নগর স্থাপত্য, ব্যর্থতা ও সময়ের ভাবনা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২১, ১০:২৩ পিএম

আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইমারতগুলো। সেখানে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ঘর বাঁধার স্বপ্ন। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে তারা স্বপ্ন দেখছে সুউচ্চ অট্টালিকায় একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করার। আমাদের শহুরে সভ্যতায় আরও সাম্যের সম্ভাবনাও আছে এখানে। এমন বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের জন্য ঢাকা শহরে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের আবাসন প্রকল্প। এই তো কিছুদিন আগেই মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে কলাবাগান বস্তিবাসীর মধ্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তা সত্যিই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে ও সোনার বাংলা গঠনের দৃষ্টান্ত। অবশ্য বস্তিবাসীর জন্য বরাদ্দ দেওয়া এসব ফ্ল্যাটের ভাড়া-সংক্রান্ত যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেটি মোটেই আলোচ্য বিষয় নয় আমার এই লেখায়। কিন্তু কথা থেকে যায় এই বহুতল ফ্ল্যাট প্রকল্পগুলোর স্থাপত্য নকশা, পরিকল্পনা এবং নির্মাণপ্রযুক্তিসহ পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে। এ জাতীয় অর্জনকে আরও টেকসই করার জন্য সেদিকে নজর দেওয়া এখন সত্যিই জরুরি।

একালের স্থপতিরা বিভিন্ন পর্যায়ে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্পগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, নানারকম স্থাপত্য প্রতিযোগিতায় সমসাময়িক নকশা নিয়ে কাজও করছেন। কিন্তু বাস্তবের নগর-মহানগরগুলোতে সেসবের বহিঃপ্রকাশ খুব একটা বেশি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলোর বাস্তবায়ন হয়তো আমাদের শহরগুলোকে আরও উন্নত করতে পারে। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটি উদাহরণকে গল্প হিসেবে সামনে আনতে চাই।

আমেরিকার পাবলিক হাউজিং প্রুইট-ইগো’র করুণ ব্যর্থতার ইতিহাস আমরা কমবেশি সবাই জানি। এ প্রসঙ্গে দি ইকোনমিস্টের ২০১১ সালের ১৫ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করতে চাই। যার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল কেন প্রুইট-ইগো আবাসন প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। প্রশ্ন করা হয়েছিল এর নকশা কি আধুনিক ছিল কি না? কিংবা এই আশাবাদ কি ভুল ছিল? আবাসন প্রকল্পটি ছিল সেন্ট লুইয়ের উত্তর পাশের দরিদ্র এলাকায়। এখানে ছিল মোট ৩৩টি ১১-তলার ভবন। ঘনবসতিপূর্ণ এই আবাসন প্রকল্পগুলো একেবারে শুরুর বছরগুলো থেকেই একটি ভয়াবহ বাস্তবতাকে অতিক্রম করে আসছিল। ১৯৫৭ সালে যেখানে প্রায় ৯১ শতাংশ বসবাসকারী থাকলেও ১৯৬০ সালে কিংবা তার পরবর্তী সময়ে আবাসনগুলোতে অতি দ্রুত গতিতে বসবাসকারীর সংখ্যা কমে আসছিল। যার অনেকগুলো কারণের মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও যুক্তিযুক্তভাবে স্থাপত্যের অপরিসীম পরিসীমাকে দায়ী করা হয়। যাকে আমরা স্থাপত্যের ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করতে পারি। আর এই স্থাপত্যের ব্যর্থতা সর্বশেষে ধরা দেয় নীতি এবং সামাজিক ব্যর্থতা হিসেবে। একপর্যায়ে এই সুবিশাল আবাসন কমপ্লেক্সের কেবল একটি ভবনে মাত্র একজন বসবাসকারীই রয়ে গিয়েছিলেন।

বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, গ্যাং কার্যকলাপ, মাদকসহ অনেক ধরনের অপসংস্কৃতির বিস্তৃতি হচ্ছিল ওই আবাসন প্রকল্প এলাকাটি জুড়ে। জনজীবনের ওপর যার প্রভাব পড়েছিল তীব্রভাবে। সেখানে টয়লেট থেকে শুরু করে বিদ্যুৎব্যবস্থা সবকিছুই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ছিল না বসবাসকারীর সঙ্গে স্থাপনাগুলোর জীবনযাপনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক! এমনকি প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন বর্ণ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে স্থাপনাটিকে চিন্তা করা হলেও সামগ্রিকতায় তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি কখনো।

অবশ্য, আজকের এই লেখায় যে বিষয়টির দিকে একটু নজর দিতে চাই সেটি হচ্ছে, শহরকেন্দ্রিক ঘনবসতিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা এসব বহুতলের আবাসন প্রকল্পগুলোর দিকে। যেখানে ছোট আকারের অনেক ফ্ল্যাট সন্নিবেশনের মাধ্যমে আমরা অল্প জায়গায় বেশি মানুষকে বসবাস করাতে চাচ্ছি কিংবা বাধ্য করছি। আবাসন সমস্যার সমাধান সাময়িকভাবে এই প্রকল্পগুলো দূর করতে পারলেও এই ধরনের প্রকল্পকে ‘বহুতল বস্তি’ বললেও ভুল হবে না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে এ ধরনের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিণতির দিকে! কারণ শুধু বসবাসের জায়গা প্রদান করার মাধ্যমেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ভবিষ্যতে আরও অনেক ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত কিংবা স্বাস্থ্যগত সমস্যা এসব আবাসন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাবে।

বিশেষ করে এই উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন প্রকল্পগুলো হয়তোবা সাময়িকভাবে নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য খরচের দিক থেকে সহজলভ্য মনে হতে পারে। কারণ সেখানে তারা কম খরচে থাকতে পারে কিংবা কম খরচে সেগুলো কিনতে পারে। তবে এই আবাসন প্রকল্পগুলোতে বসবাসকারীর শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো সঠিকভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন থেকে যায়! অর্থাৎ আমরা যে স্থানে বসবাস করছি সেই স্থানটির সঙ্গে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক তৈরি হয় এবং বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে বসবাসের জায়গার স্বরূপ যেমন ভেতরের পরিবেশ, আলো-বাতাসের সহজলভ্যতা, রং, প্রকৃতি, এমনকি উচ্চ স্থানে বসবাস করার কারণে বসবাসকারীর মনের ওপর বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এমনকি বসবাসের পরিবেশের ওপর বসবাসকারীর কর্মক্ষমতাও নির্ভর করে। বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যখন আমরা আমাদের শহরে যেকোনো পর্যায়ে একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন তৈরি করি বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে, যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো দেশের অর্থনীতিকে সচল করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে এবং তাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটি পারিবারিক গল্প রয়েছে। আর সেই গল্পগুলোর সঙ্গে যদি এই আবাসন প্রকল্পগুলোর স্থাপত্যিক নকশার কোনো ধরনের সামঞ্জস্য বা সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে একসময় সেই আবাসন প্রকল্পগুলোই বসবাসকারীদের ওপর বিরূপ মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

তাই যেকোনো ধরনের ‘পাবলিক হাউজিং’-এর স্থান নির্ধারণ কিংবা নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক সামগ্রিকতা, যেমন বসবাসকারীর আর্থসামাজিক অবস্থা, ধর্ম-বর্ণ, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিবেচনা করতে হবে সুচারুভাবে। নইলে এসব স্থাপনা দিন শেষে সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে না। উপরন্তু সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে আর টেকসই উন্নয়ন ও বর্তমান শিল্প-বিপ্লবের সময়ে এগুলোকে প্রাধান্য দিতেই হবে।

তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আমাদের বর্তমান স্থাপনাগুলোতে এই বিষয়গুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না, যা প্রকল্পগুলোর স্থাপত্যিক প্রকৃতি দেখলে সহজেই চোখে ধরা পড়ে। তথাকথিত গৎবাঁধা চিন্তাধারায় এই প্রকল্পগুলো ক্রমাগত গড়ে উঠছে। স্থাপনাগুলো মানবিক হয়ে উঠছে না। কেবল আবাসনের নিশ্চয়তার চিন্তা করেই এখন এসব বহুতল আবাসিক ভবনগুলোর পরিকল্পনা ও নকশা করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন অন্যান্য সমস্যা তৈরি হবে, তখন সমাধান করা দুরূহ হয়ে পড়বে এবং এই প্রকল্পগুলো আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপে পরিণত হবে!

লেখক : শিক্ষক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের পিএইচডি গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত