চাকরি পেতে বিড়ম্বনা ভূমিহীন আসপিয়ার

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৪২ এএম

বাবা নেই বরিশালের হিজলা উপজেলার কলেজছাত্রী আসপিয়া ইসলামের। ভাই একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। তার আয়েই কোনোমতে চলে সংসার। এর মধ্যে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরির সুযোগ আসে আসপিয়ার সামনে। অভাবের সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা এমন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তিনি ও তার পরিবারের সবাই। এর মধ্যে সাত স্তরে যাচাই-বাছাই, শারীরিক যোগ্যতা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং দুই দফা মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হন তিনি। তবে স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় সেই স্বপ্নে বড় একটা ধাক্কা খেলেন আসপিয়া। গত বুধবার তাকে বরিশাল পুলিশ জানায়, ‘ভূমিহীন’ হওয়ার কারণে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না তার, চাকরি পাচ্ছেন না তিনি। যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আসপিয়ার চাকরি হয়নি খবরটি আসলে সঠিক নয়। তার স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন থেকে প্রত্যয়নপত্র আনলেই নিশ্চিত চাকরি হবে তার।   

আমাদের বরিশাল সংবাদদাতা জানান, সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২০ সালে এইচএসসি পাস করেছেন আসপিয়া ইসলাম। ১৫ বছর ধরে উপজেলার খুন্না-গোবিন্দপুর গ্রামের একজনের জমিতে আশ্রিত হিসেবে থাকছে তার পরিবার। আসপিয়ার বাবা সফিকুল ইসলাম মারা গেছেন। পরিবারে তারা তিন বোন, এক ভাই ও মা। তার ভাই পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তার আয় দিয়েই চলে সংসার।

আসপিয়া জানান, বরিশাল জেলায় পুলিশ কনস্টেবলের শূন্য পদে লোক নিতে সেপ্টেম্বরে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। অনলাইনে আবেদন করলে গত ১৪, ১৫ ও ১৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনে শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৭ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ২৩ নভেম্বর প্রকাশিত লিখিত পরীক্ষার ফলাফলেও উত্তীর্ণ হন। এরপর ২৪ নভেম্বর একই স্থানে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধাতালিকায় পঞ্চম হন আসপিয়া। ২৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনে চিকিৎসকরা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এতেও উত্তীর্ণ আসপিয়া। সবশেষ ২৯ নভেম্বর মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ঢাকার রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ লাইন হাসপাতালে চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। সেখানেও উতরে যান আসপিয়া।

তবে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আসপিয়া ও তার পরিবারকে ‘ভূমিহীন’ উল্লেখ করা হয়। বুধবার জেলা পুলিশ সুপার বরাবর প্রতিবেদন জমা দেন হিজলা থানার উপ-পরিদর্শক মো. আব্বাস। এর আগে ভূমিহীন হওয়ায় (স্থায়ী ঠিকানা না থাকায়) আসপিয়ার চাকরি হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।

‘চাকরি হচ্ছে না’ এমন খবর পেয়ে গত বুধবার আসপিয়া ছুটে যান ডিআইজি এসএম আকতারুজ্জামানের কার্যালয়ে। জানতে চান, সব ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেন তার চাকরি হবে না। ডিআইজি জানান, নিজেদের জমি না থাকলে চাকরি দেওয়ার আইন নেই। এরপর ভাঙা মন নিয়ে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পুলিশ লাইনের সামনে বসে থাকেন আসপিয়া।

আসপিয়া বলেন, ‘আমি যোগ্যতাবলে সাতটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে হিজলা থানার ওসি জানান, চাকরি পেতে হলে নিজেদের জমিসহ ঘর দেখাতে হবে। কিন্তু আমাদের কোনো জমি নেই। আমরা একজনের জমিতে বছরের পর বছর ধরে বাস করছি। জমি নেই বলে আমার চাকরি হবে না এটা বিশ্বাস হচ্ছিল না। ডিআইজি স্যারের কাছে গিয়ে তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করি। কিন্তু আইনে বাধা থাকায় কিছু করার নেই বলে জানান তিনি।’

এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম আকতারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসপিয়ার জন্য আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে। আসপিয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মেধাবী। তাকে পুলিশ বিভাগে পাওয়া গেলে ভালো হতো। কিন্তু পুলিশের চাকরিতে নিয়োগ হয় জেলাভিত্তিক। অবশ্যই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবেএমন বিধান রয়েছে। কিন্তু আসপিয়ার জমি না থাকায় তাকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক মানবিক। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি বিষয়টি সদয় বিবেচনায় নিয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন তবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা করা যেতে পারে।’

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসপিয়ার চাকরি হয়নি বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তা আসলে পুরোপুরি সত্য নয়। আইন অনুযায়ী এক জেলার কেউ অন্য জেলায় চাকরির সুযোগ পাবেন না। তার ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে বলে জেনেছি। এখন তিনি যদি তার সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে স্থায়ী ঠিকানার প্রত্যয়নপত্র দেখাতে পারেন অথবা জেলা প্রশাসকের থেকে ‘ভূমিহীন’ প্রত্যয়নপত্র আনতে পারেন তবে তার চাকরি অবশ্যই নিশ্চিত। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে চাকরিও হয়েছে।’  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত