প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হয়েছে। তবে শুক্রবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ঠাকুরগাঁওয়ে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার নোয়াখালীর চৌমুহনীতে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
ঢাকায় বিক্ষোভ হয়েছে ‘মালিবাগ মুসলিম সমাজ’-এর ব্যানারে। আর নোয়াখালীতে মিছিলকারীদের ব্যানারে লেখা ছিল ‘তৌহিদী জনতা’। চট্টগ্রাম নগরীর জে এম সেন হল পূজাম-পে গতকাল জুমার নামাজের পর হামলা হয়। এর প্রতিবাদে আজ শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের হরতালের ডাক দিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।
গতকাল বিকেলে ঠাকুরগাঁও শহরের রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিমা বিসর্জনের সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশ্রমপাড়া ও বাজারপাড়ার দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ছুরিকাঘাতে রয়েল বড়–য়া নামে কেন্দ্রীয় এক ছাত্রলীগ নেতা গুরুতর জখম হয়েছেন।
এদিকে কুমিল্লার ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৬৮৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশ ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
চাঁদপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় দুই হাজারজনকে আসামি করে তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গতকাল পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিস্তারিত আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
গতকাল জুমার নামাজের পর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে মিছিল বের হয়। পরে মিছিলটি পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পরে আটটি পূজাম-পে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ সময় জেলার পুলিশ সুপার, বেগমগঞ্জ থানার ওসি ও পরিদর্শকসহ (তদন্ত) কমপক্ষে ৫০ জন আহত হন।
জুমার নামাজের পর থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ টিয়ার শেল ও ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। হামলার ঘটনায় গতকাল রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জুমার নামাজের পর থেকে পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন পূজাম-পে দুর্বৃত্তরা অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় কলেজ রোডের বিজয়া পূজাম-পে অগ্নিসংযোগও করা হয়। পূজাম-পের পাশাপাশি হিন্দুদের বাড়িঘর ও দোকানপাটেও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। বিজয়া পূজাম-পে দুর্বৃত্তদের হামলার সময় যতন সাহা (৪২) নামে একজন মারা যান।
নিহত যতনের বাড়ি কুমিল্লার তিতাসের গোবিন্দপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন সাহার ছেলে। পূজা উপলক্ষে চৌমুহনীতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন যতন।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেগমগঞ্জের ঘটনায় একজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। এছাড়া তিন পুলিশসহ চারজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।’
হামলায় জেলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম, বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি কামরুজ্জামান শিকদার, পরিদর্শক (তদন্ত) রুহুল আমিন, কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন, কামরুল হাসান ও রাকেশ দেবনাথসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার দাস জানান, পুলিশ সুপার ও ওসিসহ ১৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য তপন চন্দ্র দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চৌমুহনীর আটটি পূজামণ্ডপে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে খুব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
বেগমগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহ ইমরান জানান, হামলার ঘটনায় পুলিশ দুজনকে আটক করেছে।
পূজামণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর চৌমুহনীসহ নোয়াখালীজুড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা জেলার বিভিন্ন জায়গায় টহল দিচ্ছেন। এছাড়া চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল রাত ৯টার দিকে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামছুন নাহার স্বাক্ষরিত আদেশে আজ ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ঢাকায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ : ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে গতকাল জুমার নামাজের পর ‘মালিবাগ মুসলিম সমাজ’-এর ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ছোড়ে পুলিশ। সংঘর্ষে মিছিলকারী ও পুলিশের বেশ কিছু সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের সময় সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুপুর আড়াইটার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গতকাল সকাল থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। এর মধ্যেই বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। জুমার নামাজ শেষে মিছিলটি পল্টন-বিজয়নগর হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। আর তখনই দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সরেজমিন দেখা যায়, বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমাম জুমার নামাজের সালাম শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই একদল মানুষ বিক্ষোভ শুরু করে। শুরুতে তারা মসজিদ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করলেও এরপর রাস্তায় নেমে পড়ে। একপর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে মালিবাগের দিকে এগোতে থাকে। তখন পুলিশ তাদের নাইটিঙ্গেল মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। সাধারণ মুসল্লিদের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হলেও এতে হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশ নিতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভ থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ ‘অবমাননাকারীদের’ শাস্তির দাবির পাশাপাশি হেফাজতের সাবেক নেতা মাওলানা মামুনুল হকসহ সংগঠনটির নেতাদের মুক্তির দাবিতে স্লোগানও দেওয়া হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা ও তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
পুলিশের বাধা পেয়ে মিছিলকারীরা আশপাশের গলিতে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে শুরু করে। অন্যদিকে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে বিভিন্ন গলির মুখে অবস্থান নিয়ে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা শটগানের গুলিও ছোড়েন। দুপক্ষের মধ্যে থেমে থেমে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এ সময় পাঁচ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত দুই বিক্ষোভকারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার বায়জিদুর রহমান জানান, তিনিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে যেসব বিক্ষোভ হয়, সেগুলোর নেতৃত্ব কোনো না কোনো সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক দল দিয়ে থাকে। কিন্তু আজকের (গতকাল) এ বিক্ষোভে প্রকাশ্যে কেউ
নেতৃত্বে ছিল না। তাই মিছিলটি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে আমাদের।’
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ. আহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতির অবনতি যাতে না ঘটে এবং অন্য কোনো গোষ্ঠী যেন সাধারণ মুসল্লিদের বিক্ষোভ মিছিলকে ব্যবহার করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য পুলিশ শুরু থেকে শান্তিপূর্ণভাবে নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। নাইটিঙ্গেল মোড়ে আসার পর বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে। তখন পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ধাওয়া দেয় এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।’
চট্টগ্রামে হামলার ঘটনায় অর্ধদিবস হরতালের ডাক : চট্টগ্রাম নগরীর জে এম সেন হল পূজামন্ডপে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বিকেলে একদল লোক মিছিল নিয়ে ফটকের বাইরে থেকে মন্ডপ লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে এবং বাইরে লাগানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ৫০ জনকে আটক করে।
ঘটনার পরপরই পূজা উদযাপন কমিটির নেতাকর্মীরা জে এম সেন হলের কাছে সড়ক অবরোধ করেন। এছাড়া নিরাপত্তা না থাকায় প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি আশীষ ভট্টাচার্য। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি হামলার প্রতিবাদে আজ শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতালের ঘোষণা দেন।
সিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) বিজয় কুমার বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক জে এম হলে হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫০ জনকে আটক করেছে।’
পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা জানান, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়ার পর সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। জে এম সেন হলের প্রতিমা বিসর্জন করা হয় কর্ণফুলী নদীর নেভাল-২ এলাকায়।
ঠাকুরগাঁওয়ে ছাত্রলীগ নেতা আহত : ঠাকুরগাঁওয়ে ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা রয়েল বড়ুয়া। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল থেকে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিয়াজ নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বিকেলে শহরের রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিমা বিসর্জনের সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আশ্রমপাড়া ও বাজারপাড়ার দুই গ্রুপের উত্তেজনা চলাকালে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের শিকার হন রয়েল।
সদর থানার ওসি তানভিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা উদঘাটন করা যায়নি, চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজনকে আটক করা হয়েছে।’
কুমিল্লায় ৬ মামলায় গ্রেপ্তার ৪২ : কুমিল্লায় পূজামন্ডপের ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল পর্যন্ত জেলার তিনটি থানায় করা এসব মামলায় ৬৮৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় চারটি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি এবং দাউদকান্দি থানায় একটি মামলা করেছে। আসামিদের মধ্যে পুলিশ ৪২ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এদিকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ক্ষতিগ্রস্ত পূজামন্ডপ পরিদর্শন করে। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি পূজাম-পগুলো পরিদর্শন করে।
পরিদর্শন শেষে জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনায় সরকারকে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে সেই গ্যারান্টি দিতে হবে।’
প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি, মুক্তিযোদ্ধা নাঈম জাহাঙ্গীর, জুলকার নাঈন ইমন প্রমুখ।
কুমিল্লায় সহিংসতার ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সায়েদুল আরেফিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কুমিল্লার ঘটনায় ফেইসবুক ও ইউটিউবে অপপ্রচারের অভিযোগে গোলাম মাওলা নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর নিউ মার্কেট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল কুমিল্লা র্যাব-১১-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। গ্রেপ্তার গোলাম মাওলা (২৬) বুড়িচংয়ের কালিকাপুর গ্রামের প্রয়াত তাজুল ইসলামের ছেলে।
র্যাব জানায়, গোলাম মাওলা ঘটনার সময় নানুয়ার দীঘিরপাড় পূজামন্ডপে গিয়ে বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে এবং সেসব ছবিতে বিভিন্ন উগ্রবাদী কথা সংযুক্ত করে নিজের ফেইসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে। বিষয়টি র্যাবের নজরে এলে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চিহ্নিত করা হয়।
গতকাল কুমিল্লার পূজামন্ডপগুলোতে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর কার্যক্রম শেষে বিসর্জন করা হয় প্রতিমা। নাশকতা ঠেকাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে চারটি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কঠোর অবস্থানে ছিল বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। শহরমুখী প্রতিটি সড়কে ছিল পুলিশের কঠোর অবস্থান।
গতকাল নাশকতা বিরোধী মিছিল করে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা। নাশকতা প্রতিরোধে কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সমর্থকরা পুলিশের পাশপাশি নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন।
চাঁদপুরে আটক ৭ : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে গত বুধবার রাতের সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দুই হাজারজনকে আসামি করা হয়েছে। হাজীগঞ্জ থানায় হামলা ও পুলিশ সদস্য আহতের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করে। এছাড়া রাজারগাঁও ইউনিয়নের মুকন্দসার গ্রামে হামলার ঘটনায় আরেকটি মামলা করা হয়েছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ সার্কেল) মো. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘হাজীগঞ্জ উপজেলায় ১২টি পূজামণ্ডপ ভাঙচুর হয়েছে। পুলিশ বাদী হয়ে দুটি ও মন্দির ভাঙার দায়ে মন্দির কর্র্তৃপক্ষ একটি মামলা করেছে। এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
এদিকে হাজীগঞ্জে সংঘর্ষে নিহতের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
হাজীগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। অন্যায়ভাবে কাউকে আটক করা হবে না।’
গত বুধবার রাতের সংঘর্ষে নিহত আল-আমিন, শামীম ও হৃদয়ের দাফন হাজীগঞ্জের নিজ নিজ গ্রামে গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া নির্মাণশ্রমিক বাবলুর মরদেহ গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুন্দরগঞ্জের ভাগডাঙ্গায় নেওয়া হয়েছে।
সংঘর্ষের ঘটনার পর হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় বুধবার রাত ১২টার পর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
না.গঞ্জে বিক্ষোভ থেকে একজন আটক : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদী ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া, চেঙ্গাকান্দী ও নাকরখাটি গ্রামের একদল মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করেছে। গতকাল বিকেলে বারদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হকের নির্দেশে মিছিলটি প্রতিহত করেন তার সমর্থকরা। সোনারগাঁ থানা পুলিশ পাইকপাড়া গ্রামের আবদুল আওয়ালের ছেলে জুয়েলকে মিছিল থেকে গ্রেপ্তার করে।
সোনারগাঁ থানার ওসি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিক্ষোভ মিছিল থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য বা মিছিল করবে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
গত বুধবার কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া গেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ওই ঘটনার জের ধরে সেদিনই কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনা ঘটে। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে এ নিয়ে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিনই ২২টি জেলায় বর্ডার গার্ড সদস্যদের (বিজিবি) মোতায়েন করে সরকার।
