তালেবানরা যতটা সহজে আফগানিস্তানের দখল নিয়েছে, ঠিক ততটা সহজে সরকার গঠন করতে পারছে না। গত ১৫ আগস্ট কাবুলের দখল নেওয়ার পর দুই দফায় সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে তালেবান। একের পর এক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তালেবানের সরকার গঠনের চেষ্টা। কথা ছিল গত শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষ করে নতুন সরকারের ঘোষণা দেবে তালেবান। দোহায় তাদের রাজনৈতিক দপ্তর থেকেই একই কথা বলা হয়েছিল।
শুক্রবার দুপুর থেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো আফগান পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে শুরু করে। চলতে থাকে অপেক্ষার প্রহর গোনা। একটু একটু করে রাত ১২টা গড়ালেও তালেবানদের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। এরপর মাঝরাতে তালেবানের এক মুখপাত্র জানান, ‘আগামীকাল অর্থাৎ শনিবার সকালে নতুন সরকারের ঘোষণা দেওয়া হবে।’ কিন্তু গতকাল শনিবার সকালেও কাক্সিক্ষত ঘোষণা আসেনি।
শনিবার এমন টানটান উত্তেজনার মধ্যেই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করেন পাকিস্তানের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টিলিজেন্সের (আইএসআই) প্রধান ফাইজ হামিদ। তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো কোনো উচ্চপদস্থ বিদেশি কর্মকর্তা দেশটিতে পা রাখলেন। পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়েই কাবুলে সফর করছেন ফাইজ হামিদ। তার কাবুলে পৌঁছানোর পর এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। পাকিস্তান এবং আইএসআইয়ের বিরুদ্ধে আগে থেকেই তালেবানকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফাইজ হামিদের এই সফর তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা আরও উসকে দেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, ফাইজ হামিদের কাবুলে প্রবেশের কিছু সময় পরেই তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। সেখানে তিনি জানান, আফগানিস্তানের নতুন সরকার গঠনের সময় পিছিয়ে আগামী সপ্তাহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জবিউল্লাহর এমন ঘোষণার পর তালেবান নেতৃত্ব ও আফগান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকা জানায়, তালেবানরা নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণেই সরকার গঠন করতে পারছে না। তবে আফগান পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন আরেক দল বিশ্লেষক মনে করেন, পাকিস্তানের ইশারাতেই তালেবানরা নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দিয়েছে। কারণ, দোহা চুক্তি অনুসারে তালেবানের সরকার গঠনে কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন একটি সরকার গঠিত হতে হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবে। আর এমন সরকার গঠিত হলে পাকিস্তান একচেটিয়াভাবে তালেবানের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। এ জন্যই উপযুক্ত সময়ে কাবুল সফরে গেলেন আইএসআই প্রধান।
প্রসঙ্গত, কাতারে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছে তালেবানের একটি প্রতিনিধিদল। গত শুক্রবার দোহায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দোহায় পাকিস্তানি দূতাবাসে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে তালেবান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন রাজনৈতিক কার্যালয়ের বর্তমান প্রধান শের মোহাম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই। তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আহসান রাজা শাহের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তালেবান মুখপাত্র সুহাইল শাহীন টুইটারে বলেছেন, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও সীমান্তের গতিপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে পানশির প্রদেশের দখল কাদের হাতে রয়েছে এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তালেবান দাবি করছে, তারা পানশিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তালেবানের এমন দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে পানশিরের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট বলছে, তালেবানের বেশ কয়েকটি আক্রমণ তারা প্রতিহত করেছে এবং পানশিরের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই আছে। পানশির প্রদেশ আয়তনে ছোট হলেও কাবুল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলে অবস্থিত পানশির কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং একে জয় করা খুব একটা সহজ নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আমলেও এই অঞ্চল দখল করা যায়নি। ফলে এবারও যে তালেবানরা খুব সহজেই পানশিরের দখল নেবে এমনটা মনে করেন না অনেকে।
পানশিরের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নেতা আহমেদ মাসুদ বলেছেন, জনগণ প্রতিরোধ ছেড়ে যাবে না। প্রয়াত নেতা আহমেদ শাহ মাসুদের এই ছেলে শনিবার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, আফগান জনগণ স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করছে আর কখনই প্রতিরোধ ছাড়বে না।
ফেইসবুক পোস্টে আহমেদ মাসুদ লিখেছেন, ‘এখন পর্যন্ত জোরালো থাকা পানশিরের প্রতিরোধ কিংবা নিজেদের অধিকারের পক্ষে হেরাতে আমাদের বোনদের প্রতিরোধে প্রমাণ হয়েছে যে মানুষ তাদের বৈধ দাবি অগ্রাহ্য করবে না। আর বৈধ প্রতিরোধ ছেড়ে যাবে না, আর কোনো হুমকির কাছে নত হবে না।’
