সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘কোর্ট পুলিশ-আসামি’ সখ্য ৮ মাসেও ওঠেনি চার্জশিট

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:২৫ এএম

সরকারের কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির ৫০০ বস্তা গম পাচার মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) তদন্ত কর্মকর্তা নেত্রকোনা মদন থানার কোর্ট পুলিশের কাছে জমা দিলেও গত আট মাসে তা আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মামলার চার্জশিটভুক্ত একমাত্র আসামি মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি বেলায়েত হোসেন বিল্লালের সঙ্গে মদন থানার কোর্ট পুলিশ এএসআই সামছুলের সখ্য।

এ ক্ষেত্রে বেলায়েতের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে চার্জশিট আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে এএসআই সামছুলের বিরুদ্ধে। এমনকি আদালত বেলায়েতের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও তা অন্তত এক সপ্তাহ আটকে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন সামছুল। যাতে এ সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিতে পারেন বেলায়েত। আসামি বেলায়েত ও এএসআই সামছুলের কিছু কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে দেশ রূপান্তর।

এদিকে মদন থানা পুলিশ বলছে, আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌঁছলে আসামির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেলায়েত ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতির পাশাপাশি গ্রামীণ হতদরিদ্রের জন্য সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি দরের চালের পরিবেশক (ডিলার)। উপজেলার খাদ্যগুদাম থেকে সরকারি চাল এনে মদন থানার কাইটাইল ইউনিয়নের ৩৫৯টি দুস্থ পরিবারকে এক মাস পরপর ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করে থাকেন। তবে বেলায়েতের গুদামে রাতের আঁধারে সরকারের ভালো চাল বস্তা বদল করে পচা দুর্গন্ধযুক্ত চাল বস্তায় ভরে বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। দরিদ্র মানুষরা এ চাল খেতে না পেরে ফের বেলায়েতের কাছেই ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছে। এ চাল ফের সরকারি বস্তায় ভরে বিতরণ করা হয়। এভাবে গত কয়েক বছরে কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বেলায়েত। এ বিষয়ে গত শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘দুস্থদের চাল খেয়ে কোটিপতি যুবলীগ নেতা বেলায়েত’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটিতে বেলায়েতের মুখেই চাল বদল ও বিক্রি করার কথোপকথনের অডিও রেকর্ড তুলে ধরা হয়।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে নেত্রকোনার মদন থানার মুতিয়াখালী বাজার থেকে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় সরকারি বরাদ্দের ৫০০ বস্তা গম (প্রতি বস্তায় ২৫ কেজি) পাচারের সময় গমসহ চার শ্রমিককে আটক করে মদন থানা পুলিশ। ওই ঘটনায় এসআই মোশাররফ হোসেন ফরাজী বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এর ২৫ (১) ধারায় মামলা করেন। মামলা এফআইআর নম্বর ২।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে নেত্রকোনা জেলার মদন থানাধীন মুতিয়াখালী বাজারের বণিক সমিতি ঘরের সামনে থেকে চারটি হ্যান্ডট্রলি ও একটি টাটা মিনি পিকআপভর্তি গমের বস্তাসহ ওয়াদুদ মিয়া, আনোয়ার হোসেন, রাজিকুল, আলী হোসেন ও গৌরাঙ্গ দাসকে আটক করা হয়। হ্যান্ডট্রলি ও একটি টাটা মিনি পিকআপে থাকা গমের বস্তা চেক করে ও গণনা করে দেখা যায় মোট ৫০০ বস্তা রয়েছে। যার প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি গম রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রতিটি বস্তার গায়ে খাদ্য অধিদপ্তরের জন্য ও উৎপাদন সাল লেখা আছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় সরকারি বরাদ্দকৃত গম কোনো ব্যক্তি পাচারের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো স্থান থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল দিয়ে পাচার করছিল।

মামলাটির তদন্ত শেষে চলতি বছর ১২ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন নেত্রকোনা জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই মো. সাজ্জাদ হোসেন। সেখানে একমাত্র আসামি করা হয় বেলায়েত হোসেন বিল্লালকে (৩৫)।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘মো. বেলায়েত হোসেন (পিতা মৃত গোলাম হোসেন) মদন থানাধীন জাহাঙ্গীরপুর বাজারের স্থানীয় ধান ও চাউল ব্যবসায়ী। ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের জনৈক মো. বাচ্চু মিয়ার নৌকা ভাড়া করে ৫০০ বস্তা সরকারি গম সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই অঞ্চল থেকে মদন থানাধীন মুতিয়াখালী বাজারে অবৈধভাবে আনে। যার কোনো চালান বা কাগজপত্র নেই। নৌকা থেকে গমের বস্তা আনলড করার জন্য বেলায়েত আগে থেকেই হ্যান্ডট্রলির মালিক আবদুল হক ও পিকআপ গাড়ির ড্রাইভার মো. ওয়াদুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখ বিকেলে পিকআপ গাড়ির ড্রাইভার ওয়াদুদ ও হ্যান্ডট্রলির মালিক আবদুল হকের সঙ্গে বেলায়েত গাড়ি ভাড়া ঠিক করে।’

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘এ গমের বস্তা বেলায়েত তার মদন বাজারের গোডাউনে নেওয়ার জন্য গাড়িতে লোড করছিল। এ সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে বেলায়েত বাজার থেকে সরে পড়ে।’

আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া এসআই মো. সাজ্জাদ হোসেন গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চার্জশিট থানার কোর্ট পুলিশের কাছে জমা দেওয়ার পর আর তদন্ত কর্মকর্তার কিছু করার থাকে না। কোর্ট পুলিশ সেটি আদালতে উপস্থাপন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলাটির তদন্তে নেমে বেলায়েতের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছুই বেলায়েত করেছে। যা চার্জশিটে উপস্থাপন করা হয়েছে। গমগুলো বেলায়েতের গুদামেই নেওয়া হচ্ছিল এমন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনার সময় গ্রেপ্তার চারজন শ্রমিকই নির্দোষ।’

মদন থানার ওসি মো. ফেরদৌস আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেলায়েতের বিষয়ে আদালত থেকে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় আসেনি। পরোয়ানা এলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।’

মদন থানার কোর্ট পুলিশ এএসআই সামছুলের সঙ্গে বেলায়েতের কথোপকথন :

এএসআই সামছুল : এ বেলায়েত ভাই কী খবর?

বেলায়েত : খোঁজখবর আছে কোনো?

এএসআই সামছুল : পরে জানামু কইছি না। সামনের সপ্তাহের মধ্যেই কাজ কইরা ফেলাইমু।

বেলায়েত : এহন জিনিসটা যে জানাজানি হইছে, অনেকে জানছে বিষয়ডা, সমস্যা হইবো?

এএসআই সামছুল : না, কিয়ের সমস্যা? কেডা জানছে?

বেলায়েত : আমার মনে হয় ওসিরে কেউ ফোন দিছে যে তার নামে (বেলায়েত) ওয়ারেন্ট, জামিন টামিন নেয় নাই।

এএসআই সামছুল : ওয়ারেন্ট জামিন টামিন নেই নাই, আমি কি ওয়ারেন্ট পাঠাইছি আপনারে।

বেলায়েত : না। কাগজের (চার্জশিট) কপিটপি পাইছে মনে হয়।

এএসআই সামছুল : কপি পাঠাইলে কি হইবো।

বেলায়েত : সমস্যা নেই, না।

এএসআই সামছুল : সমস্যা নেই। সমস্যা করলে আমিই করতে পারি আর আদালত করতে পারে, এছাড়া আর কেউ না।

আরেক কথোপকথন

বেলায়েত : কাগজডা (গ্রেপ্তার পরোয়ানা) কখন আয়ে পড়বে?

এএসআই সামছুল : সকালের দিকে পড়বে। ১০টা-১১টার দিকে।

বেলায়েত : মদন (থানা) কি সকালেই আইসা পড়ব কাগজডা?

এএসআই সামছুল : আরে না। মদন যাইবো না, গেলে আমার হাত দিয়েই যাইবো।

বেলায়েত : কালকে যদি না আহে তাহলে ভালো হয়।

এএসআই সামছুল : কালকে (সোমবার) আমি আটকায়ে রাখতেছি। অন্তত এক সপ্তাহ আটকে রাখতাছি।

বেলায়েত : আচ্ছা আচ্ছা।

এএসআই সামছুল : কেউ কোনো কথা কইতে পারবো না। এডা আপনের জন্য খালি।

বেলায়েত : আর ওইডা আপনেরে নগদ দিয়া ফেলামোনে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মদন থানার কোর্ট পুলিশের এএসআই সামছুলের কাছে গত শনিবার ফোন করলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার মনে নেই। রবিবার ফোন করেন।’ রবিবার ফোন করলে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে কোর্টে উপস্থাপন দেরি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সোমবার ফোন কইরেন।’

আসামি বেলায়েতের সঙ্গে সখ্য ও কোর্টে চার্জশিট উপস্থাপন না করা নিয়ে অনৈতিক সুবিধার কথোপকথন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো সত্য না। কারও সঙ্গে এ বিষয়ে আমার কোনো কথা হয়নি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত