গুরুত্ব পাচ্ছে নারী নিরাপত্তা সহজ হচ্ছে লাইসেন্সের শর্ত

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১৮ এএম

মাদকাসক্ত নারী ও পুরুষকে সুস্থ জীবনে ফেরাতে প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসার। এক্ষেত্রে দেশে বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি পরামর্শ, নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে সরকার। তবে দেশে বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বেসরকারি পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্র  প্রতিষ্ঠার অন্যতম বাধা লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়নের কঠোর শর্ত। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক এলাকায় নিরাময় কেন্দ্র  প্রতিষ্ঠা, ভবনের তৃতীয় বা চতুর্থ তলায় কেন্দ্র হলে লিফট স্থাপন এবং প্রতি ১০ শয্যার জন্য একজন চিকিৎসক, মনোচিকিৎসক, কাউন্সেলর ও দুজন নার্স থাকার বাধ্যবাধকতা। এছাড়া নারীদের নিরাপত্তা উপেক্ষিত থাকায় খুব কমসংখ্যক নারী নিরাময় কেন্দ্রমুখী হন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, বেসরকারি পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্র  প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসছেন অনেকে। তারা সেবার পাশাপাশি ব্যবসা করার মানসিকতাও পোষণ করেন। তবে লাইসেন্স পাওয়ার শর্তে কঠোরতার কারণে তাদের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় নিরাময় কেন্দ্র  প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ হারান। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টিতে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো মাদক নিরাময় কেন্দ্র । এছাড়া বেসরকারি অনেক নিরাময় কেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতিও রয়েছে। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে লাইসেন্স পাওয়ার শর্ত কিছুটা শিথিল করার লক্ষ্যে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের কর মওকুপসহ বেশকিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান বিধিমালাটি ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে প্রণীত। নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করা ও নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর সংশোধিত ২০২০-এর ধারা ৬১(৩)-এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে আইনের ধারা ৬৮তে দেওয়া ক্ষমতাবলে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। নতুন বিধিমালাটি গত সপ্তাহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে গিয়েছে। সেখানে ভেটিং শেষ হলে আগামী মাসের মধ্যে এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন বিধিমালায় যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ও অনাবাসিক উভয় এলাকাতেই মাদকাসক্তি পরামর্শ, নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে, প্রতি ১০ শয্যার পরিবর্তে ৩০ শয্যার জন্য একজন চিকিৎসক, মনোচিকিৎসক, কাউন্সেলর ও দুজন নার্স থাকবে, একই কেন্দ্রে নারী ও পুরুষ মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় থাকতে হবে স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকতে হবে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা, যার ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত থাকবে তিন মাস পর্যন্ত।

নতুন বিধিমালার ৪ নম্বরে মাদকাসক্তি পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার লাইসেন্সের সাধারণ শর্তাবলির (১) এর ‘জ’তে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নির্দেশনা রয়েছে। যা আগের বিধিমালায় উপেক্ষিত ছিল। এর মধ্যে রয়েছেকোনো কেন্দ্র একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে চাইলে লাইসেন্স গ্রহণের আগে অবশ্যই তা অধিদপ্তরকে অবহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক আবাসন ব্যবস্থা, খাওয়ার ব্যবস্থা ও ক্লাসরুম থাকতে হবে। অর্থাৎ নারী ও পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং একই তলায় (ফ্লোরে) নারী ও পুরুষ মাদকাসক্ত রোগী রাখা যাবে না। নারীদের জন্য সার্বক্ষণিক নারী কর্মচারী, নারী চিকিৎসক ও নারী কাউন্সেলর থাকতে হবে। তবে নারী চিকিৎসক ও কাউন্সেলর না পাওয়া গেলে মহাপরিচালকের অনুমোদন সাপেক্ষে পুরুষ চিকিৎসক ও কাউন্সেলর নিয়োগ দেওয়া যাবে। এছাড়া মাদকাসক্ত নারীদের নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির আগে গর্ভবতী কিনা (প্রেগন্যান্সি টেস্ট) তা পরীক্ষা করতে হবে। নারী মাদকাসক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের প্রবেশমুখে সিসি ক্যামেরা থাকতে হবে এবং ক্যামেরার ফুটেজ ন্যূনতম তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া বিদ্যমান বিধিমালায় সব শর্ত পূরণের পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম থাকলেও নতুন বিধিমালাটিতে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে লাইসেন্স দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান বিধিমালাতে নারীদের জন্য নিরপাত্তার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। কিন্তু নতুন যে বিধিমালা করা হচ্ছে সেখানে এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের বিধিমালার মধ্যে আছে, বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে নারীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা বেডের ব্যবস্থা করা। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেই এটি করতে হবে।’

ভর্তির আগে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার বিধানটির কারণে নারীরা নিরাময় কেন্দ্রে আসতে নিরুৎসাহিত হবে কিনাএমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাময় কেন্দ্রে যে মেয়েরা ভর্তি হয় তারাতো একটু সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর)। তারা মাদকাসক্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সেন্স থাকে না। আমরা তাদের ক্রিমিনাল (অপরাধী) হিসেবে ভাবব না। এটাতো এক ধরনের রোগ। আমরা ভাবছি এটাকে ক্রিমিনাল হিসেবে না দেখে রোগ হিসেবে ধরে ট্রিটমেন্টের (চিকিৎসার) আওতায় নিয়ে আসব। ট্রিটমেন্ট করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করব। মূলত রিস্ক ফ্রি থাকার জন্য এ ব্যবস্থা। অতীব সতর্কতার জন্য এ ব্যবস্থা থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ১৯ জেলায় কোনো নিরাময় কেন্দ্র নেই। আমরা সেখানে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করব। তাদের বলব এখানে যদি ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে এটি আপনার কর মওকুফের আওতায় আসবে। এতে তারা উৎসাহিত হবে।’

দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কত, তার সঠিক কোনো তথ্য নেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একসময় অধিদপ্তরের ধারণা ছিল, দেশে ৭০ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এ সংখ্যাই উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের এক জরিপ প্রতিবেদনে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৬৬ লাখ উল্লেখ করা হয়। তবে একই বছর প্রথমবারের মতো সমীক্ষা চালিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ বলে জানায়।

অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন অধিশাখা সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্র  বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে চারটি সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ১৯৯টি শয্যায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্যদিকে বেসরকারি ৩৬৬টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৭১১টি শয্যা রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মু. নুরুজ্জামান শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ (সংশোধিত ২০২০) এর আলোকে আমাদের বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি বিধিমালা করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সে কারণে একটি বিধিমালা করেছি। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে শুল্কের ব্যাপারে কিছু অবজারভেশন দিয়ে ফেরত দিয়েছিল। সেটা আমরা অন্তর্ভুক্ত করে গত সপ্তাহে ফের পাঠিয়েছি। যতটা শুনেছি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং হওয়ার পরে প্রজ্ঞাপন হিসেবে জারি হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি সর্বোচ্চ হলে আগামী মাসের মধ্যে অবশ্যই প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’

নতুন বিধিমালা হলে বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাড়বে এমন আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একটা হাসপাতাল করার সময় যতই বলুক মানবসেবার জন্য কিন্তু সবারই মানসিকতা থাকে কিছুটা হলেও ব্যবসা করা। কিন্তু মাদক নিরাময় হাসপাতাল করতে অনেকে এগিয়ে আসে না। একটা হাসপাতাল করতে গেলে বাসা ভাড়া অনেক বেশি, যা ব্যয়বহুল। সবাই বাসা ভাড়া দিতেও চান না। কারণ মাদকাসক্ত যাদের চিকিৎসা দেওয়া হয় তারা অন্যরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ কারণে বাসাভাড়া, ট্রেড লাইসেন্সে অনেক ফরমালিটিস থাকে। অনেক ক্ষেত্রে লোন পায় না। আমাদের আইনের মধ্যে এসব বিষয়ে অনেক সংশোধন করা হয়েছে। শুধু আবাসিক এলাকা না, যে কোনো এলাকায় নিরাময় কেন্দ্র করা যাবে। কারণ ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারায় যে নিরাময় কেন্দ্র  আছে সেগুলো কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স পাচ্ছে না। ফলে তারা ব্যাংক থেকে লোন পাচ্ছে না। অন্যসব হাসপাতাল শত শত কোটি টাকা লোন পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্র কোনো লোন পাচ্ছে না। ফলে তাদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। ট্রেড লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও আমরা ছাড় দিতে চাচ্ছি।’

কর মওকুফের বিষয়ে নুরুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘আমাদের আরও চিন্তাভাবনা আছে, যারা মাদক নিরাময় কেন্দ্র করবেন তাদের কর মওকুফ করার। এ বিষয়ে আমরা এনবিআরকে লিখব। আমাদের সিদ্ধান্ত আছে যারা বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্র করবে তাদের মোট বিনিয়োগের একটি অংশকে কর মওকুফের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত