কক্সবাজার ঘিরে নানা স্বপ্ন দেখতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। উন্নয়নের জন্য তিনি নানা পরিকল্পনা করেছিলেন। ঝাউবন স্থাপন করেছেন। তার রেখে যাওয়া পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করছি। কক্সবাজার হবে সর্ববৃহৎ পর্যটনকেন্দ্র এবং অত্যন্ত আধুনিক শহর। বিমানবন্দরটি বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রিফুয়েলিং হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। কক্সবাজার ঘিরে সরকারের আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককের আদলে সাজানো হবে বিমানবন্দরকে। অথচ অতীতের সরকারগুলো বিমান বা বিমানবন্দর নিয়ে কোনো কিছুই ভাবেনি। তারা শুধু লুটপাটই করেছে। আকাশে বিমান থেকে পানি পড়ত। গতকাল রবিবার সকালে কক্সবাজার সমুদ্রে সম্প্রাসারণ কাজের উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হন তিনি। অনুষ্ঠানে কক্সবাজারে বিদেশিদের জন্য একটি পৃথক স্পেশাল জোন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথাও পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন, বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেনসহ বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংসদসহ আওয়ামী লীগের নেতারা। বিমান পরিবহন প্রতিমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বেবিচকের চেয়ারম্যান অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন।
অনুষ্ঠান ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে পুরো কক্সবাজারে ছিল আনন্দের বন্যা। ব্যানার ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয় পুরো শহরকে। গতকাল ছিল পুরো শহরে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। সমুদ্রের ভেতরে রানওয়ের কাজ শুরু হওয়ায় পর্যটকরাও বেশ খুশি। তারা সরকারকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে যাতে কাজটি সম্পন্ন হয় সেদিকে নজর দিতে বলেন। অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অ্যাভিয়েশন অগ্রগতি সম্পর্কিত কর্মকা- নিয়ে অনুষ্ঠানে একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। ১ হাজার ৫৬৮ দশমিক ৮৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালের মে মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরের রানওয়ে হবে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। যার মধ্যে ১৩০০ ফুট থাকবে সাগরের বুকে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার বিমানবন্দর হবে বিশ্বের সাগর উপকূলে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দরগুলোর অন্যতম এবং এটিই হবে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে। ফলে বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতাও বাড়বে। বাড়বে ফ্লাইট অপারেশনের সংখ্যা। ভবিষ্যতে কক্সবাজারসংলগ্ন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইনসগুলোর বড় বড় উড়োজাহাজও অবতরণ করতে পারবে কক্সবাজারে। আগামী ৫০ বছরের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে এই প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সারা বিশে^র সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়। যাতে আর্থিকভাবেও আমাদের দেশ অনেক বেশি লাভবান হবে। অনেক চিন্তা ও পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে এবং কক্সবাজার নিয়ে তো আরও বেশি। সেইভাবে পুরো কক্সবাজারটাকে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ করব। তিনি বলেন, এই বিমানবন্দর সম্প্রসারণ হলে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে বা প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে যত প্লেন যাবে তাদের রিফুয়েলিংয়ের জন্য সব থেকে সুবিধাজনক জায়গা হবে কক্সবাজার। কারণ, একেক সময় পৃথিবীর একেকটি জায়গা উঠে আসে। একসময় হংকং তারপর সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এখন দুবাই। কিন্তু আমি বলতে পারি যে, ভবিষ্যতে কক্সবাজারটাই হবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। খুব স্বল্প সময়ে এখানে বিমান এসে নামতে এবং রিফুয়েলিং করে চলে যেতে পারবে। এই রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমি মনে করি, আমরা যে ওয়াদা জনগণের কাছে দিয়েছিলাম সেটি আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সমুদ্র তীরবর্তী জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ করে নতুন ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে হবে যার ফলে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭-এর মতো বড় আকারের বিমানগুলো এই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারবে এবং এখানে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করার পথ সুগম হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা সরাসরিই কক্সবাজারে আসতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এই যে জলভাগের ওপর আমরা একটা রানওয়ে নির্মাণ করছি সেটাও দৃষ্টিনন্দন হবে এবং অনেকে এটাই দেখতে যাবে। তিনি জলভাগের ওপর এই রানওয়ে নির্মাণের সাহস নিয়ে কাজ শুরু করতে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপকল্প ঘোষণা করেছিলাম ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে, সেখানে আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছি। এটাকে ধরে রেখে আমাদের উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইনশাআল্লাহ আমরা তা করতে পারব।’ বাংলাদেশ থেকে যেসব আন্তর্জাতিক রুটে বিমান যাচ্ছে তার পাশাপাশি আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুট চালুর প্রচেষ্টা চলছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিউইয়র্ক, টরেন্টো, সিডনির মতো দূরত্বে চলার মতো আমাদের ড্রিমলাইনার ও অন্যান্য বিমান আছে। বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ হবে। তিনি বলেন, আমরা শুধু পশ্চিমাদের দিকে মুখ করে থাকব না। পাশাপাশি, আমরা অন্য যেসব বন্ধুপ্রতিম দেশ আছে সেখানে আমাদের বিমান যাতে যায় ভবিষ্যতে সেই চেষ্টা করব। সরকার দেশের প্রত্যেকটা বিমানবন্দরের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমাদের আরও বেশি কাজ করা দরকার। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকেও তার সরকার উন্নত করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে যেন উন্নত হয় যাতে ভুটান, নেপাল বা ভারতের কয়েকটা রাজ্য এই বিমানবন্দরটি ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে এটিকে একটা আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে আমরা উন্নত করতে চাই। সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেখানেও মেঘালয়, আসাম বা ভারতের অনেক রাজ্য থেকেও তারা এ বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটাও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সেখানেও ত্রিপুরা থেকে শুরু করে ভারতের অনেক প্রদেশ এটা ব্যবহার করতে পারে। সেভাবে একটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তৈরি করা এবং সেভাবে উন্নত করার চিন্তা আমাদের মাথায় রয়েছে। বিমানের কর্মকর্তাদের কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সততার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে এয়ারলাইনস পরিচালনা করবেন। সিভিল অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সবকিছু যাতে আন্তর্জাতিক মানের হয় সেটি আপনারা দেখবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সাড়ে ১২ বছরে বোয়িং কোম্পানির ড্রিমলাইনারসহ মোট ১৬টি অত্যাধুনিক বিমান যুক্ত করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ৪টি বোয়িং-৭৭৭, ২টি বোয়িং-৭৩৭ ও ৪টি বোয়িং-৭৮৭-৮, ২টি বোয়িং-৭৮৭-৯ ও ৪টি ড্যাশ-৮। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা ‘রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকেও উন্নত করব। ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করব। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ কাজ তার সরকার সম্পন্ন করতে পারবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা বলতেন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানটা এমন যে, বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। অর্থাৎ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ এই বাংলাদেশ রচনা করতে পারে। সেই সুযোগটা আমাদের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে আকাশ পথে যেতে যেতে পানি পড়ত, এন্টারটেইনমেন্টের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ঝরঝরে ছিল প্লেনগুলো। এই মান্ধাতার আমলের বিমান চালাতে পারায় তিনি সে সময়কার পাইলটদের দক্ষতার কদর করে তিনি বলেন, আমি আমাদের পাইলটদের বলতাম তাদেরকে আমাদের স্পেশাল পুরস্কার দেওয়া উচিত। বিমানে ভ্রমণের সময় অনুমতি নিয়ে শেখ হাসিনা ককপিটে গিয়ে পাইলটদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যার কথাও শুনতেন। আমাদের প্রবাসে ১ কোটির কাছাকাছি মানুষ থাকে। তারা কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্লেন পেলেই সেটাতে চড়তে চায়। তাতে যত কষ্টই হোক। কিন্তু যেই অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হতো। বিমানে চড়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু তারপরও মনে হতো নিজের দেশের জাহাজে যাচ্ছি, এটাই সব থেকে বড় কথা ছিল।
