হালকা প্রকৌশল শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৫৮ পিএম

পাকিস্তান আমল থেকে শিল্প বলতে আমরা প্রধানত ভারী শিল্পকেই বুঝেছি এবং সে সময়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে বহু দেন-দরবার করে ছিটেফোঁটা কয়েকটি শিল্প এই অঞ্চলে স্থাপন করতে সক্ষমও হয়েছি। এগুলোর অধিকাংশই এখন রুগ্ণ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে পড়েছে। ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা হালকা প্রকৌশল শিল্পের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা তখন আমাদের তেমন একটা মনে আসেনি, অথবা আমদানিকারকদের স্বার্থে স্বেচ্ছায় সেটা ভুলে গেছি। ফলে এই সব কলকারখানার খুচরা যন্ত্রাংশ ও মেরামতের জন্য চীন ও জাপানের ওপর নির্ভরতা ছিল প্রায় শতভাগ। শুধু তাই না, ব্লেড, সুচ, স্ট্যাপলার ও তার পিন, আলপিনের মতো ছোটখাটো শিল্পজাত পণ্য পর্যন্ত আমদানি হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমদানিকারক ও বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতায় পণ্য আমদানি ব্যাহত হয়। কিন্তু কলকারখানার মেরামত ও খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ থেমে থাকেনি; উর্বর উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী বাঙালি নিজেরাই জোড়াতালি দিয়ে তখন নষ্ট হয়ে যাওয়া অনেক যন্ত্রাংশ তৈরি করে অচল মেশিন সচল করেছে; জিঞ্জিরা-ধোলাইখাল এক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এখনো এই উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।

কয়েক দিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম যে, বিগত অর্থবছরে ৮০.৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে লাইট ইঞ্জিয়ারিং উপ-খাত ৫২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি সম্পন্ন করেছে। প্রায় আট লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্য চাহিদার ৩০ শতাংশ পূরণ করার পর এই রপ্তানি আয় সম্ভব হয়েছে। দেশের জন্য এটা অবশই আশা জাগানিয়া একটা সংবাদ। যদিও বিশ্বে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের বাজারে আমাদের বর্তমান অংশ অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বলে গণ্য, কিন্তু সেটা আবার অমিত সম্ভাবনার কারণও; তার মানে আমাদের অনুকূলে অকর্ষিত বাজার রয়েছে, এখন শুধু সেটা দখলে নেওয়ার জন্য একযোগে কাজ করা দরকার। সুযোগ ও সমর্থন পেলে কঠোর পরিশ্রমী ও উর্বর মস্তিষ্কধারী বাঙালি হেন কাজ নেই, যেটা করতে পারে না। এখানেও সে তার পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হতে পারে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং উপ-খাত দেশের অভ্যন্তরে তৈরি পোশাক, চাল, পাট, চিনি, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, রেল, সড়ক পরিবহন, নির্মাণ ও জাহাজ প্রভৃতি শিল্পে নানা ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ, ঢালাই ও ছাঁচ প্রক্রিয়াজাত যন্ত্রাংশ, ডাইস ও মেরামত সেবা সরবরাহ করে আসছে। পরে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্য ও সামগ্রী। এক কথায় বলা যায়, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত দেশের সব ভারী ও বড় শিল্পের অন্নদাত্রীর ভূমিকা পালন করে আসছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে এই খাতের পণ্য-চাহিদা যেমন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনা রয়েছে খাতটির সক্ষমতা এবং পণ্যের মান বৃদ্ধির সুযোগ। তবে অর্থনীতিতে তাদের দিয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করানোর লক্ষ্যে স্বল্প পুঁজির এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে প্রণোদনা দিতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে এদের বিনিয়োগ এবং ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে হবে। একবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে এবং বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানা রকম ঝামেলা মোকাবিলা না করতে হলে তারা নিজেরাই নিজেদের উদ্বৃত্ত পণ্যের বৈদেশিক গন্তব্য খুঁজে বের করতে পারবে।

বর্তমানে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ঝুড়ি একেবারেই বৈচিত্র্যহীন; ৮০ শতাংশেরও বেশি আয় আসে কেবল একটি খাত থেকে, সেটি তৈরি পোশাক। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থার ভঙ্গুরতা বোঝাতে এটাকে এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখার সঙ্গে তুলনা করেন। সরকারও এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। রপ্তানির ভঙ্গুরতা দূর করে টেকসই বাণিজ্যিক আয় বাড়াতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং হতে পারে একটি অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এই খাতের সুবিধা হলো এই যে, এখানে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক তত্ত্বাবধানে কাজ পরিচালিত হয়। ফলে শিল্প রুগ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অপেক্ষাকৃত কম পুঁজি প্রয়োজন হওয়ায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন সাধারণ মানুষও অনেক সময় ব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই এই জাতীয় শিল্প গড়ে তুলতে পারে। ফলে দেশব্যাপী এ শিল্পের দ্রুত বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এই শিল্প মানুষের আয় বণ্টনকে সমমাত্রিক করতে সহায়তা করে। এখন উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশে আয় বৈষম্যের বল্গা হরিণ যে ভাবে দ্রুতলয়ে ছুটে চলেছে, তারও লাগাম টেনে ধরতে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এই শিল্পের বিস্তার দেশে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তৈরি করতে পারে, মানুষকে স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে, তাদের মধ্যে যে অফুরন্ত শক্তি আছে, সে উপলব্ধি জাগ্রত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাতটির গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংকে ‘বছরের পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, বগুড়া ও নরসিংদীতে শিল্প মন্ত্রণালয় নিবেদিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। খুবই ভালো উদ্যোগ। এইসব শিল্প পার্ক নির্মাণের দায়িত্ব পড়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার ওপর। কিন্তু ঢাকা থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর ও সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন নিয়ে এই সংস্থাটি যে দক্ষতা ও সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে, তাতে দ্রুততম সময়ে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নিবেদিত শিল্পপার্ক তৈরি করা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়া যায় না। এজন্য বিশেষ ব্যবস্থাধীনে এটা সম্পন্ন ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

শিল্পপার্ক স্থাপনের সুবিধা এই যে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া যেমন সহজ, তেমনি উদ্যোক্তাদের জন্যও সেগুলো ব্যবহার করা সুবিধাজনক। তাছাড়া শিল্পপার্কে বিদেশিরা নানা সুবিধার কারণে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে থাকেন। এই ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের এই খাতটি উদীয়মান হলেও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ছোঁয়া সেখানে খুব কমই আছে; এখানকার কারিগরদের অধিকাংশই ‘গাইতে গাইতে গায়েন, আর বাজাতে বাজাতে বায়েন’। পণ্যের রপ্তানিযোগ্যতা বাড়াতে হলে কারিগরদের নৈপুণ্য ও পণ্যের মান বাড়ানো প্রয়োজন। নৈপুণ্য বৃদ্ধি করতে দরকার আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। এই কারণে আমাদের শিল্প পার্কগুলোতে পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্বও কম নয়। কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি দেশের আধুনিক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

শিল্পপার্কের বাইরে সারা দেশে ছোট ছোট যে সব ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে, সেগুলো যাতে নির্বিঘেœ কাজ চালাতে পারে এবং ব্যবসা করতে পারে, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। দেশে এখন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কম পক্ষে নয় দশটি সরকারি সংস্থা থেকে প্রত্যয়নপত্র/ অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। এসব সংস্থায় যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতাদের মক্কেল বিবেচনায় হাইকোর্ট দেখিয়ে ছাড়েন। এতে উদ্যোক্তাদের মনোবল রসাতলে নেমে যায়। এই কারণে দেশে সহজে ব্যবসা করার সূচক ১৭৬ থেকে আর উন্নত হচ্ছে না। এজন্য ছোট ছোট কারখানা গড়ে তুলতে সরকারি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্রের সংখ্যা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার তাদের কাজে প্রণোদনা না দিতে পারুক, অন্তত ঝামেলা যদি না করে, তাতেও অনেকে উদীপ্ত হবে এবং তাদের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগাতে সমর্থ হবে।

একবার বগুড়ায় এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। তার ছোটখাটো একটা ছাঁচ ও ঢালাই কারখানা ছিল। তাতে নানা ধরনের লোহার যন্ত্রাংশ তৈরি হতো। আমি জানতে চাইলাম তার উৎপাদিত পণ্য তিনি কোথায় বিক্রি করেন। তিনি জানালেন যে, স্বয়ংক্রিয় চালকলের খুচরা যন্ত্রাংশ হিসেবে তিনি সেগুলো সরবরাহ করে থাকেন। আমি নিজে তখন পেশাগতভাবে চাল উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশ অবহিত। কাজেই কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তার কারখানায় গেলাম নিজে দেখে আশ্বস্ত হওয়ার জন্য। ছাঁচ ও ঢালাই অংশের পর পলিশিং অংশে এসে দেখি যে, একটা মেশিন কাঠের বড় একটা তিনতল বিশিষ্ট কফিনের মতো বাক্স দিয়ে ঢাকা। তিনি জানালেন যে, এটা তার নিজের উদ্ভাবিত স্বয়ংক্রিয় চালকলের একটা বড় যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি যাতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে চুরি না যায়, তার জন্য এই গোপনীয়তা রক্ষার প্রচেষ্টা। এটা স্থানীয়ভাবে তৈরিতে তখন তার খরচ হয়েছে মাত্র দশ হাজার  টাকা, কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই মেশিন আমদানি করেছে সত্তর-আশি হাজার টাকা দিয়ে। আমি তার বুদ্ধি, কৌশল ও উদ্ভাবন ক্ষমতা দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভাবলাম আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও চত্বর মাড়িয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছি, তাতে ইংরেজি ও বাংলায় কিছু তত্ত্ব আলোচনা করতে পারি বটে, কিন্তু তা এই স্বল্প শিক্ষিত কারিগরের সৃষ্টিশীলতার কাছে একেবারেই ফেলনা। এই জাতীয় গুণী কারিগর কিন্তু সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এখন শুধু তাদের উন্মেষ ও বিকাশে সহায়তা করতে হবে। সরকারি সহায়তা এবং সহায়ক নীতি তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে বহুদূর। 

পত্রিকাটিতে দেখলাম ২০১৭ সালে সমাপ্ত অর্থবছরে এ খাতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় হয়েছিল; পরিমাণ ছিল ৬৮৮.৮৪ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু পরবর্তী তিন অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ নেমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৫৫.৯৭, ৩৪১.৩০ ও ২৯২.৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। উন্নয়নের জন্য এত দৌড়াদৌড়ি আর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ঘটা করে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়ন করার পরও কেন উপর্যুপরি চার বছর এই খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি ২০১৭ সালের তুলনায় নেতিবাচক এবং এখনো কেন আগের অর্জন অতিক্রম করতে পারছি না, তা গবেষণা করে বের করা জরুরি। এই খাতে প্রধান প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানব সম্পদের অভাব রয়েছে, যার ওপর আগেই আলোকপাত করা হয়েছে। এরপর আসে আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গ। আর্থিক সহায়তা এদের পণ্যের মানের উন্নয়ন, ব্যবসায়ের সম্প্রসারণ এবং ব্যাংকিং সেক্টরে তাদের প্রবেশাধিকার ঘটাতে পারে। এবার কভিড মোকাবিলায় যে সব আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়, তার মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্যাকেজ ছিল মাত্র ২/৩টি, সনাতনী পদ্ধতিতে বিতরণের ব্যবস্থা করায় সেগুলোরও আবার আশি শতাংশের বেশি অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। এটা থেকে এই খাতে সরকারি আর্থিক সহায়তার অবস্থা বোঝা যায়। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে তাদের আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় তা ফলপ্রসূ হবে না। রপ্তানি বাড়াতে গেলে পণ্যের মানোন্নয়ন ও তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সার্টিফিকেশন প্রয়োজন। এজন্য পণ্যের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তার সার্টিফিকেশনের জন্য মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। এটা গড়ে তোলার জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। আরেকটি বিষয় নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নিতে হবে এবং শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে তা নির্মোহভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে নানা ক্ষেত্রে কায়েমি স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের নীতিনির্ধারণী মহলে প্রবেশাধিকার রয়েছে। তারা গোষ্ঠী-স্বার্থে সমষ্টিগত স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে নীতিনির্ধারকদের নানাভাবে প্রভাবিত করে থাকে। বাজারেও এই রাঘব-বোয়ালরা অসম প্রতিযোগিতার সুবাদে ছোটদের ‘মাৎস্যন্যায়’ প্রক্রিয়ায় গিলে খায়।

ভারতবর্ষ খণ্ডিত হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার আত্মনির্ভরতার নীতি অনুসরণে পণ্য আমদানি সীমিত করে ফেলে। কিন্তু পাকিস্তানে গোষ্ঠী-স্বার্থে ছোটখাটো শিল্পপণ্যও আমদানি অবারিত থাকে। ফলে তখনকার পূর্ববাংলায় ভারী শিল্প তো দূরের কথা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পও গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। পক্ষান্তরে ভারত সনাতন হিন্দু দর্শনের পঞ্চম প্রত্যয় ‘বহুজন সুখায়ে, বহুজন হিতায়ে’ অর্থাৎ ‘বহু মানুষের কল্যাণই বহু মানুষের সুখ’ নীতি গ্রহণ করায় ভারত স্বল্প সময়ের মধ্যে স্বনির্ভরতার নাগাল পায়। স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু হিন্দুবাদী নেতা ছিলেন না; ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ বাম ঘেঁষা দেশপ্রেমিক রাজনীতিক। কিন্তু ধর্মীয় দর্শনের মধ্যে সমষ্টিগত কল্যাণের প্রতিফলন থাকায় তিনি সেটা আঁকড়ে ধরেছিলেন। আমাদের এখানেও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বহুজনের কল্যাণে বহুত্ববাদী নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। শিল্পের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং উপ-খাত বহুত্ববাদকে কিছুটা হলেও সামনে নিয়ে আসবে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামনিস্ট

[email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত