চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হাল চরম বেহাল। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের অনুকূলে মোট বরাদ্দের ১ শতাংশও ব্যয় করতে পারেনি। এসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ১০০ প্রকল্প রয়েছে। এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ৫৮ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মোট বরাদ্দের ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। এই ব্যয় গত ৫ বছরে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের সময়ে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের যে হার ছিল, তার চেয়েও অনেক কম চলতি অর্থবছরের বাস্তবায়ন হার। পরিকল্পনা বিভাগের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ হাল নাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
আইএমইডি তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য হাতে নেয় সরকার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে খরচ হয়েছে ১২ হাজার ৫৬৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। এটি এর আগের ৫ বছরে সর্বনিম্ন। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে এডিপির অগ্রগতি ছিল ১০.২১ শতাংশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮.২৫ শতাংশ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮.০৬ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮.০৬ শতাংশ। তবে বাস্তবায়ন হার গত সেপ্টেম্বরে মাত্র ১.৪৮ শতাংশ। যেখানে আগের বছর একই সময়ে এই বাস্তবায়ন হার ৪.১৭ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র হতাশাজনক। কাজের গতি বাড়াতে তদারকি বাড়ানো হবে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রথম দিকে আলসেমি করে, শেষ দিকে যেনতেনভাবে অর্থ ব্যয়ের রীতি থেকে বের হতে হবে। এই সমস্যা অনেক পুরনো। এটি টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা।
আইএমইডির তথ্যানুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ ও বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বাস্তবায়নে ১ শতাংশের উপরে উঠতে পারেনি ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এর মধ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি শূন্য। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪১টি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, যুব ও ক্রীড়া, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার এক-শতাংশের নিচে। আরও কয়েকটি বিভাগের নাম এই তালিকায় রয়েছে। এর বাইরে অগ্রগতি দু শতাংশের নিচে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর খরচের হিসাব থেকে জানা যায়, চলতি এডিপিতে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় হলো স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ ১৩ হাজার কোটি ১৯ লাখ টাকা। প্রথম দুমাসে তারা খরচ করতে পেরেছে মাত্র ১৭০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। যা মোট বরাদ্দের ১.৩১ শতাংশ। ৪৬ প্রকল্পের বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যয় ও অগ্রগতি একই। আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। তিন মাসে তারা ব্যয় করেছে ৬.১৮ শতাংশ বা ১৫৮ কোটি ১ লাখ টাকা। ২১৪টি প্রকল্পের বিপরীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য থোক বরাদ্দসহ রয়েছে ৩৩ হাজর ৯০১ কোটি টাকা। ব্যয় করেছে মাত্র ৭.৪৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৫৩২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কোনো অগ্রগতি নেই। বিদ্যুৎ খাতের ৭৫টি প্রকল্পের বিপরীতে এ বছর বরাদ্দ ২৮ হাজার ৫৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর খরচ হয়েছে ৩ মাসে ২ হাজার ৩৫১ কোটি ২৪ লাখ টাকা বা ৮.৩৮ শতাংশ।
দেশের সড়ক উন্নয়নে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ১৮২টি প্রকল্পের জন্য ২৮ হাজার ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের মাত্র ৪.০৯ শতাশ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ২১ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার ৬৩৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, কিন্তু গত তিন মাসে তারা খরচ করেছে ১ হাজার ১১২ কোটি ২৪ লাখ টাকাযা ৫.৩৯ শতাংশ। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ৩৬ প্রকল্পের বিপরীতে ১১ হাজার ৯১৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ। খরচ করা হয়েছে মাত্র ৫৪৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা বা ৪.০১ শতাংশ।
