ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জির থাকতে হলে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে তাকে জিততেই হতো। শেষ পর্যন্ত এ উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ পোক্ত করলেন দিদি।
গতকাল রবিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ভোটগণনা শুরু হয়। শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন মমতা। গণনা যত এগিয়েছে, তার ভোটের ব্যবধান তত বেড়েছে। মোট ২১ রাউন্ড গণনা শেষে মমতা ৫৮ হাজার ৮৩৫ ভোটের ব্যবধানে জয় পান বলে খবর দিয়েছে এনডিটিভি ও আনন্দবাজার পত্রিকা।
মমতা পেয়েছেন মোট ৮৫ হাজার ২৬৩ ভোট, প্রাপ্ত ভোটের হার ৭১ দশমিক ৯১। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল পেয়েছেন ২৬ হাজার ৪২৮ ভোট, প্রাপ্ত ভোটের হার ২২ দশমিক ২৯ শতাংশ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভবানীপুর আসনের উপনির্বাচনে ভোট হয়। ভোটার ২ লাখ ৮ হাজার ৪৫৬ জন। প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। এ নিয়ে তৃণমূল নেত্রী তিনবার ভবানীপুর আসনে বিজয়ী হয়ে হ্যাটট্রিক করলেন। ২০১১ ও ২০১৬ সালে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ভবানীপুর থেকেই উপনির্বাচনে জিতে আসেন মমতা। ভোট পড়েছিল ৪৫ শতাংশের কম। তিনি জিতেছিলেন ৫৪ হাজারের কিছু বেশি ভোটে, নিজের এ রেকর্ড এবার ভেঙে দিলেন মমতা।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচনে মমতা পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর কাছে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে পরাজিত হন তিনি।
নন্দীগ্রামে মমতা হেরে গেলেও সংবিধান মেনে তৃণমূল কংগ্রেস তাকে মুখ্যমন্ত্রী করে। সাংবিধানিক বিধি হলো ছয় মাসের মধ্যে মমতাকে রাজ্যের যেকোনো একটি বিধানসভা আসন থেকে জিতে আসতে হবে। মমতাকে ভবানীপুর আসন থেকে জেতানোর লক্ষ্যে সেখানকার নির্বাচিত তৃণমূল নেতা শোভন দেব চ্যাটার্জি পদত্যাগ করেন।
এদিকে রেকর্ড গড়ে বিজয়ী হয়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মমতা। তিনি বলেছেন, ‘ভবানীপুরের মানুষের কাছে চিরঋণী আমি।’ গতকাল ফল ঘোষণার পর কালীঘাটের বাসভবন থেকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। ভবানীপুরে মা-ভাই-বোন, সব সহকর্মী এবং সারা বাংলার মানুষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মন ভরে গেছে। ভবানীপুরের মানুষ দেখিয়ে দিল। নন্দীগ্রামের ফলাফলে অনেক চক্রান্ত হয়েছিল। সব চক্রান্ত শেষ করে দিয়েছেন ভবানীপুরের মানুষ।’
ভবানীপুর ছাড়াও গতকাল পশ্চিমবঙ্গের আরও দুটি আসন শমসেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুরে ভোট গণনা হয়েছে। সেখানেও এগিয়ে তৃণমূল। এ বিষয়ে মমতা বলেন, ‘আমি ভি দেখাব না, আমি তিন দেখাব। তিন সিটে লড়াই করেছি। তিন কেন্দ্রেই আমরা জিতছি।’
এদিন অন্য চার আসন শান্তিপুর, গোসাবা, দিনহাটা, খড়দহ উপনির্বাচনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন মমতা। খড়দহে শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়, শান্তিপুরে ব্রজকিশোর গোস্বামী, দিনহাটায় উদয়ন গুহ এবং গোসাবায় বাপ্পাদিত্য লস্কর এবং সুব্রত মণ্ডলের মধ্যে যেকোনো একজন প্রার্থী হবেন বলে জানান তিনি।
ভবানীপুরে মমতার বড় জয়ের কারণ কী, এখন তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, উপনির্বাচনে বিজেপির বড় ভুল ছিল প্রার্থী বাছাইয়ে। বাঙালি নারীর বিরুদ্ধে তারা দাঁড় করিয়েছিল অবাঙালি প্রার্থীকে, যা ভোটাররা সমর্থন করেননি। তার ওপর মমতার যে অবস্থান, তার বিপরীতে প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল একপ্রকার বেমানান। বিজেপি নেতা জয় ব্যানার্জি এ কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছিলেন, যা নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল রাজ্যে। এ ছাড়া কৌশল হিসেবে ভবানীপুরেও প্রচারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নামিয়ে দিয়েছিল বিজেপি। হরদীপ সিং পুরি থেকে স্মৃতি ইরানির মতো নেতারা সেখানে প্রচারে নামেন এবং মমতার বিরুদ্ধে নানা আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। এটি ভবানীপুরের ভোটাররা মেনে নিতে পারেননি।
