কেরানীগঞ্জে জাল দলিলে জমি নামজারি দুই ভাইয়ের

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৫৭ এএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জ দক্ষিণে ‘ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ৪৫ শতাংশ জমির জাল এওয়াজ দলিল তৈরি করে নামজারি করার অভিযোগ উঠেছে আবু সাঈদ (৬২) ও আবু হোসেন (৫৯) নামের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। তারা কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া পূর্ব মধ্যপাড়ার মৃত নূরনবীর ছেলে।

অভিযোগ রয়েছে, সাড়ে ৪ কোটি টাকা মূল্যের ওই জমি নামজারি করে বিক্রির চেষ্টা করছেন আবু সাঈদ ও আবু হোসেন। ভূমি অফিসকেন্দ্রিক কিছু দালাল চক্রের যোগসাজশে জাল এওয়াজ দলিল তৈরি করে নামজারির মতো প্রতারণা করেছেন তারা। তবে খোদ সাব রেজিস্ট্রার বলছেন, ‘যে দলিল দিয়ে তারা নামজারি উল্লেখ করেছেন, এর সঙ্গে রেজিস্ট্রিকৃত ও সংরক্ষিত একই নম্বরের দলিলের কোনো মিল নেই।’ জানা গেছে, আবু সাঈদ ও আবু হোসেন ২০১৯ সালে জাল দলিল তৈরি করে ২০২০ সালে নামজারি করেছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আবু সাঈদ ও আবু হোসেন সহোদরের ইকুরিয়ার মৌজায় ‘ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ৪৫ শতাংশ জমি সিএস ও এসএ ১৩ নম্বর দাগে। তারা ওই ৪৫ শতাংশ জমি ‘ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে এওয়াজ বদল দেখিয়েছেন সিএস ও এসএ ৯২২ নম্বর দাগে। অথচ ইকুরিয়া মৌজায় ৯২২ নম্বর দাগে ৪৫ শতাংশ ভূমির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।

কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ সাব রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, যে জাল দলিলে তারা নামজারি করেছেন, সেই দলিল নম্বর ৫৭৮৪। আবু সাঈদ ও আবু হোসেন সহোদর ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডের কেরানীগঞ্জের দক্ষিণের বেয়ারা মৌজার একটি দলিলকে (৫৭৮৪) কিছুটা অনুকরণ করে জাল দলিল তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আবু সাঈদ ও আবু হোসেন ২০০৬ সালের ২৫ জুন মো. হানিফ হাওলাদার নামে একজনকে আমমোক্তার নিযুক্ত করেন। যার দলিল নম্বর ৮৫৯৭। সেই আমমোক্তার একই বছরের ২৯ জুন তাদের পক্ষে ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্সের কাছে ৪৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। যার দলিল নম্বর ৯১৩৯। নামজারি হয় ২০০৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি (জোত নং ৪৬)। ১৪ বছর পর প্রতারণা করে এই নামজারির বিপরীতে এওয়াজ বদল জাল দলিল তৈরি করে আবার নামজারি করেছেন তারা।

এ ব্যাপারে আবু সাঈদের কাছে জানতে চাইলে আমমোক্তার নিয়োগের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে আমমোক্তার নিয়োগ দেইনি। এটা আমার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি।’

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার কোনাখোলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে আবু সাঈদদের ২০০৬ সালে আমমোক্তার নিযুক্ত করা এবং সেই জমি বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে এমন প্রশ্নের জবাবে আবু সাঈদ কোনো সৃদুত্তর দিতে পারেননি।

এসব জাল দলিল তৈরি করে নামজারিতে কেরানীগঞ্জের (দক্ষিণ) শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ভূমি অফিসের তৎকালীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হাছান আহমেদসহ সে সময়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সানজিদা পারভীন, ভূমি কার্যালয়ের নামজারি সহকারী মোহাম্মদ মজিরুল হক ও কানুনগো নাজমুল হোসেনের গাফিলতি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় দলিলটি যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এমনকি আবু সাঈদ ও আবু হোসেন যে দলিলে নামজারি করেছেন, তাদের সঙ্গে বিনিময়কারী জমির মালিক পক্ষ যাকে দেখানো হয়েছে, তাদের আইনি নোটিসের মাধ্যমে অবগত করা হয়নি।

এ বিষয়ে ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্স লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানাজার এ টি এম জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আবু সাঈদদের আমমোক্তার নিযুক্তকারী ১৩ দাগের ৪৫ শতাংশ জমি ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্সের কাছে বিক্রি করেছে। যারা জমির মালিকানা সেসব কাগজ সংশ্লিষ্ট সব অফিসে আছে। কিন্তু আবার তারা ১৪ বছর পরে একই জমি ভুয়া দলিলে ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টিজকে বিনিময় পক্ষ বানিয়ে এওয়াজ বদল দেখিয়েছে, যা আমরা কোনো পক্ষই অবগত নই।’

ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টিজের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ‘প্রথমত আবু সাঈদরা বড় ধরনের প্রতারণা করেছেন ঢাকা মাল্টি কমপ্লেক্স লি.-এর ভূমি ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লি.-এর সঙ্গে ভুয়া দলিলে বিনিময় দেখিয়ে। দ্বিতীয়ত, ভূমি অফিসের দালাল চক্র ও কতিপয় দুর্নীতিবাজ ভূমি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে ভুয়া দলিলে ঢাকা মাল্টি কমপ্লেক্সের জমির নামজারি কেটে তাদের নামে নামজারি করে। তাই এসব জালিয়াতিতে জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করছি।’

কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রণজিৎ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘আবু সাঈদরা ঢাকা মাল্টি অ্যাগ্রিকালচারাল কমপ্লেক্সের ভূমি ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টিজের সঙ্গে এওয়াজ বদল দেখিয়েছে। এখানে কাগজপত্র দেখে শতভাগ ভুল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ অফিস থেকে যারা নামজারির প্রস্তাবনা দিয়েছে মনে হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুলটি করেছে। এখন মিস কেইস করলেই সমাধান হয়ে যাবে। তবে যারা ভুয়া দলিল করেছেন, তারা বড় ধরনের জালিয়াতি করেছেন। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

এসব বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান আলী বলেন, ‘যে দলিল (নং-৫৭৮৪) দিয়ে তারা নামজারি উল্লেখ করেছেন, এটি দেখা যাচ্ছে এওয়াজ বদল দলিল ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই রেজিস্ট্রিকৃত। সেই দলিলের সঙ্গে আমাদের রেজিস্ট্রিকৃত ও সংরক্ষিত একই নম্বরের দলিলের কোনো মিল নেই। এ দলিলটি ইস্ট-ওয়েস্ট প্রপার্টিজের ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই রেজিস্ট্রিকৃত এবং অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি অন্য মৌজার একটি দলিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত