অভিযুক্ত সৈকত ও তার দাদা চেয়ারম্যান ছাদেক রহস্য

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০১:১৮ এএম

মাঝিপাড়া থেকে বের হয়ে আসার সময়টা ছিল দুপুর। শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পাশেই একটি ছোট জটলা। অল্প কয়েক আঁটি ঘাস। সেই ঘাস ঘিরেই তারা কথা বলছিলেন। জানা গেল, ১৭ অক্টোবরের রাতের হামলায় মাঝিপাড়ার সব খড়ের গাদা আগুনে পুড়ে গেছে। এর ফলে চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে সব জীবিত গবাদিপশু। দুই তিন দিন প্রায় না খেয়ে থাকতে হয়েছে গৃহপালিত পশুগুলোকে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঁচ দিন এ-পাড়ার লোকজনের জন্য রান্নার ব্যবস্থা করা হলেও গবাদিপশুর জন্য কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এই সুযোগে কেউ কেউ গবাদিপশুর খাদ্য ঘাস বিক্রি শুরু করেছে। পাশের গ্রামের একজন ঘাস নিয়ে এসেছেন বিক্রি করতে। গ-া (চার আঁটিতে এক গ-া) ১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে ঘাস। এখানেই কথা হয় এক তরুণের সঙ্গে। আলাপের পর জানা গেল তার নাম সুদর্শন দাশ (১৯)। বাবা সূর্য দাস (৫২)। অল্পবয়সী তরুণটির সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা চলল। সেই রাতের ঘটনা শুনতে চাইলে বলল, এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যেই শত শত লোক চলে এসেছিল। প্রথম দিকে মাঝিপাড়ার পুরুষেরা কেউ কেউ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু হামলাকারীরা সংখ্যায় এত বেশি ছিল যে, মুহূর্তেই প্রতিরোধের সেই চেষ্টা ভেঙে পড়ে। অসহায় নিরুপায় হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে। সুদর্শনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, হামলাকারীদের কাউকে চেনা গেছে কিনা? মুহূর্তেই কথা বন্ধ করে দেয় লম্বাচওড়া গড়নের এই তরুণ। সুদর্শনের সঙ্গে যখন আলাপ হচ্ছিল তখন পাশে এসে দাঁড়ান এক মধ্যবয়সী লোক। পরিচয় দিয়ে জানালেন তার নাম অভয়পদ (৪৫)। তার হাতে একটি প্লাস্টিকের মাঝারি সাইজের বালতি। ভেতরে একটা সিলভারের পাতিল, মেলামাইনের দুটি থালা ও একটি প্লাস্টিকের জগ। রেডক্রিসেন্ট থেকে সহায়তা হিসেবে এইসব পেয়েছিলেন জানালেন। অভয়পদ নিজের পোড়া বাড়ি দেখাতে চাইলেন। অভয়পদের বাড়িটি মূল মাঝিপাড়া থেকে অল্পদূরে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল এক মধ্যবয়সী নারী কুলায় চাল ঝাড়ছেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, সামনের বস্তাভর্তি আগুনে পুড়ে যাওয়া চাল। অভয়পদ জানালেন, ১৭ অক্টোবরের রাতের আগুনে তার ঘরের খাবার চাল পুড়ে গেছে। এই পুড়ে যাওয়া চাল থেকে যেটুকু পারা যায় বেছে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভয়পদের আধাপাকা ঘর ছিল। ঘরের দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গায় পোড়া দাগ কালচে হয়ে আছে। জেলা প্রশাসনের দেওয়া নতুন টিন লাগানো হয়েছে ঘরের চালে। অভয়পদের কাছে প্রশ্ন ছিল, ঘটনার রাতে কোথায় ছিলেন? পেশায় জেলে অভয়পদ সেইরাতে মাছ ধরার জন্য বাড়ির বাইরে ছিলেন। সকালে ফিরে এসে নিজের পোড়া ঘরের সামনে অসহায় স্ত্রীকে বসে থাকতে দেখেন। পরে পাড়ার অন্যান্য বাড়ি ঘুরে এসে একই অবস্থা দেখে নিয়তি হিসেবে মেনে নেন। অভয়পদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা সদরে ফেরার রাস্তায় উঠতেই দেখা গেল পাড়ার প্রবেশমুখে ছয়-সাতজন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্য বসে আছেন অলস ভঙ্গিতে। তাদের কাছে প্রশ্ন ছিল এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন? বাহিনীর এক সদস্য জানালেন, এখন পরিস্থিতি আর ঝুঁকিপূর্ণ নয়। নতুন করে হামলার সম্ভাবনাও নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকজন খুব একটা পাড়ার বাইরে বের হচ্ছেন না। এলাকার থমথমে ভাবটাও পুরোপুরি কাটেনি। মাঝিপাড়ার মাটির রাস্তা ছেড়ে পাকা সড়কে উঠতেই এক ভ্যানচালকের সঙ্গে আলাপ হলো। তার কাছে জিজ্ঞাসা ছিল, এখানকার হামলাকারীদের বিষয়ে  তার কোনো ধারণা আছে কিনা? ভ্যানচালকের কথায় বেশ সচেতনভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি স্থানীয় ১৩নং রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাদেক মাস্টারের সঙ্গে আলাপের পরামর্শ দিলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ১৩নং রামনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাদেকুল ইসলাম স্থানীয়ভাবে ছাদেক বিএসসি নামে পরিচিত। তিনি পীরগঞ্জের ঘটনায় আটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাকে ‘মূল উসকানিদাতা’ হিসেবে বলছে সেই সৈকত মন্ডলের সম্পর্কে দাদা। 

ছাদেকুল ইসলাম পীরগঞ্জের খেদমতপুর হাইস্কুলের সাবেক শিক্ষক। ২০১৭ থেকে তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করছেন। সেখানে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পরিচয় দিয়ে দেখা করতে চাইলে তিনি বললেন, এখন রংপুর ডিসি অফিসে রয়েছেন। ফিরতে বিকেল হবে। পরে রংপুর শহরেই দেখা করার বিষয়ে কথা বলে পীরগঞ্জ উপজেলা শহরের দিকে রওনা দেয় এই প্রতিবেদক। 
অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা ও আসামি আটকের বিষয়ে জানার জন্য পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে থানার দিকে যেতেই দেখা যায় থানার সামনে একশোর মতো লোকজন হইচই করছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, উপস্থিতরা গত কয়েক দিনে আটকদের স্বজন। নিজেকে আটক দুলালের স্ত্রী দাবি করে এক নারী বললেন, তার স্বামী মাঝিপাড়ার হামলার রাতে বাড়িতেই ছিল। অযথাই দুলালকে আটক করা হয়েছে। আরেক বয়স্কা নারী বললেন তার ছেলেকেও ধরে আনা হয়েছে।  
১৭ অক্টোবরের ঘটনায় পীরগঞ্জ থানায় ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৪টি মামলায় ৭০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র। এই ঘটনায় ‘মূল উসকানিদাতা’ মো. সৈকত ম-ল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবনন্দি দেওয়ায় আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এর আগে তাকে আটক করা হয়েছিল গাজীপুর থেকে। সৈকতের দাদা চেয়ারম্যান তাকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করে। 
থানার বাইরে অবস্থানরত লোকজনের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেস চন্দ্র বললেন, ‘কাউকে বিনা কারণে আটক করে আনা হয়নি। আমরা অযথা কাউকে হয়রানি করছি না। এই হামলার সময়ে ১৩নং রামনাথপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে এসে হামলা চালিয়েছে। খেজমদপুর, খেজমদপুর তালুকদারপাড়া, চেরাগপুর, রাজারামপুর, মজিদপুর, ছোটো ঘোলা, বড় ঘোলাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে হামলা চালিয়েছে। আমরা ঘটনার সময়ে যে পরিমাণ মানুষকে হামলায় অংশ নিতে দেখেছি, তার তুলনায় এখন পর্যন্ত অল্পসংখ্যক লোকই আটক হয়েছে।’ 
পীরগঞ্জের উত্তর মাঝিপাড়ায় অগ্নিসংযোগের ঘটনার ‘মূল উসকানিদাতা’ হিসেবে আটক মো. সৈকত ম-লের বিষয়ে পাওয়া গেছে বিস্ময়কর সব তথ্য। সৈকতের রয়েছে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড। তার দাদা চেয়ারম্যান ছাদেক মাস্টার সম্পূর্ণ সুস্থ সৈকতকে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। নিয়মিত ভাতার টাকা উত্তোলন করতেন সৈকত ম-ল। সৈকতের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডে দেখা গেছে তার নামমো. সৈকত ম-ল। মায়ের নাম লেখা রয়েছে আঞ্জুয়ারা বেগম। বাবা মো. রাশেদুল হক। জন্ম তারিখ ১৪-০৬-১৯৯৭। প্রতিবন্ধিতার ধরন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধী। ঠিকানা দেওয়া আছেচেরাগপুর, রামনাথপুর, পীরগঞ্জ, রংপুর। 
সৈকত ম-লের ভাতার টাকা উত্তোলন এবং ওই রাতের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ১৩নং রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাদেকুল ইসলামের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হয়। 
সৈকত ম-লের প্রতিবন্ধী ভাতা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সৈকত ম-লের নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড থাকায় তাকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। এই কার্ড আমি দেইনি। তার নামে কার্ড ছিল, তাই ভাতা নিয়েছে।’ 
শারীরিকভাবে সুস্থ একজন মানুষ কী করে প্রতিবন্ধী ভাতার সুবিধাভোগী হলো এবং তা দেখেও কেন বন্ধ করতে উদ্যোগী হলেন নাএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী কিনা তা যাচাই করবে ডাক্তার বা সিভিল সার্জন। আমি কী করে করব?’ সৈকত ম-লের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক অবশ্য স্বীকার করেন তিনি। তবে এই প্রতিবেদক পীরগঞ্জ থানার ওসির কক্ষে বসে থাকা অবস্থাতেই ছাদেক চেয়ারম্যান সৈকতের বিষয়ে তদবিরের জন্য ফোন করেন। ওসির সঙ্গে ফোন-আলাপের পরে ছাদেক চেয়ারম্যানকে দীর্ঘসময়ে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে রংপুর শহরে ডিসি অফিসের সামনে গিয়ে ছাদেক চেয়ারম্যানকে আবারও ফোন করা হয়। তখন তিনি ফোন রিসিভ করে পরিচয় বলার পরে লাইন কেটে দেন। আবার দুইবারের চেষ্টায় তাকে ফোনে পাওয়া যায়। সৈকত ম-লকে পীরগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, এখন আটক ব্যক্তির বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তাকে জড়ানো ঠিক হবে না।  তবে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে পীরগঞ্জ থানার ওসিকে ফোন করার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বরং সৈকতকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একজন হিসেবেই পরিচয় দিতে চান। তবে সৈকতের এই ছাত্রলীগ ‘নেতা’ পরিচয় নিয়েও মিলেছে আশ্চর্য তথ্য। সৈকত ম-ল রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী হয়েও কারমাইকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কমিটিতে ছিলেন। পীরগঞ্জের ঘটনায় ইতিমধ্যে রংপুর জেলা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সৈকত ম-লকে বহিষ্কারের খবর জানানো হয়েছে। 
১৩ নং রামনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছাদেকুল ইসলাম সৈকত ম-ল বিষয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি। আগের আলাপের সূত্র ধরে রংপুর ডিসি অফিসের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি জানান, তিনি পীরগঞ্জে চলে গেছেন। আগের কথার সূত্রে ধরে এখানে দেখা করার কথা বললে তিনি উত্তর না দিয়ে লাইন কেটে দেন। জেলা প্রশাসকের অফিসের পাশেই রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়। 
জেলার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয় রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্যের কাছে। রংপুর শহরে তার কার্যালয়ে বসেই তিনি কথা বলেছিলেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। জেলার বর্তমান অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ১৭ অক্টোবরের রাতের পর থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে। এই সময়ে  নতুন করে কেউ আর হামলা বা ওইরকম কোনো ঘটনা ঘটাতে সাহস করবে না। তবে এই ঘটনা একটি বার্তা কিন্তু দিচ্ছে, সেটি হলো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের মনোভাব গঠনেও কাজ করতে হবে। মানুষের চিন্তার পরিবর্তন না হলে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত