শেকড়হীন মানুষের বেদনা রচয়িতার নোবেল

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪৬ পিএম

হিংসা, লোভ, সংকীর্ণতা, ক্ষমতা দখল, গোষ্ঠী দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে যুদ্ধ ও সহিংসতা চলছে বহু দেশে। সহিংসতায় জর্জরিত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, পাকিস্তান, সুদান, নাইজেরিয়া, লিবিয়া, মালি, প্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, বুরুন্ডি, আফগানিস্তান প্রভৃতি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা নিজ দেশে টিকতে পারছে না। কোটি কোটি মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলেছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ দেশগুলোতে বাড়ছে শরণার্থীর সংখ্যা। বাড়ছে শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা, সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই। তেমন একজন ‘শরণার্থী’ কথাসাহিত্যিককে এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নোবেল কমিটি ২০২১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য আব্দুলরাজাক গুরনাহকে বেছে নিয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি শেকড়হীন শরণার্থী মানুষের জীবন ও জীবনসংগ্রামের প্রতিই যেন শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। সেই বিবেচনায় এবারের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার একটি নতুন ইতিহাস রচনা করল।

আব্দুলরাজাক গুরনাহর জন্ম পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়ার জাঞ্জিবার দ্বীপে, ১৯৪৮ সালে। বেড়ে ওঠাও সেখানেই। ১৯৬৩ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে তানজানিয়া স্বাধীনতা লাভের পর জাঞ্জিবারে বিপ্লব সংঘটিত হয়। শাসনক্ষমতা দখল করে নেন আবিদ কারুমি। আরব বংশোদ্ভূতদের ওপর তিনি নির্মম অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালান। আব্দুলরাজাক ও তার পরিবার আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়লে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে মাত্র আঠার বছর বয়সে তিনি শরণার্থী হিসেবে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। ১৯৮৪ সালের আগে তিনি আর স্বদেশে ফিরে যেতে পারেননি। এই ভূমিচ্যুত হওয়ার বেদনা তাকে উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করতে বাধ্য করে। পরবর্তীকালে তিনি ক্যান্টারবেরির ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট-এ ইংরেজি এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। হাতে তুলে নেন উওলে সোইঙ্কা, গুগি ওয়া থিয়োঙ্গো বা সালমান রুশদির মতো লেখকদের সাহিত্য বিষয়ে পাঠদানের কাজ। পাশাপাশি নিজেও কলম ধরেন ভূমিচ্যুত মানুষের বেদনা ও ফেলে আসা দেশের স্মৃতি ও সত্তাকে আশ্রয় করে। গুরনাহ দশটি উপন্যাস এবং বেশ কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশ করেছেন। শরণার্থীদের জীবন-যাপন, তাদের বোধ-অনুভূতিই তার পুরো সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু। তিনি ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর ২১ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন। তিনি তার

মাতৃভাষা সোয়াহিলি বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষাতে সাহিত্য রচনা করেন। তবে তিনি সচেতনভাবেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রচলিত রীতি ভেঙেছেন। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরার বদলে তিনি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তার ২০০৫ সালের উপন্যাস ‘ডেজারশন’ ((Desertion), যাকে তিনি ‘ইম্পেরিয়াল রোমান্স’ বা ‘রাজকীয় প্রেম-ভালোবাসা’ বলে অভিহিত করেছেন, তাতে এক প্রথাগত ইউরোপীয় নায়ক বিদেশে রোমান্স থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন, এরপর গল্পটি তার অনিবার্য, দুঃখজনক সমাপ্তিতে পৌঁছায়। গুরনাহর গল্প আফ্রিকার মাটিতে শুরু হয় এবং বাস্তবে কখনই শেষ হয় না।

গুরনাহর গল্প তার নির্বাসনের সময় থেকে শুরু হয়, কিন্তু তিনি যে স্থানটি ছেড়ে এসেছিলেন, সেই স্থানটির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েই যায়। তার সাহিত্যকর্মে স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অফ ডিপারচার’-এর বিষয় হচ্ছে, একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান এবং এ গল্পটি আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই উপন্যাসের প্রতিভাধর তরুণ নায়ক নাইরোবিতে একজন ধনী চাচার আশ্রয়ে যাওয়ার আশায় উপকূলের শ্বাসরুদ্ধকর সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চাচার কাছে গিয়ে তিনি অপমানিত হন এবং তার ভাঙা পরিবারে ফিরে আসেন। যেখানে ছিল তার মদ্যপ ও হিংস্র বাবা এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়া এক বোন। গুরনাহর সাহিত্যকর্মে অত্যন্ত সচেতনভাবে নির্মিত বিবরণগুলোতে একটি কষ্টার্জিত অন্তর্দৃষ্টির ছাপ দেখা যায়। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তার তৃতীয় উপন্যাস ‘ডটি’ (Dottie)। এতে তিনি অভিবাসী একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জীবনের চিত্র এঁকেছেন, যিনি ১৯৫০ এর দশকের বর্ণবাদী ইংল্যান্ডের ঘৃণাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং তার মায়ের নীরবতার কারণে তার নিজের পরিবারের ইতিহাস জানা হয়নি। একই সময়ে, তিনি ইংল্যান্ডে শেকড়হীন বোধ করেন, যে দেশে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। উপন্যাসের এই মূল চরিত্র বই ও গল্পের মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরির চেষ্টা করেন; বই পড়া তাকে নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেয়। নাম ও নাম পরিবর্তন এই উপন্যাসে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে যা গুরনাহর গভীর সহানুভূতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার প্রকাশ, যেখানে কোনো সস্তা ভাবপ্রবণতা নেই।

রুশদির মতো আব্দুলরাজাকও যে কোনো ‘পিছুটান’-কে প্রশ্ন করেন তার উপন্যাসে। সেই ‘টান’-এর পেছনে ক্রিয়াশীল উপনিবেশ ও তার এখনো সক্রিয় বন্ধনগুলোকে বুঝতে চান বারবার। প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অফ ডিপারচার’ (১৯৮৭)-এ তিনি তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লব-স্বপ্নের সেই ভঙ্গুরতাকে লিখে রেখেছিলেন, যার সাক্ষী ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার অগণিত দেশ। ১৯৮৮ সালের উপন্যাস ‘পিলগ্রিমস’-এ তিনি এমন এক যাত্রাকে আঁকেন, যেখানে আত্মপরিচয়, স্মৃতি এবং আত্মীয়তার বোধগুলো চলে আসে প্রশ্নের সামনে। ১৯৯৪-এর উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ তাকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। প্রুাণকথার সঙ্গে সংলাপ ঘটে সাম্প্রতিকের। শরণার্থীর অভিজ্ঞতা বর্ণনায় গুরনাহর ফোকাস ছিল আত্মপরিচয় এবং নিজের ইমেজের ওপর, যা তার ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) এবং ‘বাই দ্য সি’ (২০০১) উপন্যাস দুটির মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখকের নিজের মুখে বর্ণিত এই দুই উপন্যাসে নীরবতাকে বর্ণবাদ এবং জাতিবিদ্বেষ থেকে নিজের পরিচয় রক্ষায় শরণার্থীর কৌশলকে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যা থেকে হতাশা এবং বিপর্যয়মূলক আত্ম-প্রতারণা সৃষ্টি হয়। সত্যের প্রতি গুরনাহ যেমন অবিচল ছিলেন, পাশাপাশি ছিলেন সরলীকরণের বিরুদ্ধে। তিনি তার গল্পের ব্যক্তিদের ভাগ্য অনুসরণ করেন অত্যন্ত সহানুভূতি এবং অসীম প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তার উপন্যাসগুলো ইংরেজি সাহিত্যের গতানুগতিক ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বিবরণ থেকে আলাদা। এই বিবরণ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অনেকের কাছে অপরিচিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় পূর্ব আফ্রিকার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গুরনাহর সাহিত্য দেখিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বে শরণার্থীদের সবকিছু কেমন বদলে যায় স্মৃতি, নাম, পরিচয়। এর কারণ সম্ভবত তার প্রকল্প কোনো নির্দিষ্ট অর্থে সমাপ্তিতে পৌঁছাতে পারে না। বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগতাড়িত এক অবিরাম অন্বেষণ তার সব বইয়ে উপস্থিত রয়েছে এবং এখনকার ‘আফটারলাইভস’ (২০২০)-এও তা সমানভাবে রয়েছে, যেমনটি ছিল তিনি তার ২১ বছর বয়সী শরণার্থী হিসেবে লিখতে শুরু করার সময় থেকে। তার উপন্যাস ও ছোটগল্পে আব্দুলরাজাক সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার ‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’-গোছের স্মৃতিকাতরতার পুনর্নির্মাণকে। বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দাস ব্যবসা, বিভিন্ন মহাসাগরের দ্বীপভূমিগুলোর আকাশে ঘনিয়ে থাকা পরস্পর-বিরোধী সংস্কৃতির মেঘকে তিনি লিখতে চেয়েছেন। দেখাতে চেয়েছেন তথাকথিত বিশ্বায়নের অনেক আগেই দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর বাণিজ্য ও রাজনীতি জাঞ্জিবারের মতো দ্বীপভূমিতে বহুমাত্রিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল।

সাহিত্যবোদ্ধারা গুরনাহকে প্রশংসা করেন তার উপন্যাসের চরিত্রগুলোর জন্য, যে সব চরিত্র বিভিন্ন সংস্কৃতির বৈচিত্রের মধ্যে গ্রথিত, যারা বর্ণবাদ এবং পূর্ব-সংস্কারের সম্মুখীন কিন্তু একইসঙ্গে তারা আবার বাধ্য হয়ে সত্যকে দমন করছে কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত এড়াতে নতুন এক আত্মকাহিনী তৈরি করছে। শরণার্থীদের জীবনের পরতে পরতে যে ব্যঞ্জনা, তা পুরোপুরি ফুটে ওঠে তার লেখনীতে। গুরনাহর সাহিত্যকর্ম বেঁচে থাকার কিছু মূল দিক নিয়ে আমাদের ভাবায়। যেমন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য আশ্রয়, নিরাপত্তা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাত্রার স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদার অর্থ কী? ইতিহাসে আমাদের যাত্রার প্রথম দিকের বিষয়গুলোর অধিকাংশই ছিল আশ্রয়ের সন্ধান, ক্ষুধা থেকে আশ্রয়, অথবা কোনো বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয়। আধুনিক বিশ্বে মানুষের আশ্রয় খোঁজার সহজাত ইচ্ছাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সহিংসতা থেকে আশ্রয়প্রার্থী মানুষকে রক্ষা করার বৈশ্বিক চুক্তি থেকে আলাদা কিছু নয়। বাংলাদেশ নিজেই এই মহান ঐতিহ্যের সাক্ষী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ লাখ লাখ মানুষের আশ্রয় প্রার্থনার সাক্ষী। এবং আজও বাংলাদেশ সাড়ে এগারো লাখের বেশি রোহিঙ্গার আশ্রয়স্থল হয়ে তাদের বেদনার সাক্ষী। গুরনাহর নোবেলপ্রাপ্তি আমাদের শরণার্থীদের জীবন, তাদের চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার এবং শরণার্থীদের প্রতি আমাদের মানবিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে তুলে ধরেছে। গুরনাহর সাহিত্য বেঁচে থাকুক, মানবতার জয় হোক।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত