মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে সেখানে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানো এবং নজিরবিহীন বলপ্রয়োগে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করার সময় থেকেই এ নিয়ে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। ২০১৭ সালের আগস্টে গণহত্যার মুখে পালিয়ে আসা প্রায় সাড়ে এগারো লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ দায়িত্ব পালনে অনীহার বিষয়টিও একই কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ যখনই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে তখনই নতুন নতুন সংকট সামনে আসছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা খানিকটা এগুলেও তাতে আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যায়নি। এর মধ্যেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাশাসন জারির পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য এগিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানালেন। এর পরপরই মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জনপ্রিয় নেতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা অধিকারের পক্ষে কথা বলা বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মুহিবুল্লাহকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে গুলি করে হত্যা করা হলো। সামগ্রিক বাস্তবতা আমলে নিলে তাই মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডকে রোহিঙ্গা শিবিরের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা সাধারণ কোনো হত্যাকান্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বুধবার রাতে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া মুহিবুল্লাহ ছিলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে অন্যান্য শরণার্থীর সঙ্গে নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসার পর থেকে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংকটের কথা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে সচেষ্ট হন। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমারে গণহত্যার বিচার দাবি করেছেন। হোয়াইট হাউজে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তার সহায়তা কামনা করে আলোচনায় এসেছিলেন রোহিঙ্গাদের এই জনপ্রিয় নেতা। এছাড়া ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের ফুটবল মাঠে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার গণহত্যাবিরোধী মহাসমাবেশেরও অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন মুহিবুল্লাহ। তার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্রমূলক কিছু রয়েছে বলে ধারণা করা তাই অস্বাভাবিক নয়। গত বুধবার রাতে ওই হত্যাকা-ের সময় মুহিবুল্লাহর সঙ্গে ছিলেন তার ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ। তিনি খুনের ঘটনায় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা ‘আরসা’-কে দায়ী করেছেন। বিভিন্ন শিবিরের রোহিঙ্গা ‘মাঝি’ বা নেতারাও বলছেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে সন্ত্রাসী কয়েকটি গোষ্ঠীর সঙ্গে মুহিবুল্লার বিরোধের জের ধরেও তিনি খুন হতে পারেন।
রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর শোক ও নিন্দা প্রকাশের পাশাপাশি হত্যাকা-ের বিচার দাবি করেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় অবিলম্বে তদন্ত শুরু করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন যে, মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মুহিবুল্লাহ নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন বলেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারকে অবশ্যই এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দ্রুত হত্যাকান্ডের তদন্ত শুরু করতে হবে। আরসা-সহ সন্দেহভাজন সব পক্ষকেই এই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টিও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। কেননা, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে জল ঘোলা করা গেলে সেখানেই অনেকেই মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি, এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। আমরা আশা করব বিগত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সুরাহার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে আসবে। খেয়াল করা দরকার বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু শিবিরে সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গার ভরণপোষণে প্রতিশ্রুত অর্থ সহায়তা ও দায়দায়িত্ব পালনেও দাতা গোষ্ঠীগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উৎসাহে ভাটা পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দায়িত্ব নিতে রাজি করানোর চেষ্টার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানে আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে পটপরিবর্তন হচ্ছে সে কারণে যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি চাপা পড়ে না যায় সে বিষয়েও সচেষ্ট থাকতে হবে।
