বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৪৯ পিএম

করোনাভাইরাসের আগ্রাসী আক্রমণে নিখিলবিশ্বের মতো বাংলাদেশও চরমভাবে আক্রান্ত। সংক্রমণের তীব্রতা কমাতে নানান সময় নানান রকম লকডাউন-শাটডাউন কিংবা কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তবে, বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শিক্ষা খাত। ২০২০ সালের মার্চের ১৮ তারিখ অন্য সবকিছুর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও বিভিন্ন সময় জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করতে গিয়ে অনেক খাত সাময়িক সময়ের জন্য খুলে দেওয়া হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুরো সময়ই পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানান নির্দেশনা দিয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার সংবাদ এবং ছবি আমরা গণমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে যেন ঈদের আনন্দ। শিক্ষকদেরও চোখে-মুখে কী অপরিসীম পরিতৃপ্তি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। শিক্ষার্থীদের প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা উপস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানান আনুষ্ঠানিকতায় শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিয়েছে। একজন শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে আনন্দের কী হতে পারে! যেদিন থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকে আমরাও দিন গুনছি কবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে! কবে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণে মুখর হয়ে উঠবে, সে অপেক্ষায় দিন গুনছি! তাই, ২৭ সেপ্টেম্বরের পরে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।

বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছিল অক্টোবরের ১৫ তারিখের পরে। কিন্তু পরে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসায় এবং মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় নানান দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের পর থেকে যেকোনো সময় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সে সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এখন স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখের পর সুবিধাজনক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে পারে।

এখানে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখা জরুরি যে, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর টিকার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টিকা নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা আবশ্যক হলেও, শিক্ষার্থীরা জাতীয় পরিচয়পত্র না-থাকলেও কেবল জন্মসনদ দিয়েই টিকার নিবন্ধন করতে পারবে। এমনকি জন্মসনদও যদি না-থাকে শিক্ষার্থী হিসেবে যে স্টুডেন্ট-আইডি আছে, সেটা দিয়েও নিবন্ধন করা যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নিবন্ধিত শিক্ষার্থীরা টিকা প্রদান কেন্দ্রের পাশাপাশি নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে টিকা গ্রহণ করতে পারবে। এই যে সব শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত, এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রতিদিনকার মিলনমেলার স্থান। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যাতায়াত করে। ফলে, করোনা সংক্রমণের সমূহ আশঙ্কা সেখানে থেকে যায়। তাই, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য সব শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনা একান্ত আবশ্যক। সরকারের সব ধরনের সহযোগিতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং প্রস্তুতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিতে হবে, যাতে কোনোভাবেই শিক্ষার্থীরা সংক্রমণের শিকার না-হয়। স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যৌথ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার মুখরিত হবে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতিতে, এটা ভাবতেই পুলক বোধ করছি।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়েই তৈরি হয় আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল প্রজন্ম। কেননা, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। এসব শিক্ষার্থীর মধ্য থেকেই তৈরি হবে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মন্ত্রী, আমলা, আইনজীবী, পুলিশ-র‌্যাব, ব্যবসায়ী প্রভৃতি পেশাজীবী শ্রেণি। এসব শিক্ষার্থীই এ দেশকে নিয়ে যাবে নতুন স্বপ্নের কাছে।

কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে প্রায় দেড়টা বছর ছিটকে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে হয়তো শিক্ষাকার্যক্রমের কিছুটা পুষিয়ে দেওয়া গেছে কিন্তু ক্যাম্পাস জীবন বলে যে জীবনটা আছে, সেখান থেকে প্রায় দেড়টা বছর হারিয়ে গেছে। করোনার সর্বগ্রাসী থাবায় আমাদের সবার জীবনই গত বছর দেড়েকের অনেক স্বাভাবিকতাই কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালি সময়ের দেড়টা বছর। এ ক্ষতি সত্যিকার অর্থেই অপূরণীয়।

আমি সব সময়ই বলি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরিই করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য। ক্যাম্পাসে বানানো সব ধরনের অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনেই তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষকদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্যই। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য অফিসার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করার দাপ্তরিক কাজ করার জন্য। যেকোনো বিবেচনাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শেষ বিচারে শিক্ষার্থীদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। অথচ ১৬-১৭ মাস ধরে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই!

আমি নিজে যখন ক্যাম্পাসে যাই, চতুর্দিক নীরব, নিষ্প্রাণ এবং নির্জীব মনে হয়। ফ্যাকাল্টির ফ্লোরে ফ্লোরে শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে কোনো বারান্দাই এখন আর মুখর নয়। বিরাট বিরাট ফ্যাকাল্টি বিল্ডিংগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে যেন শিক্ষার্থীদের জন্য হাহাকার করছে। ক্যাম্পাসে গান-বাজনা নেই, থিয়েটার উৎসব নেই, বিভিন্ন বিভাগের র‌্যাগ-ডের বর্ণিল আয়োজন নেই; বাক্স হাতে সহপাঠীর চিকিৎসার জন্য অনুদান তোলার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ব্যাকুলতা নেই; সুন্দর পোশাকে সেজেগুজে বন্ধুর জন্মদিন পালনের আয়োজন নেই; ঝুপড়িতে তালে-বেতালে গান করার উচ্ছ্বাস নেই; চতুর্দিকে কেবলই নেই নেই!

এ রকম একটি পরিবেশে সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখের পরে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনিন্দ্যসুন্দর ক্যাম্পাসগুলো। বিভিন্ন অনুষদ ভবনগুলো শিক্ষার্থীর কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠবে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও উল্লাসে। যে দেয়ালগুলো এখন কেবলই ইট-সিমেন্টের নিষ্প্রাণ কাঠামো হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে, সে দেয়ালগুলো নতুন করে প্রাণ পাবে শিক্ষার্থীদের নানান রংবেরঙের পোস্টার ও তুলির আঁচড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো এত দিন ধরে শিক্ষার্থীদের শূন্যতা ঢাকতেই যেন প্রকৃতির আপন উচ্ছ্বাসে অসাধারণ সবুজাভ রূপ ধারণ করে তাদেরই প্রতীক্ষায় সেজেগুজে বসে আছে। যেন প্রাণের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে বরণ করে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন মজুদ করে রেখেছে। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুদ সুন্দর সময়ের জন্য অপেক্ষা করে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো। এখন কেবলই ২৭ সেপ্টেম্বর পেরোনোর অপেক্ষা।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত