সানেমের জরিপ

প্রণোদনার ঋণ পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে ২৯% প্রতিষ্ঠানকে

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২১, ০১:০২ এএম

সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ পেতে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ২৯ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই ঘুষ দাবি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আরও ৪৭ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানগুলোও ঘুষের শিকার হয়ে থাকতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) পরিচালিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার সংস্থার এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। ৫০১টি শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গত জুলাইয়ে জরিপটি পরিচালনা করে সানেম।

সংবাদ সম্মেলনে জরিপের প্রক্রিয়া ও ফলাফল তুলে ধরেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী ২৯ শতাংশ উদ্যোক্তা বা তাদের প্রতিনিধিরা ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন। ৪৭ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটাই বলেননি। ‘মৌনতা সম্মতির লক্ষণ’ হিসেবে নিলে এরাও ঘুষের শিকার বলে ধরে নেওয়া যায়। তারা হয়তো ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলতে চাননি। আর মাত্র ২৪ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের কাছে ঘুষ চাওয়া হয়নি।

শিল্প কিংবা সেবা প্রতিষ্ঠানের ধরন ব্যাখ্যা করে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ঘুষের অভিযোগ তোলা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষুদ্র-মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। মোট ৪২ শতাংশ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। ৩৫ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান।

ঘুষের দাবিসহ বিভিন্ন কারণে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৯ শতাংশ জুলাই পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরে রয়ে গেছে। অর্থাৎ মাত্র ২১ শতাংশ প্যাকেজ থেকে ঋণ সুবিধা পেয়েছে।

তবে ব্যাংক কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ দাবি করা হয়েছে- সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি সানেমের পক্ষ থেকে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ঘুষ দাবি করা হয়েছে কি নাÑ এ প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জবাবের বাইরে বিস্তারিত কিছু জানতে চাওয়া হয়নি জরিপে।

করোনার অভিঘাত থেকে অর্থনীতি সুরক্ষায় ঋণ আকারে কয়েক দফায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে শিল্পঋণের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ রয়েছে।

পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষ ও কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ঋণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে প্যাকেজে। ব্যাংকের মাধ্যমে সহনীয় সুদে ঋণ আকারে এই প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন হারে ঋণের সুদে ভর্তুকি পরিশোধ করছে সরকার।

করোনা সংকট কাটিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা পায়নি ৭৯ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কোনো টাকা পায়নি। আর ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে জানেই না। বাকি ২১ শতাংশের মতো প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার অর্থ পেয়েছে। বড়দের তুলনায় ছোট প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা প্যাকেজের টাকা কম পাচ্ছে।

জরিপে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারা নিজেরা (নিয়োগকর্তা) এবং কর্মীদের কত শতাংশ টিকা পেয়েছেন? জবাবে ৬০ শতাংশ মালিক জানিয়েছেন, তারা কমপক্ষে এক ডোজ টিকা নিয়ে ফেলেছেন। আর কর্মীদের মাত্র সাড়ে ২৫ শতাংশ টিকা পেয়েছেন। ৭৫ শতাংশ কর্মী টিকার একটি ডোজও পাননি।  তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের প্রতি পাঁচজনে একজন মাত্র টিকা নিতে পেরেছেন।

জরিপের মূল বিষয় ছিল ব্যবসায় আস্থা। সানেম বলছে, গত এপ্রিল-জুন সময়ে কভিড পরিস্থিতি আগের প্রান্তিকের তুলনায় খারাপ ছিল। তাই ওই প্রান্তিকে ব্যবসায়ীদের আস্থা নেমেছে ৪১ শতাংশে। আগের প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তা ছিল প্রায় ৫৮ শতাংশ। তাহলে কভিডের কারণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কেমন ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীরা। ৬৪ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার গতি দুর্বল। ২৭ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, মোটামুটি মানের পুনরুদ্ধার হচ্ছে। আর ৯ শতাংশ ব্যবসায়ীর মতে, পুনরুদ্ধারের ধরন শক্তিশালী।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি শ্লথ। কভিড সংকট শিগগিরই শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই নতুন এই পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ঠিক করতে হবে। ঢাকায় যে ধরনের লকডাউন প্রযোজ্য হবে, রংপুরে সে ধরনের লকডাউন প্রযোজ্য নয়। আবার তৈরি পোশাক খাতের জন্য একধরনের কৌশল লাগবে, অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয়তো প্রযোজ্য হবে না। তাই সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল ঠিক করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত