পাউবো। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এই টাকা ব্যয় করার কথা বলা হয়। সম্প্রতি এই প্রস্তাব দুটির ওপর পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বলা হয়, প্রকল্পে অনুমোদন করতে হলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যথাযথ সমীক্ষা করাতে হবে। শুধু তাই নয়, সম্ভাব্য সমীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার জন্য বাপাউবোর অভ্যন্তরীণ কমিটির সঙ্গে পানিসম্পদ সেক্টরের অন্যান্য সংস্থায় কর্মরত একাধিক সদস্যের সমন্বয়ে (যেমন বুয়েটের আইডব্লিউএফএম অথবা সিইজিআইএস, আইডব্লিউএম, ওয়ারপো) হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করতে হবে।
এ ছাড়া ফ্লাড রিটার্ন পিরিয়ডসহ কমপক্ষে বিগত ১০ বছরের পানির স্তরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন উচ্চতা, স্রোতের গতিবেগ, নদীতীর ভাঙনের চিত্র, মৃত্তিকা পরিস্থিতি ও পলি জমা হওয়ার তথ্যসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) সংযোজন করতে হবে। এই সঙ্গে নদীতীর সংরক্ষণ, কাজের পরিমাণ ও স্থান (জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন) উল্লেখপূর্বক এসব কাজের নকশা ও প্রতিমিটারের ব্যয়ের বিবরণ ডিপিপিতে সংযোজন করতে হবে। পাউবোর প্রধান প্রকৌশলীর (নকশা) নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে কমিটির কারিগরি মতামত ডিপিপিতে সংযোজন করাসহ রেগুলেটরের ব্যয় পুনর্নির্ধারণ, নকশা, পরিমাপ (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা) ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া রেগুলেটর নির্মাণ বা মেরামতের জন্য পৃথক পৃথক পরিমাপ ও ব্যয় প্রাক্কলন পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সংযোজন করতে হবে। নির্মাণপরবর্তী পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে ডিপিপিতে সুনির্দিষ্ট বিবরণ রাখতে হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নদীরক্ষা প্রকল্পের বাঁধ নির্মাণ বা পুনরাকৃতিকরণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা তথা মৎস্য ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচলের জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণ ‘ফিশ পাস’-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি এসব বাঁধ যানবাহন চলাচল, পর্যটনের স্থান ইত্যাদির জন্য উপযুক্ত কিনা সে বিষয়টিও ডিপিপিতে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
এক্ষেত্রে খাল পুনঃখননের স্থান (জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন), নকশা, পরিমাপ (প্রস্থ ও গভীরতা) উল্লেখসহ খাল বা নদীর তালিকা ডিপিপিতে উল্লেখ করতে হবে। এ সময় খাল-নদীতে প্রতিবছর কী হারে পলি জমা হয় ও তা অপসারণে কী পরিমাণ ব্যয় হবে তার তথ্য ডিপিপিতে সন্নিবেশিত করতে হবে পাউবোকে।
প্রকল্প দুটির আওতায় নদীরক্ষা কাজ, বাঁেেধর ঢাল সংরক্ষণ, বাঁধ মেরামত, খাল পুনর্খনন, নদী ড্রেজিং, রেগুলেটর নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ করার কথা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় কভিড-১৯-এর কারণে প্রকল্পের আওতায় বিদেশ ভ্রমণ ও গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় অফিস নির্মাণ বাবদ আলাদা বরাদ্দ প্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্প পাস করতে হলে যথাযথ পদ্ধতি ও নির্দেশনার আলোকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই একটি অবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।
এ প্রসঙ্গে পাউবোর মহাপরিচালক ফজলুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা আরেক কর্মকর্তা জানান, পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা মেনেই ডিপিপি সংশোধন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, তা ডিপিপিতে যুক্ত করে প্রকল্প দুটি আবার পাঠানো হবে।
