জাতীয় শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট হচ্ছে না

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৫ পিএম

বেশ ক’ বছর আগের একটি স্মৃতি মনে পড়ল। এক সামাজিক অনুষ্ঠানে গাজীপুর গিয়েছিলাম। নানা আলোচনার মধ্যে আমার মতো একজন নিরীহ শিক্ষককে পেয়ে কয়েকজন চেপে ধরলেন। তাদের ভাষায় শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে এই উত্তর এখন আমাকে দিতে হবে। ভিন্ন রকম মনস্তাপ করলেন এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক। লেখাপড়ায় অমনোযোগী তার ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। টেনে টুনে এসএসসি পাস করে গেলে একটি দোকান-টোকান দিয়ে দেবেন এমন চিন্তা ছিল তার। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল ছেলে তার ‘এ গ্রেড’ পেয়েছে। এতে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষক সবাই বিস্মিত হয়েছেন। রসিক ভদ্রলোক বললেন বাধ্য হয়ে ছেলেকে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সে সময় অনলাইনে ভর্তির নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছেলেটি এসে পড়ল ‘নারীস্থানে’। বিষয়টি প্রথম বুঝতে পারিনি। কলেজ সংশ্লিষ্ট এক ভদ্রলোক আমাকে পরিষ্কার করলেন। বললেন আমাদের কলেজটি কো-এডুকেশনের। কিন্তু অনলাইনের বিড়ম্বনায় এটি গার্লস কলেজ হতে যাচ্ছে। আসন সংখ্যার নব্বই ভাগ পূরণ করা হয়েছে মেয়েদের দিয়ে। চাচার ছেলেটি এখানেই ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

একটু দূরে বসা এক অভিভাবক দম্পতি এবার যুক্ত হলেন। তাদের ভাষায় মনে হলো এদেশের শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় নীতিনির্ধারণ আমার হাত দিয়েই হয়! এখন জবাব আমাকেই দিতে হবে! বললেন, স্যার কোথা থেকে ‘পিইসি’ পরীক্ষা আমদানি করে আপনারা আমাদের সর্বস্বান্ত করে দিলেন। খেলাধুলা আর ছুটোছুটির বয়সে ছেলেকে যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছি। এই বয়সে ওকে কোচিং ক্লাসে ভর্তি করতে হচ্ছে। শিক্ষকদের সাজেশনে গাইড বই কিনতে হচ্ছে। নিজের মতো করে ওর আর বিকাশ হবে না। পত্রিকায় দেখেছেন নিশ্চয় ওদেরও প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। নকল করার হাতেখড়ি পাচ্ছে।

আমি হাত জোড় করে বললাম, মার্জনা করবেন আমিও আপনারই মতো একজন বিপন্ন অভিভাবক। জ্ঞানী-গুণী বিশেষজ্ঞরা হয়তো অনেক ভেবেই নীতিনির্ধারণ করেন! একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ছিলেন সেখানে। বললেন, দেখুন এদেশে শিক্ষা নীতিনির্ধারণে আমার মনে হয় না প্রকৃত শিক্ষাবিদরা বড় ভূমিকা পালন করার সুযোগ পান। এখানে জ্ঞান বিতরণের জন্য ক্ষমতাশীল মানুষের অভাব হয় না। যারা নিজেদের সর্বজ্ঞানে গুণী ভাবেন।

আমার একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে ২০১১ সালের। শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিকুলাম তৈরি ও পুস্তক প্রণয়নের কমিটি গঠন করেছিল। এনসিটিবির বই প্রণয়নের জন্য এ কাজে পুরনো অভিজ্ঞদের বিবেচনায় আমরা কয়েকজন কমিটির অন্তর্ভুক্ত হলাম। এরপর দেখলাম স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বই রচনার অভিজ্ঞতা নেই এমন কেউ কেউ রাজনৈতিক ও সচিব কোটায় লেখক হিসেবে যুক্ত হলেন। তাদের পা-ুলিপি নিয়ে কেমন গলদঘর্ম হতে হয়েছিল আমরা জানি। সে-সময় সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে প্রথম কথা ওঠে। বিষয়টি অনুভব করে প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের কাছে সবিনয়ে বলেছিলাম প্রতিটি স্কুলের শিক্ষকদের সৃজনশীল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া ছাড়া এই চমৎকার চিন্তাটির বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না। তারা আশ্বস্ত করেছিলেন প্রতি জেলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। হয়তো হয়েছিলও। কিন্তু তা দিয়ে কি প্রতি স্কুলের শিক্ষকদের সমৃদ্ধ করা গেছে? শেষ পর্যন্ত ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। এতগুলো বছর পরেও ‘সৃজনশীলতার’ সংকট রয়েই গেল। উদ্দেশ্য ছিল এতে করে শিক্ষার্থীর চিন্তা করার ক্ষমতা তৈরি হবে এবং গাইড-নোট পড়ার প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল সাধারণ গাইড বইয়ের সঙ্গে এবার যুক্ত হলো সৃজনশীলের গাইড বই। অভিভাবকদের ছুটতে হলো কোচিং সেন্টারে। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার এসব পরীক্ষা এবার নতুন নীতিতে হয়তো বন্ধ হতে যাচ্ছে।

স্কুল আর কলেজগুলোতে শিক্ষকরা কি নীতি আর আদর্শের বিচারে ক্লাসরুমে দায়িত্ব পালন করছেন? এখানে আবার রকমফের আছে। মেধাবী ফলাফল করা গ্রাজুয়েটদের বেতন কাঠোমো বিচারে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতায় আসার আগ্রহ থাকার কথা নয়। একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেছিলেন এর চেয়ে রিকশা চালালে সংসার সম্ভবত একটু ভালো চলত। সরকার বেতন বাড়িয়েছে বটে তবে তা ভদ্রভাবে বাঁচার জন্য যথেষ্ট নয়। দু-একটি টিউশনি করে কায়ক্লেশে তবু চলছি। এখন নাকি প্রাইভেট পড়ানোর বিরুদ্ধে আইন হচ্ছে। বিষয়টি খারাপ না, তবে আমরা বাঁচব কীভাবে? আবার শহরের আরেকটি চিত্র আছে। ঢাকা শহরের একটি নামকরা মেয়েদের স্কুলের কথা বলছি। সেখানে আমার চেনাজানা বেশ কয়েকটি পরিবারের সন্তানরা পড়ছে বা পড়েছে। প্রত্যেকেরই অভিমত অভিন্ন। তাদের বিচারে স্কুলটা সাইনবোর্ড মাত্র। পড়াশুনো স্কুলে হচ্ছে না। আমরা প্রত্যেকে বাধ্য একাধিক বিষয়ে এই স্কুলেরই শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে। ফলাফলটা আসে এই পথ ধরেই। এসব অভিযোগের আংশিক সত্য হলেও অবস্থাটি মারাত্মক। 

একটি সময়ে জানা গিয়েছিল কোচিং ব্যবসা আর গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। আমার কাছে বিষয়টি নতুন কিছু মনে হয়নি। আইন কী ছিল-না ছিল জানি না। তবে নোট বইয়ের বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারণ করা হয়েছিল অনেক আগেই। তখন ‘নোট বই’ রাতারাতি ‘গাইড বই’ নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বিষয়টি যে কারও কাছে স্পষ্ট ছিল না তা নয়। কিন্তু গাইড বই তো সদম্ভে প্রকাশ্যে বইয়ের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। একে প্রতিহত করার ব্যবস্থা কোনো পক্ষ গ্রহণ করেছে বলে আমার জানা নেই। শুধু স্কুল নয়, অভিযোগ আছে কলেজের অনেক শিক্ষকও নাকি গাইড বই নির্ভর করে ক্লাসে যান। ক্লাসগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নগণ্য থাকে। নৈতিকতা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতা না থাকলে কীভাবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে!

আমরা বাজারনির্ভর না জ্ঞাননির্ভর প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, না জ্ঞান ও বাজার দুটোর সমন্বয়ে শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করতে চাই এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুলশিক্ষায় নতুন সংস্কার এনে যে প্রস্তাব রেখেছে তা জন্ম দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। আনন্দের খবর এই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি পথ তৈরি হয়েছে এবার। দশম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রুপ ভাগের বিধান রাখা হয়নি। এ পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন সিলেবাসে পড়তে হবে। ভারত থেকে শুরু করে উন্নত বিশে^র অনেক দেশের শিক্ষা কারিকুলাম অনেকটা এমনই। অভিন্ন জ্ঞানচর্চায় শিক্ষার একটি ভিত তৈরি হবে এখানে। এরপর গ্রুপ বিভাজনে গিয়ে শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের অঞ্চল বেছে নেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমাদের প্রস্তাবিত কারিকুলাম জীবন-ঘনিষ্ঠ হলেও অনেকটা জ্ঞানবিচ্ছিন্ন।

আমি প্রতিবেশী দেশ থেকে শুরু করে উন্নত বিশে^র স্কুলশিক্ষার কারিকুলাম জানার চেষ্টা করেছি। প্রায় সব দেশেই গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান আর স্ব স্ব দেশের জাতীয় ইতিহাস পাঠ আবশ্যক রেখেছে। বাকি অনেক বিষয় রাখা হয় নৈর্বাচনিক হিসেবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিহাস পাঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত পাঠ্য দশটি বইয়ের মধ্যে ইতিহাস নেই! সনাতনী ধারার সমাজ বিজ্ঞান বলে একটি বই থাকছে। সেখানে অনেক বিদ্যার পাশে একটুখানি ইতিহাস বিদ্যাও থাকবে। এক বিন্দু শিশির দেওয়ার কৃতিত্ব যেন! একটি কাগজে নীতিনির্ধারকদের ব্যাখ্যা জানলাম। তাতে মূল থিম নিয়ে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে ইতিহাস রাখার প্রয়োজন তারা দেখছেন না। সমাজ বিজ্ঞানে নানা বিষয়ের ভেতর সমন্বিত জ্ঞান হিসেবে ইতিহাস থাকলেই চলবে। আমি কেবল ঈশ^রের কাছে প্রার্থনা করছি এসব ব্যাখ্যা বহির্বিশ্বের সভ্য মানুষরা না জানুক। আমাদের মূর্খতার কথা প্রকাশ্যে না আসুক।

ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন অনেক শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক। তবে অতি সম্প্রতি দুটো প্রতিক্রিয়া এখানে যুক্ত করে এই লেখাটি শেষ করতে চাই। নর্থসাউথ বিশ^বিদ্যালয় থেকে বছর দেড়েক আগে স্নাতক শেষ করেছে এক মেধাবী ছাত্রী। স্কুল-কলেজে বাংলাদেশের ইতিহাস জানার তেমন সুযোগ পায়নি। তাই দেশ সম্পর্কে তেমন উচ্চ ধারণা ছিল না ওর। ওই বিশ^বিদ্যালয়ে আমি অতিথি শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিষয়ক একটি কোর্স পড়াই। এখান থেকেই ওরা নতুন করে বাংলাদেশকে চিনতে পারে। খোঁজ করে বন্ধুরা মিলে দেখতে যায় ক্লাস থেকে জানা ঐতিহ্যিক নিদর্শনসমূহ। তেমনি চাকরির ফাঁকে ক’দিন আগে এক ছুটির দিনে ক’জন বন্ধু মিলে ওরা সোনারগাঁও বেড়াতে গিয়েছিল। ঔপনিবেশিক যুগের পানাম নগর, সরদার বাড়ি ছাড়াও সুলতানি যুগের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন রয়েছে তা ওরা ক্লাস থেকে জেনেছে। এবার তা অনুসন্ধানে বেরিয়েছে। সোনারগাঁ এসে ছাত্রীটি ফোন করে করে আমার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিল কোথায় কোনটির অবস্থান। ফিরে এসে ফোনে অভিজ্ঞতার বর্ণনা করছিল আমার কাছে। এ সময়েই বিস্ময়ের সঙ্গে আমাকে প্রশ্ন করল, ‘স্যার কথাটি কি সত্যি, দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্য দশ বইয়ের তালিকায় নাকি ইতিহাস নেই? তাহলে আমরা এসময়ের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ জানব কেমন করে। হাজার বছরের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের কথাও তো জানা হবে না। এতে করে দেশের প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হবে না।’ ছাত্রীটির এ প্রশ্নের কী জবাব দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না।

দ্বিতীয় উদাহরণটি আমার গাড়ির ড্রাইভার ছেলেটির প্রতিক্রিয়া। ও খুব বেশি দূর লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। তবে জানার কৌতূহল প্রচন্ড। সংবাদপত্র পড়ে ও টিভি খবর দেখে তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো সাম্প্রতিক তথ্য ওর কাছ থেকে জেনে নিই। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা যাচ্ছিলাম। পথে এক টিভি চ্যানেলের স্নেহভাজন প্রযোজক ফোন করল। ওরা ইতিহাসকে গুরুত্বহীন করার বিষয়টি নিয়ে টকশো করতে চায়। টেলিফোনের কথা আংশিক শুনছিল আমার ড্রাইভার। ক্ষুব্ধকণ্ঠে ওর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল। বলল, স্যার ইতিহাস না পড়লে বঙ্গবন্ধুকে জানবে কেমন করে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাহলে কি আমাদের ছেলেমেয়েরা জানবে না? তবে বাহান্নর আন্দোলন, ঊনসত্তরের আন্দোলন নিয়ে এত কথা বলার দরকার কি!

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বললাম, তুমি সাধারণ মানুষ তাই সাধারণভাবে ভাবছ। যারা নীতিনির্ধারণ করেন তারা অসাধারণ মানুষ! কোন গভীর থেকে তারা নীতিনির্ধারণ করেছেন আমরা কি তা বুঝতে পারি!

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত