‘তোমার ফেলে যাওয়া কিছু মা আমাকেও স্পর্শ করতে দেয় না’

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৫:২৬ পিএম

গুণী চলচ্চিত্রকার, লেখক, নাট্যকার ও অভিনেতা আমজাদ হোসেনের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এ দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাবাকে স্মরণ করে লিখলেন ছেলে নির্মাতা ও অভিনেতা সোহেল আরমান।

আমজাদ হোসেনের স্ত্রী সুরাইয়া আখতার এখনো স্বামীর রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্ন পরম মমতায় সাজিয়ে রেখেছেন। যা তিনি কাউকে স্পর্শ করতে দেন না; এমনকি ছেলেদেরও না। সেই কথা উঠে এসেছে সোহেল আরমানের লেখায়।

তিনি ফেইসবুকে লেখেন, “বাবা, দেখতে দেখতে তিনটি বছর পার হয়ে গেল, তুমি ছাড়া আছি এই পৃথিবীতে। কেমন আছো তুমি ওপারে? জানো তোমার ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো এখনো তোমার ঘরে সাজিয়ে রেখেছে মা। কাউকেই স্পর্শ করতে দেয় না, এমনকি আমাকেও না। তোমার ঐ ফেলে যাওয়া ছোট ছোট জিনিসগুলো প্রতিদিনই খেয়াল রাখছে মা ওটাই এখন মায়ের সান্ত্বনা, বেঁচে থাকা। কেমন যেন মায়ের এক অযৌক্তিক বিশ্বাস হঠাৎ তোমার ডাক শোনা যাবে … এই আলো (বাবার দেয়া মায়ের ডাক নাম) আমার শার্টটা আয়রন করা হলো? ঘড়িটা কোথায় দেখো তো? ড্রাইভারকে বলো আমি বের হবো মিটিং আছে। মা বলল, নাশতা করে যাও। বাবা বলবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওর মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নেয়া। যাওয়ার সময় মায়ের কাছ থেকে নিয়মমাফিক জেনে নেয়া সংসারে কী কী লাগবে। সারা দিন শেষে আবার তোমার ফিরে আসা আমাদের উদ্‌গ্রীব মুখ সাথে কী আনলো বাবা আমাদের জন্য? কলিং বেলের আওয়াজটাই সবার থেকে একটু ভিন্ন ছিল তোমার, আমরা বুঝতাম বাবা এসেছে কখনো কখনো গাড়ির হর্ন শুনেও বুঝতাম তুমি এসেছো বাড়িতে।’

আমজাদ হোসেনকে ‘আদর্শ বাবা’ উল্লেখ করেন সোহেল লেখেন, ‘… এভাবেই তোমার কত শত স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি আমরা। বাবা তুমি এতটাই বড় তোমার অস্তিত্বে, এতটাই বড় আকাশের মতো তোমার অনুভব আজো আমাকে বোধ দেয় যে তুমি আছো সর্বক্ষণ আমারই চারপাশে। তোমাকে ভালোবাসি বাবা প্রত্যেকটি সন্তানের মতোই। তবে বাবা যে আসলেই সন্তানের জন্য কত বড় একটা বটবৃক্ষ, কত উত্তপ্ত দিনে কী নিবিড় পরম শান্তির ছায়া দেয়। প্রচণ্ড ঝড়ে কী করে যে আগলে রাখে  তার উদাহরণ তুমিই এবং তোমার মতই আদর্শ সব বাবারা… বেঁচে থাকো অমর হয়ে সবার প্রিয় আমজাদ হোসেন তোমার অমর সৃষ্টিতে মানুষের ভালোবাসাতে।’

২০১৮ সালে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজকের এই দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমজাদ হোসেন। তার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে। আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সালাহউদ্দিন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন।

এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, নাম ‘জুলেখা’। আমজাদ হোসেন পরিচালিত দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমনি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’ ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ইত্যাদি।

‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক (১৯৯৩) ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এ ছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮১ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমজাদ হোসেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত