স্কুল-শিক্ষার্থীদের টিকা আগামী সপ্তাহে

টিকায় অগ্রাধিকার এসএসসি-সমমান পরীক্ষার্থীদের

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০১:২৫ এএম

সবকিছু ঠিক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের টিকার কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এই টিকাদান কর্মসূচিতে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে আসন্ন এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষার বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আগামী ১৪ নভেম্বর থেকে এ বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দীপু মনি। তিনি বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে এমন গুজবের বিষয়ে কড়া মনিটরিং করা হচ্ছে। যারা এ ধরনের কাজ করবে তাদের অবশ্যই কঠোর শাস্তির আওতায় আসতে হবে। দীপু মনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ঠেকাতে আগামী ৮ থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখা হবে।  

টিকা কার্যক্রমে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে দীপু মনি বলেন, ‘অবশ্যই যারা পরীক্ষার্থী, আমরা একেবারেই স্কুল ধরে ধরে (টিকা) দেব। যারা পরীক্ষার্থী তাদের সর্বাগ্রে যেন দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাতে হয়তো একই দিনে এক স্কুলে সবারই টিকা দেওয়া হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী এবং ১২ বছরের বেশি যারা, তারা সবাই পেয়ে যাবে।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের করণীয় প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। দীপু মনি জানান, এবার এই পরীক্ষায় অংশ নেবে ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ জন। এর মধ্যে এসএসসিতে ১৮ লাখ ৯৯৮, দাখিলে ৩ লাখ ১ হাজার ৮৮৭ ও ভোকেশনালে ১ লাখ ২৪ হাজার ২২৮ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর পরীক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩৪ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেটি হয়নি বলে মনে করেন দীপু মনি।
পরীক্ষার্থী কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যদি কেউ আক্রান্ত হয়, সে তো পরীক্ষা দিতে আসতে পারবে না। তারপরও যদি কেউ পরীক্ষা দিতে চায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে স্ব স্ব বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়ে, যদি পরীক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি থাকে, তাহলে সেই হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে ব্যবস্থা করে পরীক্ষা নিতে পারে। সেটা আমরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।’ 
দীপু মনি বলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করছি। অভিভাবকরা কেন্দ্রে না এলেই ভালো। যদি আসতেই হয়, তাহলে একজনের বেশি যেন না আসেন। যদি আসেন তারা যেন কেন্দ্রের সামনে ভিড় না করেন। তারা যেন দূরে অবস্থান করেন।’
বিষয় কমানোয় মূল্যায়নে সমস্যা হবে কি না, জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় না। গত বছর আমরা সাবজেক্ট ম্যাপিং করে যেটা করেছি, সেটার সঙ্গে তার আগের তিন বছরের ফলাফল মিলিয়ে দেখেছি। মনে হয়, যেন পরীক্ষা নিয়েই ফলাফল দেওয়া হয়েছে। এতটাই সামঞ্জস্যতা ছিল।’
শিক্ষামন্ত্রী জানান, এবার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৫১টি এবং কেন্দ্র বেড়েছে ১৬৭টি। বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পরীক্ষা নেওয়া শেষে ৩০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে।
দেশের যেকোনো বড় পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি বড় সমস্যা। তবে বিষয়টিকে গুজব বলে দাবি করেন দীপু মনি। একই সঙ্গে এই গুজব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সভায় এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গুজব যেন বন্ধ করা যায়। সব গুজব বন্ধ করা যাবে কি না, তবে পরীক্ষার জন্য যেটি ক্ষতিকর সেটা প্রশ্ন ফাঁসের গুজব। সেটি আমরা গত কয়েক বছর থেকে এটা যে গুজব, সেটা জানতে পেরেছি। যারাই এ ধরনের গুজবে জড়িত থাকবে, প্রশ্নফাঁসের চেষ্টায় জড়িত থাকলে তাদের ধরার ব্যাপারে সমস্ত গোয়েন্দা সংস্থার এখন থেকেই তীক্ষè নজরদারি রয়েছে।’ এবার এসএসসি পরীক্ষার চলাকালে ৮-২৫ নভেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ থাকবে বলে জানান দীপু মনি। 
শিক্ষা আইন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে দীপু মনি বলেন, ‘আইন তৈরি একটা লম্বা প্রক্রিয়া। আমাদের কাজ সম্পন্ন করেছি। এখন এটি কেবিনেটে যাবে। কেবিনেট থেকে চূড়ান্ত ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে বা কেবিনেট কিছু অবজারভেশন দিয়ে পাস করে দিতে পারে। এরপর সেটি সংসদে যাবে। এরপর আইনি প্রক্রিয়াটি আমাদের হাতে নয়।’
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নানা স্তরের দুর্নীতি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত টিআইবির প্রতিবেদন প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য জানতে চান একজন সাংবাদিক। এ বিষয়ে দীপু মনি বলেন, ‘আমরা পুরো রিপোর্টটি দেখেছি। রিপোর্টটিতে অনেক অসংগতি আছে। শিক্ষক নিয়োগে যে কথাটি বলা হয়েছে, এখন সরকারিতে পিএসসির মাধ্যমে এবং বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ দেয় এনটিআরসিএ। শুধু প্রধান শিক্ষকের বিষয়টি কিংবা গ্রন্থাগারিকদের বিষয়টা এনটিআরসিএর মাধ্যমে হবে। তারা যে কথাটি বলেছেন, সেটা এখন আর প্রযোজ্য নয়। ম্যানেজিং কমিটির বিষয় নিয়ে যা বলা হয়েছে, সে বিষয়গুলো নিয়ে বহু আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সে কারণে ওই রিপোর্টের সেই কারণে আর খুব ভ্যালু আমি দেখি না। কিন্তু কেউ কোনো বিষয় খতিয়ে দেখলে আমাদের জন্য ভালো, আমাদের জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। তবে সেটি নিরপেক্ষভাবে হতে হবে।’

গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ আজ : গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ আজ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সারা দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে যে বিশেষ কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন হয়েছিল, সেই ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় রাউন্ড হিসেবে আজ দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। দেশব্যাপী সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলায় প্রথম ডোজের কেন্দ্রগুলোতেই দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবে মানুষ। এদিন কেবল দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হবে। প্রথম ডোজ দেওয়া বন্ধ থাকবে। যারা প্রথম ডোজ যে কেন্দ্রে নিয়েছিলেন, তাদের সেই কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে। কেন্দ্র পরিবর্তন করে কোনো টিকা দেওয়া যাবে না। 

গতকাল বুধবার করোনার টিকা বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান। 
এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সারা দেশে এক দিনে ৭৫ লাখ টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেয় সরকার। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেদিন দিতে পেরেছিল ৬৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮২ ডোজ। অবশ্য পরের দিন সাধারণ টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি গণটিকার অংশ হিসেবে ৮০ লাখ ডোজ টিকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। 
এ ব্যাপারে ডা. শামসুল হক গত মঙ্গলবার বলেন, এক দিনে (আজ বৃহস্পতিবার) ৭৫ লাখ টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। কেউ বাদ পড়লে তিনি পরে নিতে পারবেন।
স্কুল শিক্ষার্থীদের টিকা আগামী সপ্তাহেই : আগামী শনি বা রবিবার ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনা টিকা দেওয়া শুরু করতে পারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। 
গতকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘স্কুল শিক্ষার্থীদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই করোনার টিকা দেওয়া হতে পারে। এখন রেজিস্ট্রেশনের কাজ চলমান আছে। এ কাজের আরেকটু অগ্রগতি হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা টিকা দেওয়া শুরু করতে পারব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিজ নিজ স্কুলের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সক্ষমতা অনুযায়ী সারা দেশের জেলা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে ২১টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে স্কুল শিক্ষার্থীদের ফাইজারের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্কুল শিক্ষার্থীদের তালিকা সরবরাহ করবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অধিদপ্তর সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে তাদের বিস্তারিত তথ্য দেবে।
এর আগে ১৪ অক্টোবর মানিকগঞ্জের চার সরকারি স্কুলের ১১১ জন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষামূলকভাবে করোনা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। তাদের পর্যবেক্ষণ শেষে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে স্কুল শিক্ষার্থীদের এই টিকা দেওয়ার কথা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত