‘একতা-ইমান-শৃঙ্খলা’র মূলমন্ত্রে দীক্ষিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংহতি ও অখ-তার প্রতি হুমকি এসব বাঙালি ছেলেরা অনানুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সরকারের কাছে ‘মুক্তি’ নামেই পরিচিত ছিল। কিন্তু কাগজে-কলমে তা বললে ‘মুক্তি’দের স্বীকার করে নেওয়া হয়, তাই তাদের বলা হয় ‘দুষ্কৃতকারী’। তবে দুষ্কৃতকারীর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রাদেশিক সরকারকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতেই হয়েছে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী।
অনুগত দাস সব আমলেই থাকে; কেউ বুদ্ধিজীবী হিসেবে, কেউ রাজাকার হিসেবে। পাকিস্তান সরকারের একটি প্রণোদনামূলক সিদ্ধান্ত ২৫ নভেম্বর ১৯৭১ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এতে সরকারি প্রেসনোটের বরাতে বলা হয় যেসব অনুগত ব্যক্তি দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তারের মতো নির্ভরযোগ্য খবর দেবে বা নিজেরা দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের কাছে পেশ করবে সরকার তাদের যথোপযুক্ত পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান পুরস্কারের অর্থমূল্য জানিয়েছে;
ক. দুষ্কৃতকারী গ্রেপ্তার অথবা সফলভাবে দুষ্কৃতকারীদের মোকাবিলার জন্য সংবাদ প্রদান : ৫০০ টাকা।
খ. ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুষ্কৃতকারী গ্রেপ্তার : ৭৫০ টাকা।
গ. রাইফেল বোমা বা ডুপ্লিকেটিং মেশিনসহ কিংবা অপরাধ করা যায় এমন অন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার : ১০০ টাকা।
ঘ. দুষ্কৃতকারীদের দলনেতাকে গ্রেপ্তার : ২০০০ টাকা।
বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার এবং/কিংবা বড়নেতা গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান করা হবে বলে সরকার জানিয়েছে। সরকার দুষ্কৃতকারীর ব্যাখ্যা দিয়েছে :
১. তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর সদস্য, তথাকথিত মুক্তিবাহিনীতে যোগদানে সহায়তাকারী।
২. স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের খাদ্য, যানবাহন ও অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহকারী।
৩. স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের আশ্রয়দানকারী।
৪. বিদ্রোহীদের ইনফর্মার বা বার্তাবাহক।
৫. তথাকথিত মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত নাশকতামূলক লিফলেট-প্যাম্ফলেট ইত্যাদির লেখক ও প্রকাশক।
এই লেখাটিতে একইসঙ্গে একাত্তরের পাকিস্তানপন্থি কয়েকটি সংবাদ তুলে ধরা হচ্ছে।
রাজাকার বন্দনা :
২৪ নভেম্বর ১৯৭১ এপিপির খবর :
(২৭ নভেম্বর ১৯৭১ দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত)
ঢাকা থেকে করাচি পৌঁছেই বিমানবন্দরে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. এ এম মালিক রাজাকারদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, তারা দুষ্কৃতকারীদের নাশকতামূলক কাজ প্রতিহত করছে। পূর্ব পাকিস্তানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং রাজাকাররা চমৎকার কাজ করছে। ‘তারা দেশপ্রেমিকদের জানমাল রক্ষা করছে এবং নিজেদের জীবনের বিনিময়ে রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিদের নাশকতামূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রহরা দিচ্ছে।’
এপিপি ১৩ অক্টোবরের সংবাদ :
পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্বমন্ত্রী মওলানা এ কে এম ইউসুফ খুলনা জিলা স্কুল মিলনায়তনে রাজাকার সমাবেশে রাজাকারদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘রাজাকাররা শুধু অনুপ্রবেশকারীদের হামলাই সাফল্যের সঙ্গে প্রতিহত করেনি, তারা বেশ কিছুসংখ্যক দুষ্কৃতকারী ও ভারতীয় ছাপমারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার যেকোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পেছনে আমাদের সাহসী জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।’
২০ অক্টোবর ১৯৭১ দৈনিক পাকিস্তান
‘রাজাকারদের প্রতি জেনারেল নিয়াজির আহ্বান’ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। সামরিক আইন শাসিত পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক ওই অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি পাবনায় রাজাকার সমাবেশে তাদের নিঃস্বার্থ দেশসেবার আহ্বান জানান। সেই সমাবেশে শান্তি কমিটির সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
জেনারেল নিয়াজি পাবনায় পৌঁছালে সংবাদপত্রের ভাষায় ‘উৎফুল্ল জনতা’ তাকে সংবর্ধনা জানায়। তারপর তিনি স্থানীয় ট্রেনিং স্কুলে প্রশিক্ষণরত রাজাকারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। সমাবেশে তিনি উল্লেখ করেন রাজাকাররা দেশরক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালনের মহান সুযোগ পেয়েছে। এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য গভীর শৃঙ্খলাবোধ আদর্শের সঙ্গে নিঃস্বার্থ নিষ্ঠার প্রয়োজন। পাকিস্তান রক্ষা করা তাদের নিজেদের বাড়িঘর রক্ষা করার শামিল। তিনি রাজাকারদের বলেন, মানুষের মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু গৌরবের। যুদ্ধের মৃত্যুতে সৈনিকের সব পাপ মুছে যায় এবং সে আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হয়। জেনারেল নিয়াজি পাবনা থেকে রাজশাহী আসেন এবং সেখানকার দেশপ্রেমিক নাগরিকদের শত্রুর ঘৃণ্য উদ্দেশ্য নস্যাৎ করে জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। সেখানকার রাজাকাররা মাতৃভূমির প্রতিরক্ষায় তাদের শেষ রক্তবিন্দু বিসর্জনের শপথ গ্রহণ করে। জেনারেল নিয়াজি রাজশাহী সেনানিবাসে সীমান্ত থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক পরিদর্শন করেন। তিনি শুনে আশ^স্ত হন যে বর্ষা শেষ হয়ে আসাতে দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতাও ক্রমশ কমে এসেছে।
৪ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় জেনারেল নিয়াজি রংপুর জেলার নীলফামারীর ডোমারে শান্তি কমিটির সমাবেশে বলেন, ভারত কখনো পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের শুভাকাক্সক্ষী হতে পারে না। স্বাধীনতা-পূর্বকালে হিন্দু শাসনামলে মুসলমানদের দুর্দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ভারত আবার এই প্রদেশকে পদানত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি রাজাকারদের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তারা পাকিস্তানের অখ-তা ও সংহতি রক্ষার জন্য মূল্যবান সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। প্রতিটি রাজাকার ইসলাম ধর্ম ও পাকিস্তানের জন্য নিবেদিত একজন মুজাহিদ।
সেখানকার কমান্ডার জেনারেল নিয়াজিকে জানান, মূলত রাজাকাররা সদা জাগ্রত ও তৎপর থাকার কারণেই ভারতীয় চর সে এলাকায় কোনো সেতু বা কালভার্ট ধ্বংস করতে পারেনি।
টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ
১৬ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যায় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান নূরুল আমিনের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রতিনিধিদল গভর্নর হাউজে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসার প্রশ্নে যে অগ্রগতি হয়েছে প্রতিনিধিদল তা গভর্নরকে অবহিত করে। তারা জানান, ‘জনসাধারণ ভারতের কুমতলব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং পাকিস্তানের সংহতি ও অখ-তা রক্ষার জন্য তারা সেনাবাহিনীর সঙ্গেই আছে।’
প্রতিনিধিদলে ছিলেন আহ্বায়ক এস কে খায়ের উদ্দিন এবং সদস্য এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, গোলাম আজম, মাহমুদ আলী, আবদুল জব্বার খদ্দর, মোহন মিয়া, সৈয়দ মোহাম্মদ মাসুম, আবদুল মতিন, গোলাম সারওয়ার, এ এস এম সোলায়মান, এ কে রফিকুল হোসেন, নুরুজ্জামান, আতাউল হক খান, তোয়াহা বিন হাবিব, মেজর আসমার উদ্দিন ও হেকিম ইরতেয়াজ্জর রহমান খান আখুনজাদা।
শিক্ষা পুনর্বিন্যাস
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ২৯ মে ১৯৭১ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে মূলত জাতীয় চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পুনর্বিন্যাস কমিটি গঠন করেছেন।
ড. সাজ্জাদ হুসাইন, ভাইস চ্যান্সেলর, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়
ড. হাসান জামান, পরিচালক জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো
ড. মোহর আলী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়
এ এফ এম আবদুর রহমান, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়
ড. আবদুল বারী, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়
ড. মকবুল হোসেন, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়
ড. সাইফুদ্দিন জোয়ার্দার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যলয়
কমিটির কার্যপরিধি
১. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ
২. সিলেবাসে জাতীয় চেতনা উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে সংশোধনের সুপারিশ
৩. অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুপারিশ
৩১ আগস্ট ১৯৭১-এর মধ্যে কমিটিকে সরকারের কাছে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমিন ও ভুট্টো কোয়ালিশন সরকার গঠনে আমন্ত্রিত
রাওয়ালপিন্ডি, ডিসেম্বর ৭ : প্রেসিডেন্ট আজ নূরুল আমিন এবং জেড এ ভুট্টোকে কেন্দ্রে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। রিপোর্ট করেছে এপিপি।
নূরুল আমিন হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং ভুট্টো হবেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রেসিডেন্টের বিবৃতি
‘আমি জনাব নূরুল আমিন এবং জেড এ ভুট্টোকে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকার গঠন করার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। জনাব নূরুল আমিন হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং জনাব ভুট্টো উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যুদ্ধ এবং এর ফল সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারণে দেশের দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় আমি কেন্দ্রে একটি সরকার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিই, যা ২৭ ডিসেম্বরের পর কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্যদের নেওয়া হবে দেশের দুই অংশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে যাদের বাছাই করবেন কোয়ালিশন সরকারের নেতারা। খবরটি প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
