রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মনোভঙ্গি পাল্টাচ্ছে

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ১০:২১ পিএম

গতকাল (২৫ আগস্ট) রোহিঙ্গা ঢলের চার বছর পূর্তি হয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্যও একটা বিশেষ দিনে পরিণত হয়েছে। কেননা, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই, এ দিনটি একটি বিশেষ দিন কেননা উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয়প্রার্থী মানুষের এ রকম তীব্র স্রোত এর আগে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ কখনো দেখেনি। তা ছাড়া, নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের তীব্রতার বিবেচনায়ও ২০১৭ সালের ঘটনা রোহিঙ্গাদের জীবনে এর আগের সব অভিজ্ঞতার মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। তাই, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টরা, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গারা, পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন দেশের সক্রিয় অধিকারকর্মীরা প্রতি বছর ২৫ আগস্টকে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালন করে। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ২৫ আগস্ট যথাক্রমে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে এবং বিশেষ আয়োজন করেছে।

কিন্তু চার বছর ধরে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনার পাশাপাশি একটা বিষয় আমি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, জনপরিসরে ‘রোহিঙ্গাবিরোধী’ একটা শক্তিশালী সেন্টিমেন্ট, মনোভাব ও মনোভঙ্গি আস্তে আস্তে বেড়ে উঠেছে। বিশেষ করে কয়েকটা অধিপতিশীল (ডমিনেন্ট) ধারণা রোহিঙ্গা-সম্পর্কিত পাবলিক ডিসকোর্সকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। এখানে লেখা বাহুল্য যে, ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’-এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সে সময় উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগণ যেভাবে রোহিঙ্গাদের অত্যন্ত উষ্ণতার সঙ্গে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল, ২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের উখিয়া-টেকনাফের লোকজন কিংবা বাংলাদেশের মানুষ সেভাবে গ্রহণ করেনি।

কেননা এর মধ্যেই অনেক অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ১৯৯১-৯২ সালে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ২০১২ সালে আসে প্রায় ১ রাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। ২০১৬ সালে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। যদিও ১৯৭৮ এবং ১৯৯১-৯২ সালে আসা সাড়ে ৪ লাখ রোহিঙ্গার মধ্য থেকে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজারের রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয় কিন্তু সে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকেই আবার নানান পন্থায় বাংলাদেশে ফেরত আসে। ফলে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লক্ষাধিক এবং কারও কারও মতে সেটা ১৩ লক্ষাধিক। এ রকম বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতি স্থানীয় জনগণের ওপর একটা ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ফলে, ক্রমান্বয়ে স্থানীয় জনগণ চার দশক ধরে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত তাদের অবস্থান পাল্টেছে। আর স্থানীয় জনগণের এ ধারণা এবং অভিজ্ঞতা সারা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে মিডিয়ার কল্যাণে। কেননা, মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত রোহিঙ্গা সম্পর্কিত সংবাদের মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে রোহিঙ্গাদের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, রোহিঙ্গারা নানান ধরনের মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, রোহিঙ্গারা অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, নারী-শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত রোহিঙ্গারা, ইয়াবার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক রোহিঙ্গা, রোহিঙ্গাদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা, রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, রোহিঙ্গা নারীদের অনেকে ‘পতিতবৃত্তির’ সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে প্রভৃতি। যা মানুষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি নেতিবাচক মনোভঙ্গি তৈরি করতে সহায়তা করেছে এবং এসব নেতিবাচক খবরের মধ্যে সত্যতা নেই আমি সেটা বলছি না, কিন্তু এসব নেতিবাচক সংবাদের কারণে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে নানান ধরনের সমস্যা তৈরি করছে, সেটা প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠা পায়। যা রোহিঙ্গা-সম্পর্কিত একটি নেতিবাচক ডিসকোর্স নির্মাণে সক্রিয়ভাবে কাজ করে।

এর বাইরেও দুটি ঘটনা রোহিঙ্গাবিরোধী পাবলিক ডিসকোর্সকে আরও নেতিবাচক প্রণোদনা দিয়েছে। এর একটি হচ্ছে ভাসানচরে যেতে রোহিঙ্গাদের আপত্তি এবং আরেকটি হচ্ছে দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা হলেও একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি না-হওয়া। এ রকম বহুবিধ কারণ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা-সম্পর্কিত একটা পাবলিক ডিসকোর্স গড়ে উঠেছে, যা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে এবং শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের বিষয়টি ক্রমান্বয়ে জটিল করে তুলতে পারে।

রোহিঙ্গা নিয়ে গবেষণা করি বলে অনেকে আমার কাছে প্রায় সময় জানতে চান যে, ‘রোহিঙ্গারা কী আদৌ বাংলাদেশ থেকে যাবে?’ বা ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে কবে যাবে?’ বা ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আর কত দিন লালন-পালন করবে?’ এসব প্রশ্নের উত্তর খুব সহজে দেওয়া যায় না, কারণ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে কবে যাবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। মিয়ানমার আদৌ কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে, রোহিঙ্গারা কবে বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে, তা সহজে বলা সম্ভব নয়। সবকিছু বিবেচনায় নিলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগণের যে অসুবিধা হচ্ছে সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির কারণে উখিয়া-টেকনাফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে সেটাও অনস্বীকার্য। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে সেটা একেবারে অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু সবকিছুর জন্য রোহিঙ্গাদেরই দায়ী করা ঠিক হবে কি না সেটাই মৌলিক প্রশ্ন।

রোহিঙ্গাবিরোধী যেসব মনোবৃত্তি এবং মনোভঙ্গি জনপরিসরে জারি আছে সেগুলোর পেছনে কিছু কারণ আছে সেটা স্বীকার করেই আমি বলতে চাই যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বেড়াতে আসেনি কিংবা রাখাইনে নিজেদের বসতভিটা ফেলে ইচ্ছে করেই তারা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে এসে দু-চালা ঘরের মধ্যে শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছে না। এদের অনেকেই অত্যন্ত সচ্ছল জীবনযাপন করত রাখাইনে কিন্তু বাংলাদেশে এসে একটা শরণার্থীর জীবনও যাপন করতে পারছে না, কেননা বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবেও স্বীকার করে না। আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হবে এভাবে যে, ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবাই সাধু-সন্ন্যাসী নয়। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে সাধারণ নিরীহ রোহিঙ্গা যেমন আছে, তেমনটি কিছু কিছু দুষ্টু, দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, অপরাধীও আছে। তাই, এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতও আছে। কিন্তু এদের সংখ্যা খুবই কম। তাই, কিছু দুষ্কৃতকারী, সন্ত্রাসী এবং দুর্বৃত্তের জন্য সব রোহিঙ্গাকে দায়ী করা সঠিক কি না সেটা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

আর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না। কেননা, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গারা কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, তাদের ফেলে আসা বসতভিটা ফেরত দেওয়া হবে কি না, তাদের নাগরিকত্ব ফেরত দেওয়া হবে কি না প্রভৃতি কোনো প্রশ্নের উত্তর রোহিঙ্গাদের কাছে নেই। যে মৃত্যুকূপ থেকে বাঁচার জন্য রোহিঙ্গারা ‘জান’ নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে, সেই মৃত্যুকূপে রোহিঙ্গারা আবার জেনেশুনে লাফ দেবে, এটা কী আশা করা যায়? তাহলে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার সব দায়-দায়িত্ব মিয়ানমারকেই নিতে হবে। যদি বাকি কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে, তাহলে সেটা হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, কারণ তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সফল করার জন্য কোনো ধরনের সক্রিয় ভূমিকা পালন করেনি। খালি মুখে মুখে বড় বড় কথা বলেছে! তবে, ভাসানচরে যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের বিষয়টি মূলত ভাসানচর সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণার অভাবের কারণেই ঘটেছে বলে মনে করি। কিন্তু পরে যখন কয়েক পর্বে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যায়, তখন অনেক রোহিঙ্গা ভাসানচরে যাওয়ার জন্য রাজি হয়। তাই, ভাসানচরে যেতে অনাগ্রহী হওয়ার জন্যও এককভাবে রোহিঙ্গাদের দায়ী করা যাবে না।

পরিশেষে বলব, রোহিঙ্গারা হচ্ছে ভিকটিম। তাই, সবকিছুর জন্য ভিকটিমকে ব্লেইম করা যাবে না। কেননা, রোহিঙ্গারা একটা পরিস্থিতির শিকার। তাই, যারা এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তাদেরই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আর তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না-পারার ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গাদের না। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে কেন একা একা এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর দায়িত্ব নিতে হবে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাও সমান জরুরি।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত