গত ৫০ বছরে দেশে দারিদ্র্য ব্যাপকহারে কমলেও মানুষের মধ্যে বৈষম্যও বেড়েছে। বৈষম্য বেড়ে গেলে কর ফাঁকি দিয়ে বিদেশে টাকা পাচারও বেড়ে যায়। আবার কয়েক দশকে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে অপশাসন রয়েছে। সুশাসনকে পাশ কাটানো হয়েছে। বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বিআইডিএসের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে সম্মেলন উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়েন বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সম্মেলনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান আলাদাভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় তিনি বলেন, যেসব দেশের কর কম, সেসব দেশেই টাকা চলে যায়। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এখন রাজনৈতিক সমস্যা। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত রেমিট্যান্স ও রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে। রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তিনি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে গবেষণার ওপর জোর দেন।
একই অনুষ্ঠানের আরেক সেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে অপশাসন (মেলগভর্নেন্স) রয়েছে। সুশাসনকে পাশ কাটানো হয়েছে। এসব কারণে রানা প্লাজা, তাজরীন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটেছে। তিনি স্বাধীনতার পর দেশের উন্নয়নে বেসরকারি সংস্থার ভূমিকার প্রশংসা করেন। এসব উন্নয়ন সংস্থাকে তিনি ‘সামাজিক উদ্যোক্তা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তার মতে, এসব এনজিও গ্রামীণ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী সংস্থা। আর ব্র্যাক বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও। এগুলো বাংলাদেশের এনজিও খাতের সাফল্য নির্দেশ করে।
এদিকে অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশ ইন কমপারেটিভ পার্সপেক্টিভ’ প্রতিবেদন উপস্থাপনায় বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন প্রদেশে যে বৈষম্য রয়েছে বাংলাদেশে কিন্তু তা নেই। গত ৩০ বছরে ভারত-পাকিস্তানের থেকে নানা খাতে এগিয়েছে বাংলাদেশ। উৎপাদন খাতের অগ্রগতি, নারী ক্ষমতায়ন ও নগরায়ণসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিবেশীদের পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।
বিনায়ক সেনের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ হারে বাড়ত, যা এখন ৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। ১৯৯০ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ৩ দশমিক ২৬ হারে বাড়লেও এখন কমে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা এখন কমে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে। মাথাপিছু আয়ে ৯০ দশকে পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ শতাংশ পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। অথচ এখন পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু আয়ে ১০ শতাংশ এগিয়ে।
উৎপাদন খাতেও ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিন দশক আগে এ খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ছিল ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা এখন ১৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ থেকে কমে এখন ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গত তিন দশকে নগরায়ণ এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানেও প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে বিনায়ক সেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিনায়ক সেন বলেন, প্রতিবেশী দেশে যেভাবে আঞ্চলিক বৈষম্য রয়েছে, বাংলাদেশে নেই। তবে বাংলাদেশের সমতলে যেভাবে এগিয়ে গেছে উপকূল ও পাহাড়ি এলাকা সেভাবে এগিয়ে যায়নি। তবে সরকার এসব এলাকা উন্নয়নে কাজ করছে। বাংলাদেশের সামাজিক সূচক অনেক ভালো।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ বদলে গেছে। গত এক দশক ‘গেম চেঞ্জের’ দশক ছিল। আমি হাওরের ছেলে। গ্রামীণ উন্নয়নে আমি কাজ করছি। গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, কমিনিউনিটি ক্লাব, হাওর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রকল্পে আমি বেশি নজর দিয়ে থাকি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। এসব কারণে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান।
