সফল ব্যবসা, নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে আত্মোপলব্ধির এক সকালে বুঝলেন, এ জীবন তিনি চান না। এ জীবনে প্রাচুর্য আছে, প্রাণ নেই। গতি আছে, উপলব্ধি নেই। সব ছেড়েছুড়ে একদিন পৃথিবীর পথে পথে হাঁটতে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। আমেরিকান নারী অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েলের দুঃসাহসিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
‘হাজার বছর ধরে আমি হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’
অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল। আমেরিকান নারী। ৩০ বছর বয়সীদের চোখে যে জীবন স্বপ্নের সে জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ অধ্যবসায়ী অ্যাঞ্জেলা। তখন তিনি সফল ব্যবসায়ী। সমাজের চোখে সফল মানুষ হিসেবে পরিচিত। ৩০ বছরের কোটায় দাঁড়ানো এক সকালে তার মনে হলো জীবনের কিছুই তার দেখা হয়নি। এ জীবন তিনি চাননি। তার চোখের সামনে প্রাচুর্য আছে কিন্তু এ প্রাচুর্য তিনি চান না। নিজের ভেতরে সে কী এক অসহনীয় চাওয়া! কিন্তু কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিলেন না, ভেবে বের করতে পারছিলেন না আসলে ‘কী চান তিনি’। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি। জীবনে যা চেয়েছেন সবই পেয়েছেন। মানুষ যা যা চায় সব পাওয়ার পরেও কি পাওয়ার বাকি থাকে? তার ভেতরের ‘আমি’ কিছুতেই শান্ত হয় না। কী খুঁজছেন, কী তাকে আত্মিক শান্তি দিতে পারে পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করে দিলেন। কফির ধোঁয়া সঙ্গী করে এক ঘুমভাঙা সকালে খুঁজে পেলেন তিনি আসলে প্রাচুর্য চান না প্রাণপ্রাচুর্য চান। তার চারপাশে প্রাণ আছে কিন্তু তাকে প্রাণের আরও গভীরে যেতে হবে। পৃথিবীর পথে ঘুরে ঘুরে জানতে হবে পৃথিবীর বাকি মানুষগুলো কেমন আছে, তারা কীকরম করে ভাবে, তারা কেমন করে জীবন কাটায়, মানুষের প্রাণের সঙ্গে একাত্ম হতে হয় কীভাবে? ২০১৩ সালের তিনি বিশ্বজুড়ে হেঁটে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের সামনে প্রাচুর্যের সামনে বড় হয়ে দাঁড়ায় প্রাণপ্রাচুর্য। আত্মার টানে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। পৃথিবীর প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে আরও গভীর সংযোগের জন্য অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল একা একাই হাঁটতে শুরু করেন। অ্যাঞ্জেলা জীবনানন্দকে চিনতেন না। পৃথিবীর প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে এত গভীর সংযোগের কী দরকার সে প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে যাননি। তিনি শুধু জানেন তাকে হেঁটে বেড়াতে হবে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে। নিজের আত্মার গভীর থেকে উঠে আসা চাওয়ার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। হেঁটে হেঁটে পৃথিবীর বুকে থাকা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ম হতে হবে। ৬ বছরে ২০ হাজার মাইল হেঁটে পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পর বাড়ি ফিরে আসেন তিনি।
‘সিংহল সমুদ্র থেকে নিশিথের অন্ধকারে’
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগানের বাসিন্দা অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল একদিন আর্ট ক্লাসে বসে ছিলেন। শুনতে পেলেন তারই ক্লাসের একজন মানুষ সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি মাত্র ৯ মাসে পৃথিবী ঘুরে আসা টানটান উত্তেজনাকর গল্প শোনাচ্ছে সবাইকে। অনাগ্রহ সত্ত্বেও গল্প শোনা মানুষের দলে ভিড়ে গেলেন তিনি। সে সহপাঠী কী করে স্বল্প টাকায় পৃথিবী ঘুরে এলো সে গল্প তার কাছে খানিকটা অবাস্তবই মনে হয়েছিল। তখনো তিনি জানতেন না তীব্র তাচ্ছিল্যের ছলে তিনি যে গল্প গুরুত্ব দিতে চাননি সেই গল্পই তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। ত্রিশ ছুঁই ছুঁই এক নারীর মনে সে গল্প চিরস্থায়ী স্থান পেয়ে গেল। গল্পের আদ্যোপান্ত মনের ভেতরে কীভাবে যেন গেঁথে গেল নিজেও বুঝতে পারেননি।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো পৃথিবীর কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়া। হাত বাড়ালে মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া যায়, পা বাড়ালে পৃথিবীর সঙ্গে। হাঁটা সবসময়ই ধীরগতির কাজ। হাঁটা খানিকটা বিরক্তিকরও বটে। হাঁটতে গেলে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়। অনেক পরে তিনি বুঝতে পারলেন হাঁটা তারা কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনবে। গাড়ি তাকে গতি দেবে। হাঁটতে গেলে সে গতির প্রতি মোহ কমাতে হবে। তার সফল ব্যবসা তাকে চকচকে জীবন দেবে, কিন্তু কিছুতেই তিনি মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবেন না। মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে গেলে তাকে মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিলেন। অভিযাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন। উৎসাহ পাওয়ার জন্য বিশ্বের নানারকম ভ্রমণকারীদের লেখা পড়তে শুরু করেন। রবিন ডেভিডসনের লেখা পড়েই ধীর ভ্রমণশৈলীর প্রেমে পড়েন তিনি। রবিন ডেভিডসন একজন অবাক করা মানুষ। তিনি উটের পিঠে চড়ে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেছিলেন। তার লেখা পড়ে অ্যাঞ্জেলার মনে হতে থাকে অভিযাত্রী জীবনেও শান্তি আছে। নিজের যাপন করা জীবনের ওপরে ক্রমেই অভক্তি জমতে থাকে তার। দূরপাল্লার নারী পদযাত্রী ফিওনা ক্যাম্পবেল ও রোজি সোয়ালে-পোপ সম্পর্কে জেনে বুঝতে পারেন নারী হওয়া অভিযাত্রী জীবনের পথে অন্তরায় নয়। ধীরে ধীরে মানসিকতা পরিবর্তন হতে থাকে তার। রোজি ইউরোপ থেকে নেপালের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ৫৯ বছর বয়স এই নারী বিশ্বজুড়ে হেঁটে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তাই-ই নয়, ঘোড়ায় চড়ে চিলি পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। এসব নারীর গল্প তাকে আনন্দ দিয়েছে। নারী অভিযাত্রীদের চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের পাশাপাশি তাদের ছোট-বড় জয় তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। সবমিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিন এগিয়ে আসে। অ্যাঞ্জেলা তার সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে দেন। যাত্রা শুরুর আগে ক্যাম্পিংয়ের সমস্ত জিনিস কিনতে হবে তাকে। ৫০ কেজির ক্যাম্পিং সরঞ্জাম, শুকনো খাবার, পানির ফিল্টার, চার মৌসুম পরার মতো জামাকাপড় কিনে গাড়ি বোঝাই করেন তিনি। এরপর ২০১৪ সালের ২ মে আমেরিকার ওরেগানের ছোট শহর বেন্ড থেকে একদিন পৃথিবী দেখার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে দিলেন। যাত্রা শুরুর আগে তিনি জানতেন না পথে তার জন্য কী কী চমক অপেক্ষা করছে!
অ্যাঞ্জেলাকে ঘিরে সবার একটাই প্রশ্ন কেন এই যাত্রা? ওসব প্রশ্নের জবাবে হাসেন তিনি। এ কথা তো সত্যি তিনি নিজেও ঠিক পরিষ্কার জানতেন না কেন তিনি পৃথিবী জুড়ে হাঁটতে চাইছেন। নিজের স্বপ্নের সঙ্গে বাঁচতে চাইছেন বলেই তিনি হাঁটতে শুরু করেন। তিনি জানতেন পৃথিবী জুড়ে খুব কম লোকই এমন চেষ্টা করেন। উচ্চাকাক্সক্ষা থেকে তার অভিযাত্রী জীবনের যাত্রা শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল ভয় থেকে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এ নারীর পদযাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৮ সালের জুন মাসে তার পায়ে হেঁটে যাত্রার ৪ বছর পূর্ণ হয়। তখন তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে ১২টি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। কৌতূহলী হয়ে একজন জিজ্ঞেস করে বসল, ‘বিশ্বজুড়ে হাঁটতে কী ধরনের ব্যক্তিত্ব লাগে?’ চকচকে হাসির সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন ‘একগুঁয়ে হওয়া লাগে।’ পরমুহূর্তে যোগ করেন, ‘সম্ভবত উচ্চাকাক্সক্ষা, কিছুটা জেদ ও এক চিমটি আবেগের সংমিশ্রণও দরকার। এটি কোনো খেলা নয়। এসব দুঃসাহসিক যাত্রায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ থাকে।’
যাত্রা শুরু করার পর অ্যাঞ্জেলা খুব দ্রুতই নিজের একটি রুটিন খুঁজে পেয়েছিলেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে জেগে ওঠা, সকালের খাবারের জন্য কফি ও একবাটি ওটমিল খান। সবশেষে আবার নতুন পথে হাঁটার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। সারা দিন হাঁটা শেষে রাতের জন্য তাঁবু খাটিয়ে ঝটপট খাবার হিসেবে নুডলস খান। সিøপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ার মধ্য দিয়ে তার এক একটি দিন শেষ হয়। অবশ্য সব দিন সমান যায় না। প্রতিটি দিনই হাজির হয় নতুন চমক নিয়ে। প্রাথমিকভাবে যে পূর্বপ্রস্তুতি আর পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তার অনেক কিছুই ভেস্তে যায় পরিস্থিতির চাপে। অভিযাত্রিক হতে গেলে নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ওপরে খুব বেশি ভরসা করতে হয়। একা একা ভ্রমণে এই একটি দিকনির্দেশক ছাড়া তেমন কাউকে কাছে পাওয়া যায় না। দলগত ভ্রমণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে। যার কারণে কোন দিকে যাবেন, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার একমাত্র কম্পাস ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। ডানে-বামে কোথায় যাবেন, যেতে চান সবই নির্ভর করে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ওপরে।
অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে সূর্যের তাপে তার ত্বক পুড়ে যায়। হিটস্ট্রোক করে বসেন। তবু দমে যাননি। শরীর খারাপের দোহাই তার পদযাত্রা দমিয়ে দিতে পারেনি। ভিয়েতনাম ভ্রমণের সময়ে আক্রান্ত হলেন ডেঙ্গু জ্বরে। মঙ্গোলিয়ায় এক রাতে তার তাঁবুতে ঢুকে পড়ে এক যাযাবর। উপর্যুপরি ধর্ষণ শেষে তাকে ফেলে রেখে যায়। তুরস্কে তাঁবু খাটানোর সময় গুলির শব্দে চমকে ওঠেন। সারা দিন হাঁটা শেষে গভীর ঘুম পেয়ে বসে থাকে। এ ঘুম হয়ে ওঠে তার চরম দুর্বলতা। আস্তে আস্তে গভীর ঘুমের মধ্যেও এক চোখ ও এক কান খোলা রেখে ঘুমাতে শিখে যান তিনি। এক মুহূর্ত ভালো যাওয়া মানেই শেষ কথা নয়। অভিযাত্রী জীবনে পরের মুহূর্তেই কী বিপদ আসতে যাচ্ছে তা জানা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সব ধরনের কষ্ট একপাশে রেখে জীবন যাপন করতে শিখে গেছেন তিনি। এসব গল্পের মধ্যে হঠাৎ করেই বলে বসেন, ‘আমি নির্ভীক ছিলাম বলে হাঁটতে শুরু করিনি। আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার জীবনের মালিক আমি। ভালোবাসার সবকিছু হারানোর ভয় আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। সে ভয়ই সবচেয়ে বেশি সন্ত্রস্ত করেছে আমাকে।’
‘হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা’
মঙ্গোলিয়ার যৌন নিপীড়নের ঘটনা তার অভিযাত্রী জীবনের ওপরে সবচেয়ে বড় আঘাত। আর দশটা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর মতোই প্রাথমিকভাবে হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন। শরীরের ব্যথার চেয়ে মনের ব্যথা আর মানসিক ট্রমা ভোগাতে শুরু করেছিল তাকে। অভিযাত্রী জীবনের শুরুতেই যে প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেত নারী হয়ে তিনি পারবেন কি না, সেই প্রশ্ন আবার ফিরে আসে তার মনে। ট্রমা আর ভয় তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে। সেখান থেকে ফিরে আসার পর অ্যাঞ্জেলা যেন ডানাভাঙা পাখি হয়ে ওঠেন। শারীরিক ব্যথা না হয় কিছুদিন পর ভুলে যাওয়া যায়, মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠা তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। কী করবেন তিনি? পোড় খাওয়া অভিযাত্রীর মতো আবার শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসেন তিনি। একথা সত্য যে, মনের ভয় কাটাতে বেশ সময় নিয়েছে। কিন্তু অন্য নারীদের অধ্যবসায় ও শক্তির গল্প তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এ স্পর্শকাতর ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, এই ঘটনা আমাকে আমার এই স্বপ্ন ছেড়ে বাড়ি যেতে বাধ্য করবে না। আমার পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়। সফলতার গল্প একপাশে রেখে এক অন্তিম ভয়ের সঙ্গে বাস করতে শুরু করি আমি। তবে আমার ফিরে যাওয়ার রাস্তা ছিল না। আমার চলার পথে অনেক ঝুঁকি এসেছিল। কোনোকিছুই আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আমি বুঝতে শিখেছিলাম মানুষ আসলে কতটা শক্তিশালী হতে পারে। সহিংসতার মধ্যেও যখন আপনি হাঁটা অব্যাহত রাখতে পারবেন তখন আপনি বুঝবেন আপনার শরীর ও মন ভীষণ শক্তিশালী। ফলে পুনরায় আপনি হাঁটতে বাধ্য হবেন।’
‘এতদিন কোথায় ছিলেন’
পথে হাঁটতে হাঁটতে অন্য দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে ভালোবাসেন তিনি। ইতালির টাইরহেনিয়ান সাগরের তীরে ছোট ছোট গ্রাম ঘুরেছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের আগ্রহ ও আন্তরিকতা তাকে ছুঁয়ে গেছে। তাদের বাড়িয়ে দাওয়াত খেয়েছেন। ভিয়েতনামে পৌঁছে ক্লান্ত হয়ে পড়লে একজন বয়স্ক নারী তাকে অভ্যর্থনা জানান। রাতে তাঁবু না খাটিয়ে তার বাড়িতে বিশ্রামের আমন্ত্রণ জানান। মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়া সীমান্তে একটি বন্ধুত্ব গাঢ় হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের বন্ধুত্বের টানেই কয়েক বছর পর আবার সুইজারল্যান্ডে যান। আন্তঃসাংস্কৃতিক সাক্ষাৎ ৭ মিনিট বা ৭ দিন হোক না কেন অ্যাঞ্জেলা সবসময় দুটো বিষয় মাথায় রাখেন শেখার জন্য ভালো শ্রোতা হওয়া জরুরি এবং মানুষকে সাহায্য করার ইচ্ছে তাকে গভীরভাবে চিনতে সাহায্য করে। ইতালীয় গ্রামে বেড়ানোর সময় পুরনো পারিবারিক রান্না শিখেছিলেন। নিউজিল্যান্ডে কাঠ কেটে, ইতালির গৃহহীন মানুষদের হাতে খাবার তুলে দিয়েছিলেন। সার্ডিনিয়াতে এক ইতালীয় কৃষকের সংস্কার করতে সাহায্য করেন তিনি। এসব টুকরো টুকরো গল্প তাকে প্রাণপ্রাচুর্যের সন্ধান দেয়।
অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল মাঝেমধ্যেই অনানুষ্ঠানিক সমাবেশ, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখেন। মঙ্গোলিয়ায় আক্রমণের শিকার হয়েও হাঁটা বন্ধ না করে তিনি হয়ে ওঠেন নারী ক্ষমতায়নের পক্ষে সোচ্চার। তীর্থযাত্রার পথে অ্যাঞ্জেলা ওয়ার্ল্ড পালস ও হার ফিউচার কোয়ালিশনের মতো এনজিওর জন্য অনুদান সংগ্রহ করেন। মেয়েদের সহায়তায় ব্যয় করা হয়েছিল এ অনুদানের ৩০ হাজার ডলার।
২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর অ্যাঞ্জেলা ফিরে আসেন। যেখান থেকে তার এ যাত্রা শুরু ঠিক সেখানে আমেরিকার ওরেগানের ছোট শহর বেন্ডে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে তার যাত্রার পূর্ণ চক্র শেষ হয়। ফিরে আসার মধ্য দিয়ে অভিযাত্রী জীবনের অবসান হলো কি? স্মিত হেসে উত্তর দেন, ‘না, যেকোনো সময়ে আমি আবার ফিরে আসতে পারি।’ বর্তমানে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বই লেখার কথা ভাবছেন তিনি। স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে তাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মানুষের সঙ্গে আরও বেশি একাত্ম হয়ে তিনি ভাবতে বসেন, ভাগ্যিস সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন!
