বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৯৮ ভাগ চাহিদা মিটিয়ে ১০৬টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু দেশের ভেতরের বিপণনে বিরাট গাফিলতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক কাঁচামাল ব্যবহৃত হচ্ছে না বা নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক বড় কোম্পানির বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু নকল ওষুধ প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাজারজাত করার কাজটি নিয়ম মেনে অনুসরণ করা হচ্ছে না। এ কারণে দেশে এখন মানহীন ওষুধ, ভেজাল ওষুধ, ভালো-মোড়কে নিম্নমানের ওষুধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ প্রশাসনের হাতে ধরা পড়া স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুদিন থেকেই নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন চলছে। রমরমা বাণিজ্য চলছে।
মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি হচ্ছে চিকিৎসা। আর চিকিৎসার প্রাণ হচ্ছে ওষুধপত্র। কিন্তু ভেজাল, নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব দেশ। দোকানগুলো কেন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখে? তাদের উদ্দেশ্য কী? দোকান মালিকরা কি কেবল বেশি মুনাফার চিন্তা না করে মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা ভেজাল ওষুধ বিক্রি করবেন নাকি মানুষ বাঁচানোর দায়িত্বের কথাটি মাথায় রাখবেন? বিশেষত, ভেজাল ওষুধে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষ সচেতনতার অভাবের কারণেই এ দুর্ভোগের শিকার বেশি। এখনই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়া এ প্রবণতা মারাত্মক রূপ ধারণ করবে। তাই এ বিষয়ে দোকান মালিকদের বাধ্য করতে সরকারকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নষ্ট করার বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এ প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে তবে পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশে বছরে উৎপাদন হয় পঁচিশ হাজার রকমের ওষুধ, এর মধ্যে মাত্র চার হাজার ওষুধ পরীক্ষা করে দেখার সামর্থ্য আছে সরকারের। আর এর দুই থেকে তিন শতাংশ ওষুধ ভেজাল, নকল বা নিম্নমানের। বাকি একুশ হাজার ওষুধ কখনো পরীক্ষাই করা হয় না’ (বিবিসি)।
ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরের থাকা ওষুধের মান সম্পর্কে ধারণা করা সত্যিই কঠিন। ভেজাল ওষুধ নির্ধারণে যথেষ্ট জনবলও নেই। তবে ওষুধ সমিতির নেতারা বলে থাকেন, তাদের সদস্যরা এ ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িত নন। চোরাগাপ্তা পথে ভেজাল ও মানহীন ওষুধ তৈরি হয়।
যেসব ওষুধের চাহিদা বেশি সেসব ওষুধের নকল বেশি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের অ্যান্টিবায়োটিকের কথা বলা যায়। অন্যদিকে, ‘হারবাল’ নাম দিয়ে মানহীন ওষুধে ছেয়ে গেছে দেশ। গ্রামেও অশিক্ষিত, অর্ধ-শিক্ষিত লোকের কাছে এর চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। এগুলোর বেশিরভাগই ভেজাল। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইচ্ছে মতো লেবেল করে মূল্য নির্ধারণ/পরিবর্তন করা হয়। সচেতনতার অভাব ও বিনা প্রেসক্রিপশনে ওষুধ বিক্রি করায় এই সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু ভেজাল ওষুধে মালিক, কমিশনভোগী চিকিৎসক, ফার্মেসি আর বিক্রয় প্রতিনিধিরা লাভবান হচ্ছে। ফলে ভেজাল প্রবণতা থামছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে কেবল রোগী নয়, অনেক সময় চিকিৎসকদের পক্ষেও বোঝা সম্ভব নয়, কোনটি ভেজাল ওষুধ। অভিজ্ঞতার অভাবে রোগীরা নির্ভর করছেন ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশনের ওপর। অন্যদিকে অনেক ডাক্তারই বিবেচনাহীনভাবে নানা কোম্পানির চাপিয়ে দেওয়া ওষুধ লিখে দিচ্ছেন।
এক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি দাবি আমলে নেওয়ার মতো। তারা বলছে, গণমাধ্যমগুলোতে ওষুধের প্রচারের সুযোগ না থাকায় তারা মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ দিয়ে ওষুধের মার্কেটিং করান। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতিতে ওষুধ বিপণন প্রচারের সুযোগ আইন করে রহিত করা হয়। পাশাপাশি আইন লঙ্ঘন করে বিজ্ঞাপন দিলে জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। এ কারণে কোম্পানিগুলোর প্রচার ও প্রসারের জন্য ডাক্তারদের কমিশন বা বিনামূল্যে ওষুধ দিয়ে প্রচার কাজটি করতে হয়।
পরিসংখ্যান মোতাবেক বিশ্বের ১৫ শতাংশ ওষুধ নকল। এশিয়া ও আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে নকল ওষুধের পরিমাণ ৫০ শতাংশ। নকল ওষুধ উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো হলো পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, লাতিন আমেরিকা, পূর্ব মধ্য ইউরোপের অনেক দেশ, আফ্রিকা এবং ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন। যেসব দেশে বেশি নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদিত হয় যেসব দেশে ওষুধ শিল্পে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শিথিল এবং আইনগত বাধ্যবাধকতার অভাব রয়েছে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দুর্নীতির কারণে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ও পণ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, নিউজিল্যান্ড, পশ্চিম ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোয় নকল, ভেজাল নিম্নমানের ওষুধের পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম। কারণ এসব দেশে ওষুধ এবং ওষুধ শিল্পের ওপর সরকারের কঠোর আইন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত আছে। চীনে ওষুধ ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল এবং নকলের অপরাধে মৃত্যুদন্ড প্রদান করার বিধান আছে।
এখানে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে কার্যকারিতা না পেয়ে চিকিৎসক বা রোগী একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করতে থাকেন। এভাবে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে শরীরে থাকা রোগের জীবাণু ওষুধের কার্যকারিতাকে নিষ্ফল করে দিয়ে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে শরীরে বহাল তবিয়তে টিকে থাকতে পারে।
মানব স্বাস্থ্যের জন্য চরম প্রয়োজনীয় ওষুধের মান রক্ষা করা এবং ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধের বিষয়ে এখনই লাগাম টেনে ধরতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরাসহ সাধারণ ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে, প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে একযোগে। এক্ষেত্রে বিএমএ, ওষুধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংবাদমাধ্যম সরকারকে একযোগে সহযোগিতা করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। যার যার স্থান থেকে এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া জরুরি।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
