কলকাতার প্রগতিশীলতা ও বাঙালি হিন্দুর মন-২

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম

কলকাতার চারপাশে ঘিরে রয়েছে অজস্র কলোনি। সব গড়ে উঠেছে, বলাবাহুল্য সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে। ওপার থেকে নানা কারণে বাঙালিদের এক অংশ এপারে চলে আসার পরে একের পর এক এই কলোনিগুলো গড়ে উঠতে থাকে। সব কটি কলোনি তৈরির পেছনেই নিঃসন্দেহে বামপন্থি দলগুলোর বিরাট ভূমিকা আছে। উদ্বাস্তু মানুষদের দাবি-দাওয়া নিয়ে লড়াই-সংগ্রামের পুরোভাগে তখন থেকেছে বামপন্থিরা।

দক্ষিণ কলকাতার বিপুল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে বিরাট বিরাট কলোনি। ওইসব কলোনির নামকরণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ স্পষ্ট। গান্ধী কলোনি, আজাদ গড়, বাপুজীনগর, নেতাজি কলোনি ইত্যাদি। পাশাপাশি বাম হাতের চেতনাও বোঝা যায় লেনিন গড় নামের মধ্যে। খুব ভুল না করলে সিপিএমের প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক প্রমদ দাশগুপ্তের নামেও বোধহয় এক আধটা কলোনির নাম আছে। জ্যোতি বসুর নামে তো আছেই। এমনকি বাম আমলে গড়ে ওঠা ঝা চকচকে, অত্যাধুনিক শহর নিউ টাউনের নাম জ্যোতি বসুর নামে করার দাবিতে সিপিএম এখনো মাঝেমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পরে কলকাতায় একের পর এক উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে উঠতে লাগল। অধিকাংশ কলোনিই অবশ্য গড়ে উঠল স্থানীয় অধিবাসীদের জমির ওপর। দেশভাগের পরে কলকাতার জনবিন্যাস পুরো বদলে গেল। সেলিমপুর, যাদবপুর, মানিকতলা, বাগমারি, শিয়ালদহ, বেলেঘাটা, শ্যামবাজার, শোভাবাজার, বিডন স্ট্রিট, ভবানীপুর, টালীগঞ্জ কলকাতার বিস্তৃত এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনবসতি রাতারাতি কোনো এক অজ্ঞাত জাদুমন্ত্রে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেইসব শূন্যস্থানে গড়ে উঠল রিফিউজি কলোনি। একটা বিষয় শুধু কিছুতেই মেলাতে পারি না। বামপন্থি ভাবধারার লোকজন যেসব কলোনি গড়ে তুললেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, গান্ধী, লেনিন, এমনকি জ্যোতি বসু আছেন কিন্তু ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার পেছনে যার অবদান বিরাট সেই মুজাফফর আহমেদের নামে কোনো কলোনি আমি অন্তত দেখিনি। বা আব্দুল্লাহ রসুল কিংবা আব্দুল হালিমের নামে কোনো কলোনি আছে বলে মনে করতে পারছি না। রসুল সাহেব ও হালিম সাহেবের নামে রাস্তা আছে। কিন্তু তাও ওই মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। জনবহুল কোনো উচ্চবর্গের হিন্দু এলাকায় কোনো মুসলিম নাম, সাহিত্যিক হোন বা রাজনীতিক দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। আপনি বলতেই পারেন, নামে কিইবা আসে যায়, আপাতভাবে হয়তো কিছু তফাৎ হয় না। কিন্তু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে এর পেছনে যে একধরনের অবহেলা বা অজ্ঞতা কাজ করে সেটা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু মুসলিমরা বোঝে। সাহস করে বলতে পারে না। আমার খুব স্নেহের এক তরুণী আছে, হালিমা। বসিরহাটের দিকে থাকে। সে ওই তল্লাটের নামকরা সমাজকর্মী। মেয়েদের একজোট করে নানা সামাজিক আন্দোলন করে। ওকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোর নামের জন্য কোথাও কোনো অসুবিধে হয়! আমতা আমতা করে সে বলেছিল, হয় দাদা। সরকারি অফিসে গেলে কেউ কেউ এমন করে তাকায়, মনে হয় আমরা যেন অন্য কোনো গ্রহের জীব। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণ যারা করেন, সেই নেতাদের নামগুলো দেখুন, কোথাও কোনো মুসলিম, আদিবাসী, দলিত নেই। কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী, সিপিআইএম-এর সূর্য কান্ত মিশ্র, সিপিআই-এর স্বপন ব্যানার্জী, আরএসপির মনোজ ভট্টাচার্য, এমনকি নকশালপন্থি লিবারেশন-এর অভিজিত মজুমদার। তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রভাবশালী মন্ত্রী হলেন ব্রাত্য বসু, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অমিত মিত্র ইত্যাদি।

বাঙালি মুসলমান বলতে শিবরাত্রির সলতে সিদিকুল্লাহ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রীও আছেন একজন, জাকির হোসেন। সিদিকুল্লাহ চৌধুরী জামাতে উলেমার একসময়ের দাপুটে নেতা ছিলেন। এক ডাকে লাখো লোক জড়ো করতে পারতেন। এখন বেচারাকে দেখলে কষ্ট হয়। আক্ষরিক অর্থেই নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহ। বিভিন্ন দলের যে সব শাখা সংগঠন আছে সেখানেও মুসলিম হাতেগোনা কয়েকজন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনসংখ্যা কম করেও সাতাশ আটাশ শতাংশ। তাদের মধ্যে কোনো যোগ্য নেতা কোনো দলেই খুঁজে পাওয়া যায় না এটা মেনে নেওয়া কঠিন। আসলে এটা দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা। অবচেতনে এক ধরনের ইসলাম বিদ্বেষ আশৈশব আমাদের বাবু-ভদ্রলোকদের মনোজগতে থেকে গেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে যে মধ্যস্বত্বভোগী বাবু সমাজের উদ্ভব, রেনেসাঁ পরবর্তী কলকাত্তাইয়া সেই বাবু সমাজের নিয়ন্ত্রণেই থেকে গেছে আমাদের এ বঙ্গের সামাজিক, রাজনৈতিক ও

সাংস্কৃতিক কাঠামো। এই উচ্চবর্গের মনুবাদী কাঠামোতে শুধু মুসলমান নয়, দলিত, আদিবাসী কারোর কোনো জায়গা নেই। এ এক ভয়ংকর আধিপত্যবাদী কাঠামো। যা ওপর ওপর প্রগতিশীল মনে হয় যাদের, তারাও এর মধ্যেই ঢুকে থাকেন। মুখে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ পালিশ লাগিয়ে। একটু আধটু আঁচড় লাগলে প্রগতির মুখোশটুকু সরে গিয়ে তাদের কুৎসিত বিদ্বেষী চেহারা সামনে বেরিয়ে আসে।

কোথায় কোন ফ্রান্সে হামলা হলে বা পাকিস্তান কিছু গর্হিত অপরাধ করলেই অতি নিরীহ সাত-পাঁচে না থাকা মুসলমান নারী-পুরুষকেও ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে হয়। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বিদ্রƒপ থেকে বাঁচতে। তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছে কি করেনি, প্রশ্ন আসতে লাগল আব্বাস সিদ্দিকী বা সিদিকুল্লাহ চৌধুরীর জবাবদিহি চেয়ে। যেন মুসলমান বলে তাদেরই দায় তালেবানের যাবতীয় দোষত্রুটি শুধরে দেওয়ার। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যারা ভিয়েতনামে, ইরাকে বোমা হামলা চালিয়ে নারকীয় হত্যালীলা চালিয়েছে, ভুলেও এই প্রগতিশীলরা কখনো তার জন্য নির্দিষ্ট করে খ্রিস্টানদের দিকে আঙুল তোলেন না। আমি একবার একটা সমীক্ষা করেছিলাম, প্রতিবেশী মুসলমানদের সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কী ভাবেন তাই নিয়ে। পঞ্চাশ জন নানা পেশার লোকজনকে ইন্টারভিউ করেছিলাম। সবাই এক বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, সব মুসলমান টেরোরিস্ট না হলেও সব টেরোরিস্টই মুসলমান! যাদের ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম তারা সবাই কিন্তু সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের ভদ্রলোক পরিমন্ডলে রবীন্দ্রচর্চা, নজরুল স্মরণ, একুশে ফেব্রুয়ারি, এমনকি বাবরি মসজিদ ভাঙা বা গুজরাট গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতি বছর ঘটা করে ধিক্কার দিবস সব হয়। কিন্তু সেখানে উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিত থাকেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন। ইদানীং শোনা যাচ্ছে এদেশটা আর কয়েক বছর বাদেই পাকিস্তান হয়ে যাবে! পশ্চিমবঙ্গ হলো বলে! কতখানি বিদ্বেষ থাকলে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোলাখুলি প্রকাশ্যে ‘বেগম’, ‘খালাম্মা’ বলে আক্রমণ করেন তা ভাবতে পারি না। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকতেই পারে কিন্তু কুৎসিত ব্যক্তি আক্রোশ মেনে নেওয়া যায় না। এর পেছনে কিন্তু ওই ইসলাম ফোবিয়া। বিদ্বেষ যে কোন পর্যায়ে গেছে তা বাসে-ট্রেনে উঠলেই আমার সহ-নাগরিকরা টের পান। এই বিষ জনমনে চারিয়ে যাচ্ছে সংঘ পরিবারের ঘৃণ্য রাজনৈতিক কৌশলে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সে এমনভাবে কিছু বিষয় সাধারণ মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, যা প্রভাবিত করছে অনেক উচ্চ শিক্ষিতকেও। কয়েক দিন আগে ঘনিষ্ঠ এক ডাক্তারের বাড়ি গিয়েছিলাম। অত্যন্ত ভালো মানুষ। বামপন্থি। কথায় কথায় বললেন, অবস্থা খুব খারাপ রে। সরকারি হসপিটালে যত বাচ্চা জন্মাচ্ছে তার বেশিরভাগ মুসলমান। ধর, একশো জন বাচ্চা হচ্ছে, তার আশিজনই মুসলমান। এরকম হলে এ রাজ্য বাংলাদেশ হলো বলে। এ না হয় একজন ডাক্তারের কথা। একজন সাহিত্যিকের কথা বলে লেখা শেষ করব। জনপ্রিয় এই লেখক লিখছেন, কিছু অসচ্ছল মহল ও কোনো কোনো ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে বৈকি। হাজারীবাগে তো আমি বহুবার এসেছি। ছোটবেলা থেকে। কিন্তু মুসলমানের সংখ্যা কখনো এতো ছিল না। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িতরাও এসে জুটছে। বুঝলি রুদ্র, ভারতবর্ষ আর পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পাকিস্তান হয়ে গেলেও, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই, খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আপনারাও অবাক হবেন না দয়া করে। এই জনপ্রিয় লেখকের নাম বুদ্ধদেব গুহ। সবে যিনি চলে গেলেন।

লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত