স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে শুরু হয়েছে ১১ দিনব্যাপী ‘বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা নাট্যোৎসব ২০২১’। শুক্রবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় অবদান রাখা ৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা-সংস্কৃতিজন উদ্বোধন করেন মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য উৎসব। প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরীয় পরিয়ে এবং ক্রেস্ট উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হয়। এরপর আয়োজনে কামরুল হাসান ফেরদৌসের কোরিওগ্রাফিতে গীতিআলেখ্য ‘স্মরণে ৭১’ পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন বহর। পরে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করেন কিশোরগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা লাল মাহমুদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, আমরা যুদ্ধ করে যে সাম্প্রদায়িকতা রুখে দিয়েছিলাম, তা আবার একটি গোষ্ঠী ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে দেশকে গড়ে তোলা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বক্তব্যে বলেন, এ দেশে এখনো মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ মাথা উঁচু করতে চাইছে, তবে তাদের পরাজিত করে নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করবো আমরা। আর আমাদের সঙ্গ দেবে তরুণেরা, যারা সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, দেশকে ভালোবাসে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. ফওজিয়া মোসলেম, মফিদুল হক ও ম হামিদ। বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব কবি, বাউল, সাহিত্যিক, শিল্পী সবাই মিলে সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে, সেই সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে এগিয়ে যাবে দেশ। তরুণ প্রজন্ম গড়বে সম্প্রীতির বাংলাদেশ।
সভাপতির বক্তব্যে উৎসব উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের বুকের মধ্যে যে জয় বাংলা স্লোগান, আমাদের যে জাতীয় পতাকা, এই যে মুখের ভাষা, সব আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান। তাদের নিয়ে আমরা এমন একটি আয়োজন করতে পেরে আনন্দিত।
আলোচনা পর্ব শেষে ঢাক-ঢোলের বাদ্যের সঙ্গে প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং শিশুদের নিয়ে বেলুন ওড়ানোর মধ্য দিয়ে নাট্যোৎসবের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মহাকাল প্রযোজিত নাটক ‘ঘুম নেই’ মঞ্চায়ন করা হয়। নাসির উদ্দীন ইউসুফ রচিত নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন জন মার্টিন।
উৎসবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ১৪টি নাট্যদল বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটক মঞ্চায়ন করবে। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন ও পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চায়ন হবে উৎসবের নাটকগুলো। উৎসব উপলক্ষে একুশে পদকপ্রাপ্ত আলোকচিত্র শিল্পী পাভেল রহমানের ছবি নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস কর্তৃক বাংলাদেশের ৫০ বছরের নাটকের পোস্টার ও স্থিরচিত্রও প্রদর্শন করা হচ্ছে উৎসবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ৫০ বছরে সংস্কৃতিচর্চা, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে সকল প্রতিষ্ঠান নিয়মিত গবেষণা ও প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছে এমন ৯টি প্রতিষ্ঠানকে উৎসবের অষ্টম দিন, ১০ ডিসেম্বর সম্মাননা প্রদান করা হবে। সম্মাননা পেতে যাচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সিরাজগঞ্জ উত্তরণ মহিলা সংস্থা, থিয়েটার পত্রিকা, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, ছায়ানট, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ থিয়েটার আর্কাইভস। ১৩ ডিসেম্বর শেষ হবে এই নাট্যোৎসব।
শনিবার উৎসবের দ্বিতীয় সন্ধ্যায় পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চায়ন হবে চট্টগ্রামের উত্তরাধিকার নাট্যদলের নাটক ‘মৃত্যু পাখি’, কাল রবিবার মঞ্চায়ন হবে দৃশ্যকাব্যের নাটক ‘বাঘ’। ৬ ডিসেম্বর শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্রের ‘রাইফেল’। ৭ ডিসেম্বর বুনন থিয়েটারের ‘সিক্রেট অব হিস্ট্রি’ ও ঢাকা পদাতিকের ‘কথা ৭১’। ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ থিয়েটারের নাটক ‘অভিশপ্ত আগস্ট’। ৯ ডিসেম্বর প্রাঙ্গণেমোর এর নাটক ‘কনডেমড সেল’ ও সংলাপ গ্রুপ থিয়েটারের ‘মানব সুরত’। ১০ ডিসেম্বর মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’ ও থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নাটক ‘কোর্ট মার্শাল’। ১১ ডিসেম্বর নাট্যম বরিশালের ‘তিলক’। ১২ ডিসেম্বর পদাতিক নাট্য সংসদের (টিএসসি) ‘কালরাত্রি’ এবং উৎসবের সমাপনী দিন ১৩ ডিসেম্বর থিয়েটার প্রযোজিত নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ মঞ্চস্থ হবে।
