শুধু আইনের মাধ্যমে নারীদের প্রতি সহিংসতা কমানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ক্ষেত্রে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। সামাজিক অচলায়তন ভেঙে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইসলাম ধর্মে তো মেয়েদের অধিকার দেওয়াই আছে। এখানেই তো সমঅধিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে কিছু বাধা আসে, আসবে। সেই বাধা অতিক্রম করেই এগিয়ে যেতে হবে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘বেগম রোকেয়া দিবস উদ্যাপন’ ও ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২১’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। তার পক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা পাঁচ নারীর হাতে রোকেয়া পদক তুলে দেন।
এত আইন করার পরও নারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ না হওয়ায় নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, শুধু আইন করলে হবে না, এখানে মানসিকতাটাও বদলাতে হবে। চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং বিশ্বাসটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। দেশে নানা ক্ষেত্রে মেয়েরা এখন নেতৃত্বের পর্যায়ে এগিয়ে এলেও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ না হওয়ায় নিজের উদ্বেগের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা আসবেই, তারপরও স্বনির্ভর হয়ে নারীদের এগিয়ে যেতে হবে। নারীরা ভোগের বস্তু নয়, নারীরা সহযোদ্ধা; এই মানসিকতা নিয়ে সমাজকে সামনে যেতে হবে। শুধু আইনের মাধ্যমে নারীদের প্রতি সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ইসলাম ধর্মে নারীদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের বাধা আসে। তবুও এগিয়ে যেতে হবে। একবার সামনে এগিয়ে যেতে পারলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।’ এ সময় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে নারী সমাজকে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা।
প্রবল বাধার মুখেও দেশে নারীদের ফুটবল চালুর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খেলাধুলায় মেয়েদের তো অংশগ্রহণই করতে দিত না। যাই হোক দ্বিতীয়বার যখন সরকারে আসলাম, অন্যভাবে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। আমরা প্রাথমিক থেকে স্কুলে স্কুলে প্রতিযোগিতা শুরু করলাম, বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফুটবল টিম এবং মাধ্যমিক থেকে উচ্চ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফুটবল টিম। এভাবে যখন খেলা শুরু করল, এখন আর সেই বাধাটা আসে না। অর্থাৎ অচলায়তন ভেঙে একবার এগিয়ে যেতে পারলে আর কোনো বাধা আসবে না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুরুষশাসিত সমাজ আমরা বলি। কিন্তু মেয়েদের ছাড়া পুরুষরা কি পথ চলতে পারে? পারে না। মায়ের পেটে জন্ম নিতে হয়, বোনের হাত ধরে হাঁটা শিখে, বড় হয়ে স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল থাকে, বৃদ্ধ হয়ে গেলে তো কন্যাসন্তানই বেশি দেখে, সে-ই যতœ নেয় বেশি, এটাও তাদের মনে রাখতে হবে।’ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গে নারীদের দায়িত্বপালনের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বেগম রোকেয়া যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমি মনে করি, অনেকটাই আমরা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় গিয়ে আমাদের মেয়েরা কাজ করে। আমাদের যুদ্ধবিমানও তারা চালাচ্ছে। কাজেই কোনো দিক থেকে মেয়েরা কিন্তু পিছিয়ে নেই। এটা সবচেয়ে বড় কথা, পুরুষরা যেটা পারে, নারীরা তার চেয়ে আরও ভালো পারে, বেশি পারে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাই প্রমাণ হয়েছে।’ বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের সফলতার কথা বলতে গিয়ে রসিকতা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বেশি বলব, শেষে আবার দেখা যাবে পুরুষরাৃ আবার ভোট কমে যেন না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ আমাদের তো ইলেকশন করে আসতে হয়। সব দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বেগম রোকেয়া আমাদের আদর্শ। তিনি নারীদের পথ দেখিয়েছেন। তার সময়ে সমাজে নারীদের লেখাপড়া যেন অপরাধ ছিল। সেই অবস্থা থেকে তিনি নারী জাগরণে কাজ করেছেন। এখন মেয়েরা কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই; বরং পুরুষরা যেটা পারে নারীরা তার থেকে আরও ভালো পারে, বেশি পারে; এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেটাই প্রমাণ হয়েছে।’
নারী শিক্ষার প্রসার এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ করে দিতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রথমবার যখন সরকার গঠন করি নারী শিক্ষা অবৈতনিক করেছি। পাশাপাশি প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক বাধ্যতামূলক করি। এই সিদ্ধান্তের পর অনেক বাবা-মা মেয়েদের বাধা দেয়নি। অন্তত মেয়ে যে একটা চাকরি পাবে, সেটা তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে। তা ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে মেয়েদের কর্মের ব্যবস্থা হয়। সর্বক্ষেত্রে একটা উদ্যোগ নিতে চেষ্টা করেছি।’
আজকের দিনটি (গতকাল বৃহস্পতিবার) প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং বাংলাদেশের অটিজম আন্দোলনের অগ্রপথিক সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্মদিন উল্লেখ করে তার জন্য সবার কাছে দোয়া চান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পুতুলের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই আজ অটিজমে আক্রান্তরা সমাজের মূলধারার সঙ্গে মিশে যেতে পারছে, স্বীকৃতি পেয়েছে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের কোনো মা-বাবাই লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর লুকিয়ে রাখেন না। সেই মানসিকতারও পরিবর্তন এসেছে।
তৃতীয় লিঙ্গ এবং প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিলে বিশেষ প্রণোদনা : তৃতীয় লিঙ্গ এবং প্রতিবন্ধীদের চাকরি দিলে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘একসময় অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নিলে বাবা-মা তাদের লুকিয়ে রাখত। ঠিক একইভাবে হিজড়া সম্প্রদায় একসময় খুব অবহেলিত ছিল। হিজড়া সন্তান হলে বাবা-মা তাকে ফেলে দিত। আমরা সংবিধানে ও সমাজে তাদের স্থান করে দিয়েছি। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পকারখানা যদি তৃতীয় লিঙ্গ কিংবা প্রতিবন্ধীদের চাকরি দেয়, তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বয়স্ক ভাতা-বিধবা ভাতা দিচ্ছি, সেখানে আমরা প্রতিবন্ধী ভাতাও দিচ্ছি। আমাদের যে রিপোর্ট হয়, সেটা করার সময় আলাদা কলাম করে দিয়েছি যেন আমাদের যে প্রতিবন্ধী আছে তাদের আলাদা তালিকা করা হয়। এটা করেছি, কারণ তাহলে আমরা জানতে পারি কোন কোন পরিবারে এ ধরনের মানুষ আছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু যারা শিক্ষার্থী, আমরা তাদের শিক্ষা সহায়তা দিয়ে থাকি।’ ‘সমাজের কেউ যেন অবহেলিত না থাকে, কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে সেটাই আমাদের লক্ষ্য’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিটি বিভাগে ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে : গতকাল বৃহস্পতিবার ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, বালক (অনূর্ধ্ব-১৭)’ ও ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, বালিকা (অনূর্ধ্ব-১৭)’ ২০২১-এর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে সরকারি ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিকেএসপি প্রত্যেকটি বিভাগে আমরা একটা করে করব। ইতিমধ্যে দুটোর অনুমোদন দেওয়া হয়ে গিয়েছে। বাকিগুলো আমরা করে দেব। খেলোয়াড়রা যেন সেখানে ভালো প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়, সেই ব্যবস্থাটা সরকার করে দিচ্ছে।’ গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে মূল অনুষ্ঠানে যুক্ত হন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিজয়ী খেলোয়াড়দের হাতে পদক তুলে দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। তিনি খেলোয়াড়দের জন্য করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ হওয়া বিশেষ অনুদানের চেকও হস্তান্তর করেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, যুব ও ক্রীড়া সচিব আখতার হোসেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
