বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া কনসার্ট

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:২১ এএম

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়িত মানুষের জন্য নিউ ইয়র্কে কনসার্টের আয়োজন করেন পণ্ডিত রবি শঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন। ওই ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্বকে জানায় পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর কী নির্মম নৃশংসতা চালাচ্ছে। এমন কনসার্ট এর আগে দেখেনি মানুষ। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

ষাটের দশকে সাড়া জাগানো ব্যান্ড বিটলস। ইংল্যান্ডের লিভারপুল শহরে ১৯৬০ সালে জন লেনন, পল ম্যাককার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টার এই চার তরুণকে নিয়ে গড়ে ওঠে রক ঘরানার এই ব্যান্ড। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ব্যান্ড সংগীত জগতে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয় বিটলস। নানা কারণে ১৯৭০ সালে ব্যান্ডটি ভেঙে যাওয়ার পর বিটলসের কনিষ্ঠতম সদস্য ২৮ বছর বয়সী জর্জ হ্যারিসনকে এক ঘটনার মধ্য দিয়ে ভিন্নভাবে চেনে মানুষ। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাশাসকদের নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচতে পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। তাদের সহায়তার লক্ষ্যে ও পূর্ব পাকিস্তানের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানান দিতে যুক্তরাষ্ট্রে এক কনসার্টের আয়োজন করেন হ্যারিসন, যার নাম দেওয়া হয় ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ওই সময় বিশ্ব নানা সংকটে জর্জরিত। এত সংকটের মধ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের দুর্দশা নিয়েই কনসার্ট করলেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের জন্য কনসার্ট করি কারণ আমার এক বন্ধু সে সময় জানতে চেয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের জন্য কিছু করা যায় কি না।’ সেই বন্ধু আর কেউ নন, কিংবদন্তি ভারতীয় সেতারবাদক ও সংগীত পরিচালক পণ্ডিত রবি শঙ্কর।

আয়োজন

১৯৭১ সালে আগস্টের ১ তারিখ নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে সংগীত পরিবেশন করেন হ্যারিসন, রবি শঙ্করসহ নামকরা আরও শিল্পী। এই কনসার্টের প্রভাব যে কত সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা হয়তো জানতেন না এর আয়োজক হ্যারিসন ও রবি। কারণ ঐতিহাসিক ওই কনসার্টের পর বিভিন্ন অঞ্চলের সংকটাপন্ন মানুষ ও মানবতার পক্ষে আরও কনসার্টের আয়োজন করেন অন্য সংগীত শিল্পীরা। পপ গায়কদের একসময় কেবল বিনোদনের খোরাক হিসেবে বিবেচনা করত বেশির ভাগ মানুষ। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের পর পপ বা ব্যান্ড সংগীতকে ঘিরে মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন দেশ ও ঘরানার সংগীত শিল্পীরা যে মানবাধিকার প্রশ্নে একত্রিত হয়ে এক স্টেজে মানুষের চেতনায় নাড়া দিতে পারে, তা বড় আকারের বিশাল আয়োজন কনসার্ট ফর বাংলাদেশ বিশ্বকে প্রথম জানিয়ে দেয়। এমন উদ্যোগ সেই প্রথম দেখল মানুষ। রবি শঙ্করের ধারণা ছিল, কনসার্ট করে বড়জোড় ৩০ হাজার ডলার পাওয়া যাবে। তার ধারণা ভুল প্রমাণিত করেন বিপুল সংখ্যক আমেরিকান। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একাত্মতা জানিয়ে তারা প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ডলার তুলে দেন কনসার্ট আয়োজকদের হাতে।                  

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, চলে নির্বিচার গণহত্যা। তাদের নৃশংসতায় প্রাণ হারায় লাখ লাখ স্বাধীনতাকামী মানুষ। পাশাপাশি সত্তরে সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ভোলায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু হয় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও কয়েক লাখ। একই সময়ে সীমান্ত এলাকায় লাখ লাখ শরণার্থীর ঢল। খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব প্রকট। মাথার ওপর ছাদ না থাকা দিনের পর দিন অনাহারী এসব মানুষের কথা বন্ধু রবির কাছে শুনে গভীর বেদনা বোধ করেন হ্যারিসন। মৃত্যুপথযাত্রী এসব মানুষকে বাঁচানোর তাগিদ থেকে তহবিল গঠনের উদ্দেশ্যে কনসার্ট আয়োজনের তোড়জোড় শুরু করেন তিনি। বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানান, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পাশে দাঁড়ান, অর্থসহায়তা করে তাদের বাঁচান। কনসার্টের পাঁচ দিন আগে নিজের গাওয়া ‘বাংলাদেশ’ গানটি প্রকাশ করেন হ্যারিসন। ওই দিনই এক সংবাদ সম্মেলনে কনসার্টের ঘোষণা দেন রবি ও হ্যারিসন। কনসার্ট প্রসঙ্গে রবি শঙ্কর বলেছিলেন, ‘১ আগস্টের কনসার্টের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাম বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ পরদিন প্রায় সব পত্রিকায় এই কনসার্টের খবর ছাপা হয়।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অধ্যাপক গ্যারি জোনাথন ব্যাস তার দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম : নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড এ ফরগোটেন জেনোসাইড বইয়ে লেখেন, কনসার্ট ফর বাংলাদেশকে ঘিরে হ্যারিসন ও রবি শঙ্করের উদ্দেশ্য মানবিক ছিল, রাজনৈতিক নয়। তা সত্ত্বেও ওই কনসার্ট পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। কনসার্টকে ঘিরে মানুষের আগ্রহে রাগান্বিত হয় তারা। কারণ কনসার্টে গাওয়া হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটিতে পাকিস্তানি আর্মির বর্বরতা ফুটে ওঠে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি আর্মির সমর্থক ও অস্ত্র জোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারও পূর্ব পাকিস্তানের অত্যাচারিত মানুষদের জন্য খোদ নিউ ইয়র্ক শহরেই হ্যারিসন-রবির কনসার্ট আয়োজনে যারপরনাই বিরক্ত হন।

কয়েক দিনের রিহার্সেল শেষে ১ আগস্ট রবিবার ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে দুপুর আড়াইটা ও রাত ৮টায় বাংলাদেশের জন্য আয়োজিত দুটি চ্যারিটি কনসার্টে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের সমাগম ঘটে। এরিক ক্ল্যাপটন, বব ডিলান, রবি শঙ্কর, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টার, ওস্তাদ আলি আকবর খান, বিলি প্রেস্টন, ক্লস ভুরম্যান, ববি হুইটলক, ডন প্রেস্টন, জেসি এড ডেভিস, কার্ল র‌্যাডলের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সেদিন একমঞ্চে দেখতে পান হাজার হাজার দর্শক। কনসার্টের শুরুতে উপস্থিত জনতাকে সেতার বাজিয়ে শোনান রবি শঙ্কর। ‘বাংলা ধুন’ নামের যন্ত্রসংগীতে তাকে সরোদে আলি আকবর খান, তবলায় ওস্তাদ আল্লা রাখা ও তানপুরায় কমলা চক্রবর্তী সঙ্গত করেন। ওই দিন আমেরিকান দর্শকদের সামনে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর প্রথম মঞ্চে ওঠেন বব ডিলান। পরপর পাঁচটি গান গেয়ে শোনান তিনি। সেদিন ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে শিল্পীরা এমন এক দেশের নাম বারবার বলছিলেন যাকে তখন পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি বিশ্বের কোনো দেশ।         

জর্জ হ্যারিসন

বড় বড় শিল্পীদের নিয়ে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজনে মন-প্রাণ ঢেলে দেন জর্জ হ্যারিসন। স্বাধীন দেশের জন্য সংগ্রাম করা মানুষের কথা এই কনসার্টের মাধ্যমে আরও ব্যাপকভাবে জানা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে এই কনসার্টের দরকার ছিল। প্রয়াত বাংলাদেশি শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা আলী যাকের এই কনসার্ট সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওইদিন বাংলাদেশ ও মানবতার কষ্ট নিয়ে উচ্চারিত কণ্ঠ দুনিয়ার সব জায়গায় ধ্বনিত হয়।’ বিশ্বের মনোযোগ তখন উদীয়মান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দিকে। এই রাষ্ট্রের জন্ম মুহূর্তের প্রসব বেদনা প্রত্যক্ষ করে গোটা পৃথিবী। হ্যারিসন একবার এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, “বাঙালি রেস্তোরাঁয় কাজ করা ওয়েটাররা এখনো আমাকে দেখলে বলে ওঠে, ‘আপনিই হ্যারিসন! ’৭১ সালে গ্রামে গ্রামে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের সময় যখন জানতে পারি, বিশ্বের অন্য প্রান্তে কেউ আমাদের কথা ভাবছে, তখন খুব ভালো লেগেছিল’।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিরা এখনো হ্যারিসনের প্রতি তাদের প্রাণঢালা শ্রদ্ধা ও

কৃতজ্ঞতা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কয়েকটি মন্তব্য এমন, ‘হাজার বছর পরও তুমি আমাদের সবার স্মৃতিতে থাকবে, হ্যারিসন’, ‘আমাদের বন্ধুরা যুদ্ধের সময় যা করেছিলেন, তা কখনো ভুলব না’, ‘আমরা তোমার প্রতি আজীবন ঋণী থাকব। স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তোমার অবদান ভোলার নয়।’ হ্যারিসনকে উষ্ণ ভালোবাসা জানায় সব বয়সের মানুষ। কেউ তাকে স্মরণ করে সেই ১৯৭১ সালে গিয়ে, কেউ বা তাকে শ্রদ্ধা জানায় যুদ্ধের সময়ে তার ভূমিকার কথা জানতে পেরে।

বাংলাদেশিদের কাছে ওই কনসার্ট আন্তর্জাতিক সংহতির উজ্জ্বল মুহূর্ত। সেদিন ক্ষমতাধর মার্কিন সরকার সমর্থিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্দীপনা জোগান রক ও শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরুরা। কনসার্টের খবর পরদিন বিশ্বের অনেক পত্রিকা বেশ ফলাও করে ছাপে। বাদ যায় না নিউ ইয়র্ক টাইমসও। তবে পত্রিকাটি তাদের প্রতিবেদনের কোথাও বাংলাদেশ শব্দটি লেখেনি। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি হাতের নাগালের বাইরে। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যায় মার্কিন সরকার যতই নৈতিক সমর্থন ও সামরিক সহায়তা দিয়ে থাক না কেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য আকুতি তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণের দুর্দশার কথা জানতে পেরে ওই বছরই ‘সং অফ বাংলাদেশ’ রচনা করে গিটার হাতে বিশ্বকে গেয়ে শোনান মার্কিন গায়িকা ও লোকসংগীতের রানী হিসেবে পরিচিত জোয়ান বায়েজ। এই গানে কাঁদে শ্রোতারা। এতে রয়েছে গণহত্যার কথা, রয়েছে শরণার্থীদের গোঙানি ও আর্তনাদ। একই সঙ্গে শরণার্থী শিবিরে বাঙালিদের কষ্ট দেখে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শিরোনামে মর্মস্পর্শী কবিতা লেখেন মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ।                          

অ্যালবামের প্রচ্ছদে শিশু

১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর কনসার্ট ফর বাংলাদেশের অ্যালবাম প্রকাশ হয়। অ্যালবামের প্রচ্ছদে খালি গায়ে অপুষ্টিতে ভোগা হাড্ডিসার এক শিশুকে মাটিতে বসে থাকতে দেখা যায়। তার হাতে ও সামনে বড় এক থালায় পড়ে রয়েছে কয়েক দানা ভাত। প্রচ্ছদটি তাড়াহুড়ো করে বা না ভেবে করা হয়নি। বরং সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করেই কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অ্যালবামের প্রচ্ছদ করা হয়। এই প্রচ্ছদ সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনোযোগ কাড়ে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে আবার অর্থনৈতিক ও

সাংস্কৃতিক শাসনের জাঁতাকলে পড়ে পূর্ববাংলার মানুষ। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দমনমূলক শাসনের শিকার ওই হাড় জিরজিরে শিশু। ওই শিশুর নাম কী বা তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা কেউ জানে না। নৃবিজ্ঞানী নয়নিকা মুখার্জির মতে, পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করে অ্যালবামের প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদের ক্ষুধার্ত শিশু অনাহারে দিন কাটানো এক দেশের মানুষের প্রতিনিধি।

রাজনীতি সচেতনতা

কনসার্টের তারিখ ঘোষণার সময় সংবাদ সম্মেলনে হ্যারিসন বলেছিলেন, ‘রাজনীতি নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ চলছে। সেখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। কনসার্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। কনসার্ট থেকে উঠে আসা অর্থ মানুষের যন্ত্রণা যেন কিছুটা হলেও কমাতে পারে এবং দুর্দশাগ্রস্তদের হাতে অর্থ ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

হ্যারিসন কি আসলেই রাজনীতিবিমুখ ছিলেন? কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এটি বিশ্বজনমত গড়তে সক্ষম হয়। ১৯৯৭ সালে এই কনসার্ট নিয়ে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে হাজির হন রবি শঙ্কর ও হ্যারিসন। সেখানে রবি বলেন, “আমার অনেক আত্মীয় পূর্ব বাংলায় থাকতেন। যুদ্ধের বছরে তারা ভারতে শরণার্থী হয়ে আসেন। আমার জন্য এটি খুব যন্ত্রণাদায়ক ছিল। তখন একটি চ্যারিটি শো-এর পরিকল্পনা করি। শো করে হয়তো ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার উঠবে। যাই উঠুক, তা সব অর্থ পূর্ব বাংলার মানুষদের পাঠাব। ওই সময় জর্জও লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিল। আমাকে অসুখী দেখে সে জানতে চায় আমার কী হয়েছে। সব শুনে জর্জ বলে, ‘এটা কোনো ব্যাপারই নয়। চলো, বড় করে চ্যারিটি শো-এর আয়োজন করি’।” সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে হ্যারিসন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছিল। আপনারা জানেন, ওইসব অস্ত্র দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানো হয়। ওখানকার পরিস্থিতি নিয়ে আরও খবর নিই। ভাবি, আমাদের কিছু একটা করা দরকার এবং দ্রুতই তা করতে হবে। আমরা কনসার্টের মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্বে তুলে আনতে চেয়েছি।’ এই যে তুলে আনতে চাওয়া এটাই বিপ্লবী কাজ। এটি শুধু ক্ষুধার্ত জাতির মুখে অন্ন তুলে দেওয়ারই উদ্যোগ ছিল না, একই সঙ্গে তা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতনতাও ছিল। ভারতীয় ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘কনসার্টের বার্তা নিয়ে অন্য কিছু ভাবার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ ও পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার বিকল্প খারিজ করার মধ্য দিয়ে রবি শঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন তাদের রাজনৈতিক মতামত সেদিন প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। কনসার্টের দর্শকদের মাঝে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, বাংলাদেশের সংকট যতটা রাজনৈতিক, ঠিক ততটাই মানবিক।’

কনসার্টটি যে রাজনৈতিক সচেতনতার জায়গা থেকেও আয়োজন করা হয়, তা মনে করার অন্য কারণ রয়েছে। সে সময় পপস্টার হ্যারিসন, বিটলস বা জনপ্রিয় সংগীত কাউন্টারকালচারের অংশ ছিল। যদিও এই কাউন্টারকালচার দৃঢ় রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। বিদ্রোহ ও কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান সংগীতের প্রতিরোধের মধ্যে শেকড় খুঁজে পায় বিটলস ও ইংলিশ রক ব্যান্ড রোলিং স্টোন। পরিবর্তনশীল সেই সময়ের জন্য লোক ও প্রতিবাদী বিভিন্ন গান নতুন করে রচনা করেন বব ডিলান। ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরুদ্ধে তখনকার শিল্পীরা ছিলেন সোচ্চার। এস্টাবলিশমেন্ট, সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করে পপ সংগীত সে সময় বিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আয়োজন হয় কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। দেশের মুক্তিসংগ্রামের আলোচনায় এই কনসার্টের উল্লেখ তাই আসবে অবধারিতভাবেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত