বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৮ পিএম

ফিনল্যান্ড, জাপান, নরওয়ে ইত্যাদি দেশগুলোতে স্কুলশিক্ষকতা হচ্ছে ওই দেশগুলোর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি বেতনের চাকরিগুলোর মধ্যে একটি। এ ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ফিনল্যান্ডের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আপনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে চাইলে আপনাকে আপনার ক্লাসে প্রথম ১০ জনের মধ্যে থাকতে হবে। এর বাইরে হলে আপনি অ্যাপ্লাই করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর ওপর প্রার্থীর মূল্যায়ন করা হয়। যেমন তিনি কত আকর্ষণীয়ভাবে ক্লাস নিচ্ছেন, গ্রুপওয়ার্কগুলো কেমন হচ্ছে, তার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিচ্ছে কি না বা ঠিকমতো শিখছে কি না ইত্যাদি। এক বছরের শিক্ষক প্রশিক্ষণে ভাইভা, লিখিত পরীক্ষা আর সবশেষে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা থাকে। এক বছরের প্রশিক্ষণের পর সব প্রার্থীর মধ্য থেকে বাছাই করে সেরা ১০ প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। ভেবে দেখুন, ইউনিভার্সিটিতে নিজ নিজ বিভাগের সেরা ১০ ছাত্রছাত্রীর মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃতদের মধ্য থেকে ছেঁকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষে সেরা ১০ জনকেই নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। তাহলে গাণিতিক হিসাবে ফিনল্যান্ডের সেরা ১ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী আসলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন।

নিউজিল্যান্ডে তিন ধরনের মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে সরকারি স্কুলগুলোতে পড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর সরকারি নিবন্ধনভুক্ত (বেসরকারিভাবে পরিচালিত) স্কুলে পড়ে ১২ শতাংশ। বাকি মাত্র ৩ শতাংশ যায় বেসরকারি স্কুলে।

বিশ্বে শিক্ষার মান যাচাইয়ের অন্যতম পদ্ধতি পিআইএসএ (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট)-এর র‌্যাংকিং অনুযায়ী ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা টানা ৯ বছর ধরে বিশ্বের সেরা অবস্থানে ছিল। গণিত, বিজ্ঞান ও পঠন অভ্যাসের ওপর এই মূল্যায়ন পদ্ধতিটি হয়ে থাকে। পাশাপাশি গান, ছবি আঁকা ও হাতের কাজ শিশুদের শেখানো হয়। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, সেখানে শিশুদের কোনো পাঠ্যবই নেই। সেখানকার শিশুরা ৭ বছরের আগে স্কুলে যায় না। স্কুলও সকাল ৯টার আগে শুরু হয় না। স্কুলে দিনে সাধারণত ৩টি থেকে ৪টি ক্লাস হয়। প্রতিটি ক্লাস ৭৫ মিনিটের। প্রতি ক্লাসের পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট বিরতি দেওয়া হয়। এই বিরতি শিশুরা যাতে আগের ক্লাসে যা শিখেছে তা যেন চর্চা করতে পারে, হাঁটা-চলা ও পর¯পরের মধ্যে ভাববিনিময় করে নতুন উদ্যমে পরের ক্লাসটি শুরু করতে পারে সেজন্য। প্রতি ক্লাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকে। হোমওয়ার্কের পেছনেও অন্যান্য দেশের তুলনায় ফিনল্যান্ডের শিশুদের কম সময় ব্যয় করতে হয়। এসবের বালাই নেই আমাদের দেশে!

সেরা শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি দেশ হলো সিঙ্গাপুর। বর্তমানে দুনিয়ার সেরা। এশিয়ার এই দেশটির বিজ্ঞান শিক্ষাকে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশও অনুসরণ করছে। সিঙ্গাপুর জাতীয় বাজেটের ২০ ভাগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখে। সেখানে বিজ্ঞানের শ্রেণিকক্ষগুলো গতানুগতিক শ্রেণিকক্ষের মতো নয়। বরং তা দেখে মনে হবে বিজ্ঞানীদের গবেষণাগার। যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি, ক¤িপউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি, সফটওয়্যার বানানো থেকে শুরু করে রোবোটিকস ও অটোমেশনের বিভিন্ন কাজ তারা হাতে-কলমে করে থাকে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে জীবনস¤পৃক্ত শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশুশিক্ষা সম্পর্কে বলেছেন, খেলাচ্ছলেই শিখবে শিশুরা। আনন্দ-খুশির মধ্য দিয়ে মনের অজান্তেই শিখবে। পড়াশোনায় আনন্দ থাকবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু তা বলে না। আমাদের দেশে পথ চলতে চলতে দেখা যায়, স্কুলগামী বা স্কুলফেরত ছোট ছোট শিশুর ঘাড়ে ঝুলছে বড় ব্যাগ। বইয়ের সমাহার। স্কুল বা কোচিংয়ে যাওয়া-আসায় বইয়ের পাহাড় আর পড়াশোনার চাপ। মায়েদের তাগাদা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা উল্টোপথে যেতে পছন্দ করি। শিক্ষা ক্ষেত্রেও তাই। প্রাইমারিতে বইয়ের চাপ বেশি, মাধ্যমিকে তুলনামূলক কম। কলেজে অনেক কম। আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারশিট নিয়ে গেলেই হয়। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে বইয়ের বোঝা কমছে। কিন্তু উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল।

আমাদের দেশে ছোট ছোট শিশুকে একাধিক ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। বাংলা ও ইংরেজি তো আছেই। সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা। এখানে আরবি বা সংস্কৃত ভাষাও শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে শিশু শিক্ষাতেই কমপক্ষে তিনটি ভাষা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বিজ্ঞানের বিভিন্ন টার্ম তো আছেই। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে শিশুর মনে ভাষা গ্রহণ করার ক্ষমতাও। একসঙ্গে একাধিক ভাষার শিক্ষাগ্রহণ মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ স্বল্প মেয়াদে কয়েকটি ভাষা শেখানো হলেই তা কাজে লাগবে তার কোনো নিশ্চয়তা কিন্তু নেই।

অন্যদিকে, বইয়ের সংখ্যা বেশি হলেও শিক্ষার গুণগত মান বাড়ছে না। দেখা যায় সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়েও অনেক শিক্ষার্থীই প্রাথমিক জ্ঞান রাখে না। শিক্ষা এখন অনেকটা মুখস্থনির্ভর।

এজন্য বইয়ের চাপ বা পড়াশোনার চাপ কমিয়ে দিতে হবে। গল্প বা অন্যান্য বই পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধুলা বা অবসর-বিনোদনের পথ অবারিত করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনোভাবেই এগুলো সম্ভব নয়। রাশি রাশি পাঠ্যবই আর আনুষঙ্গিক বইয়ের বোঝা না পারছে শিশুদের কাক্সিক্ষত যোগ্যতা এনে দিতে, না পারছে মনোজগতের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে। অতিরিক্ত বইয়ের কারণে শিশুদের পড়ার চাপ বেড়ে যাচ্ছে অনেক। অতিরিক্ত পড়া একটি শিশুর জীবন নিরানন্দ করে দিচ্ছে। অবস্থা এমন যে মাত্রাতিরিক্ত পড়ার চাপে শিশুরা এখন শুধু পড়ার সময় নয়, খেলার সময়ও পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশ মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা ও গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী বোর্ড যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করছে, তা উপেক্ষিত হচ্ছে। ক্লাসের বাইরের বিভিন্ন বই কিনতে গিয়ে অভিভাবকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

বাড়তি বই মানে বেশি বেশি পড়া এবং বেশি বেশি পরীক্ষা। এতে করে শিশুদের কোমল মনে পরীক্ষাভীতি চেপে বসছে। এতে শিশুর মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেখা গেছে, শিক্ষকরা ক্লাসে এতগুলো বইয়ের পড়া ঠিকমতো পাঠদান করতে পারছেন না। ফলে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে ছুটছেন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে। কেউবা বাড়িতেই রাখছেন একাধিক গৃহশিক্ষক। শিক্ষার্থীরা নাওয়া-খাওয়ার সময়ও পায় না ঠিকমতো। সঙ্গে মা-বাবা বা অভিভাবকদের অবস্থাও তথৈবচ। স্কুল-কোচিং-মডেল টেস্ট নিয়ে সারা দিন তাদের গলদঘর্ম অবস্থা।

আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আরেকটা ভয়াবহ ক্ষতিকর চর্চা হচ্ছে, অসুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা। প্রায় সব অভিভাবকই তার বাচ্চাকে ক্লাসের প্রথম/দ্বিতীয় অবস্থানে দেখতে চান। বিশেষ করে বাচ্চার মায়েদের অদম্য বাসনা এটি। এর জন্য অনেক অনেক অভিভাবক আছেন, যারা বেশি হোমওয়ার্ক দেওয়া শিক্ষক, সারা বছর পরীক্ষা নেয় এমন স্কুল এবং কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের পছন্দ করেন। তারা মনে করেন, বেশি বেশি পড়াশোনা করলেই বাচ্চার শিক্ষাজীবন ভালো হবে, ভালো চাকরি হবে। আরও একটি হাস্যকর বিষয় রয়েছে বাংলাদেশের কেজি স্কুলগুলোতে। এখানে চার বছর লাগে ক্লাস ওয়ানে উঠতে। পৃথিবীর কোথাও এমন পদ্ধতি আছে বলে আমাদের জানা নেই। এ ব্যবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান সরকার প্রায় এক দশক থেকেই শিক্ষা খাতে অনেক বরাদ্দ দিচ্ছে। তাই শিক্ষা খাতে উন্নতিও চোখে পড়ছে। কয়েক বছর পর হয়তো এই ফল পাওয়া যাবে। তবে পরিকল্পনা করলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমাদের যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।

শ্রেণি অনুসারে বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করে অন্যান্য বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনার প্রস্তাব এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এটা বাস্তবায়ন করতে হবে। কোচিং-বাণিজ্য তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক ক্লাস হয়ই না। এসব শিক্ষা-সহায়ক কর্মসূচিরও ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদ ও মনোচিকিৎসকরা শিশুদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানোর তাগিদ দিচ্ছেন বহুদিন ধরেই। যেকোনো উপায়ে তাই বইয়ের সংখ্যা কমানো জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদনহীন বই চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় হতে হবে।

ইউনিসেফ বলছে, নেদারল্যান্ডসের শিশুরা সবচেয়ে সুখী। মাধ্যমিকের আগে তাদের হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় না। আর লেখাপড়া করতে চাপই দেওয়া হয় না। ফিনল্যান্ডে ১৬ বছরের আগে কোনো বাধ্যতামূলক পরীক্ষা নেই। হোমওয়ার্ক দেওয়া হয় খুব কম। আমাদের দেশে এত দিন ১৬ বছরের মধ্যেই ৩টি পাবলিক পরীক্ষা ছিল। এখন সেটা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটা খুবই ইতিবাচক।

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক

K [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত