মেহেরপুরে করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের জন্য প্রণোদনার অর্থ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিল্পীরা বলছেন, শিল্পীদের জন্য বরাদ্দের টাকা পেয়েছেন জেলা শিল্পকলার কর্মচারী এবং সেখানকার কর্মকর্তাদের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনরা। তাদের অভিযোগ, শিল্পী প্রণোদনার মাথাপিছু ৫-১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পাওয়া ১১০ জনের তালিকায় শিল্পীর বদলে শিল্পকলার কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও সাধারণ ব্যক্তির নাম রয়েছে। অন্যদিকে বাদ পড়েছেন করোনায় কর্মহীন প্রকৃত শিল্পী কলাকুশলীদের অধিকাংশই। তবে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের দাবি সবই নিয়ম মেনে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা শিল্পকলার মাধ্যমে মেহেরপুরে দুই দফায় শিল্পী প্রণোদনার টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় ৫ হাজার করে ৫০ জনকে এবং দ্বিতীয় দফায় ১০ হাজার করে ৬০ জনকে শিল্পী প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে দুজন সুমন পারভেজ ও শরিফুল ইসলাম। তারা শিল্পকলার কর্মচারী অথচ নাট্যশিল্পী হিসেবে তাদের প্রণোদনার টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামের আলী আকবর ও বুড়িপোতা ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের মঈনুল ইসলাম। তারা শিল্পকলার কর্মচারী কামরান আলীর বন্ধু ও আত্মীয় হওয়ার সুবাদে প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরের তাঁতীপাড়ার আব্দুল আজিজ শিল্পকলার একজন দর্শক, কামদেবপুর গ্রামের রুনা খাতুন ও যাদবপুরের শ্যামল আলী শিল্পী মহিতের আত্মীয়। শহরের পিয়াদাপাড়ার তরিকুল ইসলাম চাতাল ব্যবসায়ী। মুখার্জীপাড়ার মহির উদ্দিন শিল্পকলার নিয়মিত দর্শক। বড়বাজার এলাকার কানন বালা ও জয়া দত্ত। এরা কেউই সংগীতের সঙ্গে জড়িত নন। শহরের পশুহাট পাড়ার তারিফ হোসেন পেশায় ব্যবসায়ী। কোর্টপাড়ার আজিবর রহমান পেশায় ঠিকাদার। কামদেবপুর গ্রামের আ. সামাদ শেখ পেশায় টিভি মেরামতের কারিগর। অথচ এরা সবাই করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ ও কর্মহীন সাংস্কৃতিক শিল্পী হিসেবে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন।
সাংস্কৃতিক সংগঠকদের অভিযোগ, জেলা শিল্পকলার সাধারণ সম্পাদক ও পরিষদের লোকজনের যোগসাজশে শিল্পী নন এমন এসব ব্যক্তিকে প্রণোদনার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিল্পকলার এই প্রণোদনার তালিকায় থাকা নামগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই তালিকা প্রস্তুতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পছন্দের লোকজন। যারা কেউ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। তাদের প্রণোদনার টাকা দিয়ে প্রকৃত শিল্পীদের সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্পী প্রণোদনা পাওয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির কর্মচারী মইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মেহেরপুর শিল্পকলায় সংগীত করি।’
কোন গ্রুপের শিল্পী প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি অত গ্রুপফ্রুপ বুঝি না। আমি মূর্খসুর্খ মানুষ, শুধু সংগীত গাই। শিল্পকলার কামরান টাকা দিয়েছে, আমি পেয়েছি। কিসের টাকা তাও জানি না।’
আরেক প্রণোদনাপ্রাপ্ত কামদেবপুর গ্রামের রুনা খাতুনের মোবাইল ফোনে কল করলে একজন পুরুষ রিসিভ করে বলেন, ‘আপনি যে নাম্বারে ফোন দিয়েছেন সেটা ভুল নাম্বার।’ তাহলে শিল্পকলার প্রণোদনার তালিকায় আপনার নাম্বার কেনÑ এমন প্রশ্ন করলে ওই ব্যক্তি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
আরেক সুবিধাভোগী যাদবপুর গ্রামের শ্যামল আলী বলেন, ‘আমি মেহেরপুর শিল্পকলায় সংগীত পরিবেশন করি। শহরের যাদুবপুর রোডস্থ ভৈরব সংস্থার দলে আছি। তবে টাকাটা কিসের তা সঠিক করে বলতে পারব না।’
শহরের বড়বাজার এলাকার ‘যাত্রাশিল্পী’ কানন বালা যে মোবাইল ফোন নাম্বার ব্যবহার করে শিল্পকলা থেকে আর্থিক অনুদান পেয়েছেন সেই নাম্বারে কল করা হলে তার বোনের ছেলে শ্যামল ভট্টাচার্য্য কলটি রিসিভ করেন। এরপর শ্যামল ভট্টাচার্য্যরে কাছ থেকে কানন বালার ছেলের নাম্বার নিয়ে কল করা হলে সেটি আবার জয়া দত্তের নাম্বারের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, সম্পর্কে কানন বালার আপন জা জয়া দত্ত। যিনি শিল্পকলা থেকে আর্থিক অনুদান পেয়েছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিলে কানন বালার এক প্রতিবেশী বলেন, ‘আমার ৪০ বছর বয়সে কোনোদিন দেখিনি কানন বালাকে যাত্রা করতে। তবে কানন বালার ছেলে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে উঠবস করেন। সেই তার মায়ের নাম লিস্টে ঢুকিয়ে দিয়েছে।’ আর কানন বালার জা জয়া দত্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জয়া দত্ত প্রাচীন শিল্পী। অনেক আগেই সে গানবাজনা ছেড়ে দিয়েছে। জয়া দত্তের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। সেজন্য প্রণোদনার তালিকায় কানন বালার ছেলে বিদ্যুৎতের মোবাইল নাম্বার দেওয়া আছে।’
শিল্পীদের প্রণোদনার টাকা অশিল্পীদের পকেটে ঢোকার অভিযোগ করে মৃত্তিকা গ্রুপ থিয়েটারের সভাপতি মানিক হোসেন বলেন, ‘আমার সংগঠনে ২৬ জন শিল্পী। দুই দফায় আমার সংগঠনের দুজন প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন। অথচ শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত নয় এমন অনেক শিল্পী প্রণোদনার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।’
জেলার অরণী থিয়েটারের সভাপতি সাংস্কৃতিক সংগঠক নিশান সাবের বলেন, ‘শিল্প সাংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত নন এমন ব্যক্তিদের প্রণোদনার টাকা দিয়ে জেলা শিল্পকলা শিল্পী সমাজকে হেয় করেছে। যা অনুচিত হয়েছে। তাঁতীপাড়া আব্দুল আজিজ একজন দর্শক। তাকে কখনো শিল্পী হিসেবে দেখিনি। অথচ সে শিল্পী প্রণোদনার টাকা পেয়েছে। আমরা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের দীর্ঘ সময়ে এদের কাউকে এ অঙ্গনে দেখিনি। এমনকি চিনিও না।’
শিল্পীদের প্রণোদনার টাকা বণ্টনের অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রণোদনার টাকা একেকজনের একেক রকম আছে। করোনাকালে দেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার করে। প্রথমবার নাম চাওয়ার পর শিল্পীদের নাম পাঠানো হলে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে তাদের আবার ৫ হাজার করে মোট ১০ হাজার দেওয়া হয়।’
সুমন পারভেজ ও শরিফুল ইসলাম শিল্পকলার কর্মচারী হয়ে কীভাবে প্রণোদনার টাকা পেয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লাইট অপারেটর, সাউন্ড অপারেটর এরা সবাই শিল্পী। প্রণোদনার তালিকায় নাট্যশিল্পী লেখা আছে মানে আমরা ওদের নাটকও করাই। নাটকে যারা লাইটিং করছে, সাউন্ড করছে, ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করেছে, চেয়ার টানছে, মঞ্চে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে তাকেও নাট্যশিল্পী বলা যাবে। নাট্যশিল্পী বলতে বহু ধরনের ক্যাটাগরি আছে।’ প্রকৃত শিল্পীদের বাদ রেখে এভাবে শিল্পকলা কর্মীদের দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সাইদুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃত শিল্পী যারা এখনো প্রণোদনার টাকা পায়নি, তারা আগামীতে পাবেন।’
শিল্পীদের প্রণোদনার টাকা বরাদ্দে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মনসুর আলম খান বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব শিল্পকলার। প্রশাসন শুধুমাত্র তালিকাটা অনুমোদন করে বরাদ্দ প্রদান করে। সেইক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটা অবশ্যই দুঃখজনক। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে প্রশাসন তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে।’
