জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ ও ধনী রাষ্ট্রগুলোর দায়

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৬ পিএম

গোটা মানবজাতির জন্য এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। দাবানল, অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ বিধ্বস্ত, অস্বাভাবিক মাত্রায় গরম হয়ে উঠছে পৃথিবী। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, চলতি দশক শেষ হওয়ার আগেই তা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপদসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তঃসরকার সংগঠন ‘আইপিসিসি’-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে বিপর্যয়ের আঁচ দেওয়া হয়েছে। তিন হাজার পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ এই রিপোর্ট তৈরি করেছেন ২৩৪ জন বিজ্ঞানী। তারা দেখিয়েছেন, ক্রমশ দ্রুততর হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, যার ফলে জলবায়ু সংক্রান্ত বিপর্যয়ের ঘটনা বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে একই সঙ্গে ঘটে গিয়েছে দাবানল, খরা ও তাপপ্রবাহ। এই ধরনের ঘটনা এখন বাড়তে থাকবে বলেই অনুমান। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন যত বাড়বে, তত বৃদ্ধি পাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, গলে যাবে মেরু অঞ্চলে বরফের আবরণ, আর বেড়ে চলবে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঝড়ের মতো আবহাওয়ার চরম আচরণ। রিপোর্ট জানাচ্ছে, যে ধরনের তাপপ্রবাহ অর্ধশতকে এক বার হতো, তা এখন প্রতি দশকেই দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের তাপমাত্রা আর ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই এমন ঘটনা প্রতি সাত বছরে দু’বারও ঘটতে পারে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কার্যক্রমের (ইউএনইপি) কার্যনির্বাহী প্রধান ইঙ্গার অ্যান্ডারসন আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন ঘোর বাস্তব। কেউই নিরাপদ নন। এত বছর ধরে সতর্কতার পরেও কেউ কথা শোনেননি। এবার নড়েচড়ে বসতেই হবে।’  বিশ্বজুড়েই বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী শোনা যাচ্ছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ দিনের ‘কপ-২৬’ নামের এ সম্মেলন হবে। ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনের পর এটি সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন। গত বছর হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারীর কারণে এক বছর পিছিয়ে এ বছর সম্মেলন হচ্ছে। এতে ২০০ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এ সম্মেলনে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ছাড়াও বিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীরাও থাকবেন। এবারের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পদ্ধতি খুঁজে পেতে গ্রিনহাউজ গ্যাস কমানোর কার্যকর অঙ্গীকার ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশের জন্যও এই সম্মেলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে খরা, অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ঋতুচক্রের পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় হিমালয়ের বরফ গলে গিয়ে জলচক্রের পরিবর্তন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়াতেই অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি রয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে, পরিবেশের সঙ্গে, আজকের ভাষায় যাকে ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র বলা হয় তার সঙ্গে যে সাযুজ্য রেখে মানুষ এই গ্রহে নিজের জীবনধারাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে, কয়েকশ বছরের উন্নততর সভ্যতার কবলে পড়ে তা বিপন্ন। এই যে ‘প্ল্যানেটারি ক্রাইসিস’ এখন একেবারে ঘাড়ের ওপরে এসে পড়েছে, তার পেছনে আছে আমাদের বিশ্ব-দর্শন, যা এই গ্রহকে এক অতিকায় কাঁচামাল হিসেবে দেখে, যাকে রসদ হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করে ক্রমাগত আরও আরও মুনাফা তুলে আনা যায়। কয়েক শতাব্দী আগে উপনিবেশের স্রষ্টারা এই দর্শনকেই প্রচণ্ড বিক্রমে তাদের দিগি¦জয়ের অভিযানে প্রয়োগ করেছিলেন। পুরনো উপনিবেশ আজ নেই, আজ আর তার প্রয়োজনও নেই, গোটা গ্রহটাকেই উপনিবেশ করে তোলার অবিরাম তৎপরতা চলছে। আমাদের দেশেও সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস করে, পাহাড়ি জনপদের গাছপালা-পাহাড়কে তোয়াক্কা না করে ‘উন্নয়নযজ্ঞ’ চালানো হচ্ছে।

অখিল ক্ষুধায় নিজেকে খেয়ে চলার এই ঔপনিবেশিক আধুনিকতা যে আমাদের খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, চোখ-কান সম্পূর্ণ বন্ধ না রাখলে আজ আর সেই সত্য না-জানার কোনো উপায় নেই। চতুর্দিক থেকে প্রতিনিয়ত সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলার অগণিত সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ উঠে আসছে, রকমারি বিপর্যয়ের নিয়ত অভিজ্ঞতা তাতে সংগত করছে। চলমান করোনা মহামারীও তার বাইরে নয়। বস্তুত, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আক্ষরিক অর্থে বাসযোগ্য পৃথিবী বলে আর কিছু আদৌ থাকবে কি না, সে বিষয়ে গভীর সংশয় আছে। এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ কি মানবজাতির জন্য কল্যাণকর কোনো যৌথ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন? নাকি কেবল আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই এবারের সম্মেলনও শেষ হবে? 

আসলে সম্মেলন করে কিছু হবে না, যদি না মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে আমরা একটা অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে আছি। এই সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের বড় রকমের পরিবর্তন ঘটাতে হবে, যে ব্যবস্থা চলছে তাকে উপড়ে ফেলতে হবে সিস্টেম বদলে ফেলতে হবে। সিস্টেম মানে কী? সিস্টেমের নাম ধনতন্ত্র। দেড় শ বছরেরও বেশি হয়ে গেল, কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন, মানুষ আর প্রকৃতি/পরিবেশ-এর যে নিরন্তর আদান-প্রদান, সেটাই আমাদের অস্তিত্বের শর্ত। “যদি আমরা মরতে না চাই, তবে ‘নেচার’-এর সঙ্গে অবিরত কথোপকথন চালিয়ে যেতে হবে।” সেটাই মানবসমাজের বিপাক-প্রক্রিয়া সোশ্যাল মেটাবলিজম; এবং ধনতন্ত্র এই গ্রহের প্রত্যেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে, প্রতিটি পরিসরকে তার মুনাফা বাড়ানোর উপকরণ হিসেবে কাজে লাগানোর অনন্ত তৎপরতার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কটাকেই ধ্বংস করে চলেছে, সামাজিক এবং মানবিক প্রক্রিয়ার ভেতরে উত্তরোত্তর ফাটল ধরিয়ে চলেছে। যে ‘মেটাবলিক রিফ্ট’-এর কথা তিনি বলেছিলেন সেই ফাটল কোন চরমে পৌঁছতে পারে, তা আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ধনী দেশগুলো নিজের স্বার্থের বাইরে আসতে চায় না। এর আগে বলা হয়েছিল, উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর দশ হাজার কোটি ডলার দান করবে গরিব দেশগুলোকে, যাতে তারা নিজ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে কার্যকরভাবে অভিযোজন করতে পারে। ২০০৯ সালের সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে কিয়োটো প্রোটোকলের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ‘ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম’ নামক আন্তর্জাতিক প্রকল্পটির মূল কথা ছিল, উন্নততর দেশগুলো তুলনামূলক অনুন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো খাতে লগ্নি করবে, যাতে সেই দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের মাত্রা হ্রাস করতে পারে। এর প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্রস্তাবেও। সেখানেও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস করবার ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্বদানের কথা বলা হয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মোট পরিমাণের অধিকাংশের জন্যই দায়ী উন্নত দেশগুলো। অথচ, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তাদের যে পরিমাণ তৎপর হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা এখনো পর্যন্ত দেখা যায়নি। এর মধ্যে আমেরিকার নামটি আসে সবার আগে। ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দেশে কিয়োটো প্রোটোকল চালু করতে অস্বীকার করেন। বারাক ওবামা উষ্ণায়ন রুখবার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এটাও সত্য, তার নেতৃত্বে প্যারিস চুক্তিতে আমেরিকা স্বাক্ষর করেছিল ২০১৫ সালে, তার মেয়াদকালের শেষের দিকে এবং শেষ পেরেকটি মেরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, কার্বন নিঃসরণ এবং পরিবেশসংক্রান্ত নীতির ওপর কার্যত বুলডোজার চালিয়ে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অবশ্য কিছু আশা জাগিয়েছেন। অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দিয়েছেন। কিন্তু তা কত দূর কার্যকর হবে, সময়ই বলবে।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুন্নত ও গরিব দেশগুলোর ওপর সর্বাধিক পড়ে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশ সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। এই প্রভাব শুধু ঝড়, বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পানীয় জলের জোগান, খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্র বিপদের মুখে। সুতরাং, অবিলম্বে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত না হলে বিশ্বের এক বিরাট অংশ প্রবল আর্থিক এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। যেমন উপকূলের পরিবেশ সুরক্ষাসংক্রান্ত কর্মসূচি ব্যর্থ হলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি আটকানো যাবে না। অরক্ষিত হয়ে পড়বে উপকূলে বসবাসকারী মানুষ, শিল্প এবং সাধারণ অবকাঠামোও। সুন্দরবন অঞ্চল এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সুতরাং, উন্নত দেশগুলোকে অগ্রসর হতে হবে, অবিলম্বে; পরিবেশের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে। লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত