এফবিসিসিআইয়ের ব্রিফিং

বিডার কারখানা পরিদর্শন নিয়ে আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২৫ এএম

আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিডার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্র্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সম্মিলিত টিম কর্র্তৃক শিল্পকারখানা পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের কাজ শুরু করবে। যা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্কিত অনেকে ব্যবসায়ী নেতা অভিযোগ করছেন, বিডার এ পরিদর্শনে বেসরকারি খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটি আগে মূল্যায়ন করা দরকার। কারণ, পরিদর্শন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এই পরিদর্শন শুরু হলে পুরান ঢাকার কোনো কারখানা টিকবে না।

গতকাল এফবিসিসিআইয়ের আয়োজনে বিডার নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্র্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সম্মিলিত টিম কর্র্তৃক শিল্পকারখানা পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের পদ্ধতি এবং চেকলিস্ট নিয়ে ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ব্যবসায়ী নেতারা। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি এম এ মোমেন।

সংগঠনটির পরিচালক আবু মোতালেব বলেন, পুরান ঢাকার কারখানাগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার সুযোগ নেই। কারণ, ঘিঞ্জি এলাকা। আমরা চৌবাচ্চায় পানি আর বালতিতে বালু দিয়ে সেমি কমপ্লায়েন্স করার চেষ্টা করছি।’ কারখানা পরিদর্শনের চেকলিস্টের দিকে ইঙ্গিত করে পুরান ঢাকার এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এই পরিদর্শন হলে কেউ টিকবে না। করোনায় সরকারের দেওয়া প্রণোদনা আমরা পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা পাইনি। দোকানভাড়া ও শ্রমিকদের বেতন দিতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পরিদর্শনের পরিবর্তে পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল কারখানা পরিকল্পিত পল্লীতে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আবু মোতালেব। তিনি বলেন, ৩০ বছর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি মামলার কারণে পুরান ঢাকার কারখানাগুলো এ দপ্তরের ছাড়পত্র পায় না। নিমতলীর ঘটনার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। গত ১৪-১৫ বছরে সেটি হয়নি। আবার চকবাজারের ঘটনার পর প্লাস্টিক, কেমিক্যাল ও প্যাকেজিং কারখানার ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রেখেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শামীম আহমেদ জানান, বিডার এ পরিদর্শনে বেসরকারি খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটি আগে মূল্যায়ন করা দরকার। কারণ, পরিদর্শন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তিনি বলেন, পরিদর্শন কার্যক্রম ধাপে ধাপে করা দরকার। আগে বড় কারখানা করার পর ছোট কারখানা ধরতে হবে। সবার আগে পরীক্ষামূলক পরিদর্শন করার পর সেটি মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

অবশ্য বিডার নির্বাহী সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী ব্যবসায়ীদের বলেন, ‘এটিকে পরিদর্শন না বলে জরিপ বা নিরীক্ষা ভাবতে পারেন। বিভ্রান্তি দূর করতে আমরা সব ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেছি। পুরো কাজটি করার জন্য ১০৮টি টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলাভিত্তিক এ কমিটির প্রতিটিতে এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধি থাকবেন।’

বিডার নেতৃত্বে পরিদর্শন কার্যক্রমকে এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, কারখানায় দুর্ঘটনা হলেই মালিকদের দোষারোপ করা হয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যেসব সংস্থা লাইসেন্স দিয়ে থাকে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিমতলীর অগ্নিদুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আলাদা কেমিক্যাল পল্লী গঠিত হলে, চুড়িহাট্টায় আগুনের দুর্ঘটনা ঘটত না।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, কারখানার নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে অনেকগুলো সংস্থার কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। বাংলাদেশ ইনভেস্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) সেফটি সেল স্থাপনের মাধ্যমে ওয়ান স্টপ সার্ভিস পেলে উদ্যোক্তাদের হয়রানি কমার পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সহজ হবে।

এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি এম এ মোমেন বলেন, পরিদর্শনের চেকলিস্ট দেখে উদ্যোক্তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শিল্পমালিকদের সহায়তা করার জন্যই এই উদ্যোগে অংশীদার হয়েছে এফবিসিসিআই।

দেশের শিল্পায়ন অগ্রগতি অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবে হয়েছে উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. আমিন হেলালী বলেন, এখন সব শিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সময় এসেছে।

অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ মাহফুজুল হক ‘পরিদর্শন’ শব্দের পরিবর্তে ‘জরিপ’ অথবা ‘পর্যবেক্ষণ’ ব্যবহার করলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে ২৪ সদস্যের জাতীয় কমিটি, বিডার নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি ও তিনটি উপ-কমিটি সম্পর্কে জানানো হয়। বলা হয়, ৬৮ ধরনের শিল্প খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে, দুর্ঘটনা ও ঝুঁকি বিবেচনায় ৩২টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত পরিদর্শন কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে মোট ৪৬ হাজার ১০০টি কারখানাকে। তবে প্রথম তিন মাসে ৫ হাজার কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। পর্যবেক্ষণে যাওয়ার তিনদিন আগে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্র্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানানো হবে। এসব কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে কি না, থাকলে সেটি কার্যকর কি না, ফায়ার অ্যালার্ম ঠিক আছে কি না, নিরাপদে কারখানা থেকে বের হওয়ার পথ আছে কি না এসব বিষয় দেখা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত